রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী পরিবহন সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে একটি স্বাবলম্বী ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের অগণিত আনুষ্ঠানিক আশ্বাস সত্ত্বেও অনিয়ন্ত্রিত বৈদেশিক চুক্তি এবং ভূ-রাজনৈতিক নানামুখী চাপে চরম আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে সংস্থাটি। বিগত সরকারের আমল থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তীকালীন ও বর্তমান সরকারের মেয়াদে একের পর এক বহর সম্প্রসারণের মেগা সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা মেটানোর কোনো সুনির্দিষ্ট আর্থিক রূপরেখা তৈরি করা হয়নি। পশ্চিমা পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য বিদেশি দেশগুলোকে সন্তুষ্ট করতেই বিমানকে একের পর এক উড়োজাহাজ কেনার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ খোদ বিমানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের। ফলে অব্যাহত দুর্নীতি, ব্যাংক ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা এবং অগোছালো পরিকল্পনার কারণে পতাকাবাহী সংস্থাটির লাভজনক হওয়ার সুযোগ ম্লান হয়ে উল্টো মহা-লোকসানের পাঁকে তলিয়ে যাওয়ার তীব্র আশঙ্কায় পড়েছে।
কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ মাথায় নিয়ে সম্প্রতি একসঙ্গে ২৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়ন করেছে সরকার, যার মধ্যে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির ১৪টি এবং ইউরোপীয় ফরাসি নির্মাতা এয়ার বাসের ১০টি বহুল আলোচিত ই-ক্রাফট। চলতি আগস্ট মাসেই ১০টি এয়ার বাস ক্রয়ের আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের জোর প্রস্তুতি চলছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, সংস্থাকে একটি আধুনিক ও মিশ্র বিমান বহরে (মিক্সড ফ্লিট) রূপান্তর করতেই এই বিশাল বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে বিমানের নিজস্ব বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ সচল রয়েছে, যা নতুন বিমানগুলো যুক্ত হলে এক লাফে ২৯টিতে পৌঁছাবে এবং ২০৩৪-৩৫ মেয়াদের মধ্যে বহরের মোট আকার ৪৭টিতে উন্নীত করে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় এভিয়েশন হাবে পরিণত করার সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সাজানো হয়েছে।
তবে এত বড় রাষ্ট্রীয় কায়দায় উড়োজাহাজ ক্রয়ের ক্ষেত্রে অর্থায়নের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা বা সুদের হারের সুনির্দিষ্ট কোনো নথি তৈরি করতে পারেনি কতৃপক্ষ। কোটি কোটি ডলার মূল্যের বোয়িং ও এয়ার বাস কেনার বিপরীতে দেনা মেটানোর কিস্তি কীভাবে শোধ করা হবে, সেই সাথে বাড়তি কেবিন ক্রু, দক্ষ প্রকৌশলী, প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদী আধুনিক যন্ত্রাংশ সংগ্রহের চরম ব্যয়বহুল খরচ কীভাবে বহন করা হবে—তার কোনো প্রাথমিক হিসাব নথিপত্রে নেই। উল্টো নতুন দুটি ভিন্ন ঘরানার বোয়িং ও এয়ার বাসের সম্পূর্ণ নতুন ও জটিল হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যার পরিচালনার জন্য পাইলটদের নিবিড় প্রশিক্ষণের পেছনেই বিশাল অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ অপচয় হবে। ইতিমধ্যে প্রথম দফার চুক্তির জন্য বিমানকে জরুরি রিজার্ভ ফান্ড থেকে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা অগ্রিম পরিশোধ করতে হয়েছে।
উড়োজাহাজ কেনাকাটার পেছনে বৈশ্বিক বড় পরাশক্তিগুলোর বড় ধরনের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ দীর্ঘদিন ধরে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট স্বয়ং বাংলাদেশ সফরে এসে ১০টি এয়ার বাস ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন, যা পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের মেয়াদে এসে চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছে। অন্যদিকে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস ও বোয়িংয়ের শীর্ষ প্রতিনিধিরা ঢাকায় বিশেষ বৈঠক করে ড্রিমলাইনারের নতুন ভার্সন ৭৮৭-১০ বিক্রির জন্য তীব্র লবিং পরিচালনা করেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে বোয়িং ক্রয়ের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত করা হলেও চুক্তি স্বাক্ষরের বাস্তবায়ন বর্তমান সরকারের মেয়াদে লিখিতভাবে চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে। কিন্তু এত বড় আন্তর্জাতিক কেনাকাটায় স্বচ্ছতার অনুপস্থিতি এবং দ্রুততম সময়ে চুক্তি সম্পাদনের অস্থিরতা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের পথকে প্রসস্ত করছে।
বাণিজ্যিক দিক থেকে ভারসাম্য রক্ষার পরিবর্তে বিমানের রিজার্ভ ফান্ড আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে, যার বিপরীতে অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা। বিমানের ব্যাংক হিসাবগুলোতে কিছুদিন আগেও যেখানে প্রায় ৩৬০০ কোটি টাকা গচ্ছিত ছিল, আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিনিময় ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সেখানে খরচ এখন আকাশছোঁয়া। অথচ দুর্নীতি বন্ধ করা, রুট পুনর্গঠন কিংবা অনিয়ম দূর করার কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে নজর না দিয়ে বিলাসিতার মতো উড়োজাহাজ বহর বৃদ্ধি করাকে চরম ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন অ্যাভিয়েশন বিশ্লেষকরা। কাজী ওয়াহিদুল আলম এবং এটিএম নজরুল ইসলামের মতো অভিজ্ঞ এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, দুটি ভিন্ন ক্যাটাগরির বিশালাকার বিমানবহর একই সময়ে পরিচালনা করার মতো প্রফেশনাল জনবল বিমানে নেই। সময়মতো ঋণ ও কিস্তি পরিশোধ নিশ্চিত করা না গেলে এবং পরিচালন আয় বৃদ্ধি না পেলে বৈশ্বিক এই রেষারেষির বলি হয়ে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক সংকটের ফাঁদে নিপতিত হতে যাচ্ছে।