বর্ষার ভরা মৌসুমে উপকূলীয় নদ-নদী পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ থাকলেও বরিশাল অঞ্চলের প্রধানতম প্রাকৃতিক সম্পদ রুপালি ইলিশের দেখা মিলছে না। সরকারের নির্ধারিত প্রজনন ও সংরক্ষণ নিষেধাজ্ঞা না থাকা সত্ত্বেও নদীতে জাল ফেলে কাঙ্ক্ষিত মাছের দেখা না পেয়ে হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন দক্ষিণাঞ্চলের হাজার হাজার জেলে। যা অল্পবিস্তর জালে ধরা পড়ছে, তার সিংহভাগই আকারে বেশ ছোট এবং সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে রেকর্ড মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। মৎস্য দপ্তরের সাম্প্রতিক আনুষ্ঠানিক হিসাব পর্যালোচনা করলেও দেখা যায় যে, বরিশাল বিভাগে ইলিশের বার্ষিক মোট উৎপাদন বিপজ্জনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। মৎস্যবিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের এই আশঙ্কাজনক অন্তর্ধানের পেছনে মূলত চারটি ভৌগোলিক ও পরিবেশগত সংকট কাজ করছে—সমুদ্র থেকে নদীতে প্রবেশের প্রাকৃতিক পথে বাধা, উজান থেকে আসা মিষ্টি পানির প্রবাহ হ্রাস, সামুদ্রিক সীমানায় অবৈধ ট্রলিং বোটে অতিরিক্ত মাছ শিকার এবং মাইক্রোপ্লাস্টিকের মতো নতুন ও মারাত্মক ক্ষতিকর প্লাস্টিক দূষণ।
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য দপ্তরের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত চার অর্থবছরে পুরো বরিশাল বিভাগে ইলিশের মোট উৎপাদন অবিশ্বাস্যভাবে কমেছে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৭৪৬ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগে ইলিশের রেকর্ড সর্বোচ্চ উৎপাদন রেকর্ড করা হয়েছিল ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ টন। এরপরের বছর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন এক লাফে কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৪ টনে। এই পতন অব্যাহত থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট উৎপাদন নেমে আসে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ টনে এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় মাত্র ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ টনে। এমনকি বরিশাল একক জেলা হিসেবে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যেখানে ৩৯ হাজার টন ইলিশের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল, সেখানে জুন মাস পর্যন্ত অনুমানভিত্তিক সরকারি খাতায় স্থান পেয়েছে মাত্র ৩৭ হাজার টন। বাস্তবে নদী থেকে ওঠা ইলিশের প্রকৃত পরিমাণ আরও কম বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
মৌসুমের শুরুতে নদ-নদীতে ইলিশের এমন ভয়াবহ আকালে অর্থনৈতিকভাবে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন বরিশালের উপকূলীয় এলাকার লাখ লাখ প্রান্তিক জেলে ও মৎস্যজীবী। মেঘনা নদীবেষ্টিত মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া কিংবা বরিশাল সদরের চরমোনাই ও সায়েস্তাবাদ এলাকার জেলهها জানান, মহাজন বা আড়তদারদের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন ও ঋণ নিয়ে জাল-নৌকা নিয়ে নদীতে নেমেও কাঙ্ক্ষিত মাছের মুখ দেখা যাচ্ছে না। সারাদিন বা সারারাত জাল বেয়ে দু-একটি যা মাছ উঠছে, তার সিংহভাগই ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রামের ছোট আকারের। নদীর স্বাভাবিক লোকাল ইলিশের এই চরম দুর্ভিক্ষের কারণে সাধারণ জেলের আয়ের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইলিশ সংকট ও পরিবেশগত পরিবর্তন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট ইলিশ গবেষক ও বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী ড. আনিছুর রহমান। তাঁর মতে, গত দুই বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে মোট উৎপাদন ও মাছের গড় ওজন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া একটি বড় বিপদের বার্তা দেয়। তিনি জানান, ইলিশ সুষম প্রাকৃতিক পরিবেশ হারাচ্ছে কি না এবং এর ভৌগোলিক প্রজনন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে কি না তা জরুরি ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। গবেষণা ও সরেজমিন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সামুদ্রিক সীমানায় আন্তর্জাতিক ট্রলিং বোটের অবৈধ আধিপত্য ও মাত্রাতিরিক্ত মাছ শিকারের ফলে বড় ও ডিমওয়ালা ইলিশ মোহনায় আসার আগেই ধরা পড়ে যাচ্ছে। এর সাথে নদী মোহনায় অসংখ্য ডুবোচর জেগে ওঠায় পানির গভীরতা কমে যাওয়া এবং নদীর প্রবেশপথে কৃত্রিম বাধা তৈরি হওয়ায় ইলিশ তার স্বাভাবিক বিচরণ পথ পরিবর্তন করছে।
নদ-নদীর এই নাব্যতাসংকট ও বাণিজ্যিক ট্রলিংয়ের পাশাপাশি সম্প্রতি উন্মোচিত গবেষণায় ইলিশের প্রাকৃতিক বিচরণে সবচেয়ে বড় আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ। বরিশাল জেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান জানান যে, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সম্প্রতি উদ্ধারকৃত ইলিশের পাকস্থলী ও প্রজননতন্ত্রে মারাত্মক মাত্রার ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। এর ফলে ইলিশের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, নির্ধারিত সময়ে প্রজনন অঙ্গ ও ডিম পরিপক্ক হতে পারছে না এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা চরমভাবে ধসে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্ষতিকারক নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ জালের অবাধ ব্যবহারের ফলে ইলিশ নদী থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে, যার ফলে চলতি ভরা মৌসুমে বরিশাল পোর্ট রোডের দেশের অন্যতম প্রধান মৎস্য মোকামে এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি পৌনে তিন হাজার টাকা এবং ভালো মানের ইলিশ তিন হাজার টাকার উপরে অস্বাভাবিক দামে বিক্রি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে কার্যকর বৈজ্ঞানিক কৌশল ও সমন্বিত নদী ড্রেজিং দরকার বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।