রাজধানী ঢাকা এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোর পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্য নিয়ে বিশাল পরিসরে বৈদ্যুতিক বাস (ই-বাস) বহর গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন থেকে মোট ৪ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ৮০০টি পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বাস আমদানির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। এই লক্ষ্যে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে কার্যক্রম শেষ করার মেয়াদ ধরে পরিকল্পনা কমিশনে পৃথক দুটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পাঠিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি)। মূলত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুতচালিত গণপরিবহনের এক নতুন যুগে প্রবেশের জন্য সরকার মোট ১,৪০০ ই-বাস নামানোর পরিকল্পনা করেছে, যার অংশ হিসেবে বাকি ৪ শত বাস কেনা হবে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত একটি চলমান প্রকল্পের আওতায়।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট ঋণে বাস সংগ্রহের ক্ষেত্রে দুটি দেশের মূল্যের বিশাল পার্থক্যের বিষয়টি দৃশ্যমান হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ)-এর শূন্য দশমিক শূন্য এক থেকে শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশের অত্যন্ত স্বল্প সুদের ঋণে ৩০০টি সিঙ্গেল ডেকার এসি ই-বাস আমদানিতে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২,৭১৩.১৯ কোটি টাকা। এতে প্রতি বাসের ক্রয়মূল্য পড়ছে প্রায় ৪.৬১ কোটি টাকা, যা সামগ্রিক অবকাঠামো ও খুচরা যন্ত্রাংশ কেনাসহ যুক্ত করা হয়েছে। অপরদিকে, চীনা ঋণের আওতায় ৫০০টি ই-বাস ক্রয়ে খরচ ধরা হয়েছে ১,৮৭০.৫১ কোটি টাকা, যেখানে প্রতিটি চীনা বাসের গড় ক্রয়মূল্য দাঁড়াচ্ছে ২.৪৬ কোটি টাকা। হিসাব অনুযায়ী, কোরিয়ান বাসের একক দাম চীনা বাসের চেয়ে প্রায় ১.৮ গুণ বেশি হলেও চীনা ঋণের সুদের হার দুই থেকে তিন শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়।
ই-বাস পরিচালনার জন্য গাড়ি কেনাই একমাত্র অনুষঙ্গ নয়; বরং পুরো ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে বিশাল অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রকল্পগুলোতে। কোরিয়ান ঋণের প্রস্তাবনায় বাসের মোট মূল্যের ১৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে জরুরি যন্ত্রাংশ কেনার জন্য। এছাড়া বাসগুলোর নিরবচ্ছিন্ন চার্জিং নিশ্চিত করতে ২৫টি চার্জিং স্টেশন, ২৫টি ট্রান্সফর্মার ও জেনারেটর, ২০টি উন্নত ওয়ার্কশপ শেড, ৩টি সংরক্ষণাগার বা ওয়্যারহাউস, ২৫টি রেকার এবং ২০টি অটোমেটিক ওয়াশিং প্ল্যান্ট তৈরির বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে চীনা প্রস্তাবে ২৫টি ফাস্ট চার্জিং স্টেশন তৈরি এবং একটি বিশেষায়িত ওয়ার্কশপের জন্য ১৩৫.৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি দূরবর্তী স্থান থেকে সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য প্রতিটি বাসে ভেহিকল ট্র্যাকিং সফটওয়্যার (ভিটিএস) ও আধুনিক সিসিটিভি নজরদারি প্রযুক্তি যুক্ত করা হচ্ছে।
সরকারের এই পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে নীতিগতভাবে স্বাগত জানালেও এই ই-বাস বহর টিকিয়ে রাখা এবং সঠিক তদারকি বিষয়ে বিআরটিসির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছেন দেশের জ্যেষ্ঠ পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিশিষ্ট অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান এবং অধ্যাপক শামসুল হক এ বিষয়ে তীব্র সংশয় প্রকাশ করেছেন। অতীতে সুইডেনের নামীদামী ‘ভলভো’ ডাবল ডেকার কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার ‘দেউ’ ব্রান্ডের শত শত এসি বাস পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ না করে মেয়াদ শেষ হওয়ার বহু আগেই স্ক্র্যাপ বা ভাঙাড়িতে পরিণত করার জঘন্য রেকর্ড রয়েছে বিআরটিসির। বিশেষজ্ঞ শিক্ষকগণ মনে করেন, সঠিক চার্জিং পরিকাঠামো, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, জলোচ্ছ্বাস ও জলাবদ্ধতার মতো প্রতিকূল রাস্তায় চলাচল উপযোগী সার্বিক প্রশিক্ষণ ছাড়া তাড়াহুড়ো করে রূপান্তর ঘটালে তা পূর্বের ভলভো প্রকল্পের মতোই করুণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গণপরিবহনের আধুনিকীকরণে কেবল সরকারি আমলাতান্ত্রিক সংস্থা বিআরটিসির ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ই-বাস আমদানিতে উৎসাহিত করা উচিত। বিআরটিসি বিগত দিনে গাড়ি কিনে নিজেরা না চালিয়ে লিজ বা ইজারাদারদের হাতে ছেড়ে দেওয়ায় সেবার মানের পরিবর্তে অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা ও অকালে যানবাহন অকেজো হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। আকিজ কিংবা প্রাণের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যেই ব্যাটারিচালিত বাস চালুর তাগিদ দেওয়ায় সরকার যদি তাদেরকে কর ছাড়, শুল্ক সুবিধা ও সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়, তবে বেসরকারি খাত নিজস্ব পুঁজি ও ব্যবসা রক্ষার স্বার্থেই দীর্ঘমেয়াদী টেকসই ই-বাস সেবা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।
বিআরটিসির বর্তমান পরিচালন নথিপত্র অবশ্য দাবি করছে যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কঠোর প্রশাসনিক আর্থিক শৃঙ্খলা ও সুশাসনের কারণে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনগতভাবে লাভজনক সংস্থায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে তাদের অধীনে থাকা ১,২৫০টি বাসের মধ্যে ৭০০টি বাসের আয়ু শেষ হয়ে যাওয়ায় জরুরিভিত্তিতে নতুন বাস যুক্ত করা না হলে ২০২৬ সালের মধ্যে সচল বাসের সংখ্যা ৫৫০টিতে নেমে আসবে, যা মারাত্মক গণপরিবহন সংকট তৈরি করতে পারে। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকির নির্দেশে ইতোমধ্যে চীনা ঋণ প্রস্তাবটি আরও বিস্তারিত পর্যালোচনায় পাঠানো হয়েছে এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব চিত্র তুলে ধরেছেন যে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই ৫০টি করে প্রথম চালানের ১০০টি ই-বাস নারীদের জন্য ডেডিকেটেড সেবাসহ রাজপথে নামানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে।