শিরোনামঃ
বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ১১:০৯ অপরাহ্ন

ইউপি দিয়ে শুরু: নতুন আচরণবিধিতে ফিরছে স্থানীয় নির্বাচন

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬

জাতীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অবশেষে স্থবির হয়ে পড়া তৃণমূলের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় গতি ফেরাতে বড় ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশে পর্যায়ক্রমে সব স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনী আমেজ শুরু হতে যাচ্ছে। ইউপি নির্বাচনের সফল সমাপ্তির পর ধাপে ধাপে পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৬ সালের চলতি ডিসেম্বরের শেষভাগে কিংবা আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসের শুরু থেকেই সরাসরি মাঠে গড়াচ্ছে এই বিপুল কর্মযজ্ঞ। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, দেশে জনসেবা ত্বরান্বিত করতে এবং ভেঙে পড়া প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে পর্যায়ক্রমে সবকটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের যাবতীয় প্রাথমিক প্রস্তুতি পুরোদমে এগিয়ে চলছে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্ম পরিকল্পনা ও নতুন ভোটার তালিকার ওপর নির্ভর করে এই স্থানীয় নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি নির্ধারণ করা হচ্ছে। ইসি সূত্র থেকে জানা যায়, ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত নিবন্ধিত ও হালনাগাদকৃত তথ্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে, যা দিয়ে আগামী সবকটি স্থানীয় সরকারের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আকতার আহমেদ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, ভোটার তালিকা চূড়ান্তকরণের পাশাপাশি দেশব্যাপী প্রয়োজনীয় নির্বাচনী সরঞ্জাম ক্রয়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হতে আসন্ন ডিসেম্বর বা আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত সময় লেগে যাবে। এরপরই নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণ মানুষের জন্য তফসিল ঘোষণা করবে। নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন যে, নির্বাচন কমিশন বর্তমানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংক্রান্ত জরুরি কাজ সম্পাদনে ব্যস্ত রয়েছে, যা শেষ হওয়া মাত্রই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চূড়ান্ত কর্মপরিকল্পনায় পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া হবে।
এদিকে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চর্চায় বড় পরিবর্তনের অংশ হিসেবে এবার নির্দলীয় প্রতীকে ভোটাভুটি আয়োজনের জাতীয় আইন পাস হওয়ার পর ইসি নতুন ও যুগোপযোগী আচরণবিধি প্রস্তুত করেছে। ২০১৬ সালের পুরনো বিধিমালা সংশোধন করে পাঁচ স্তরের নির্বাচনের উপযোগী এই নতুন আচরণবিধির খসড়া ইতোমধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদনের পর আইনি পরীক্ষার (ভেটিং) জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন আচরণবিধিতে প্রথাগত পোস্টার টাঙানোর সুযোগ বাতিল করা হলেও সাদা-কালো ব্যানারের সর্বোচ্চ আকার ১০ ফুট বাই ৪ ফুট, লিফলেট এ-ফোর আকারের এবং ফেস্টুন ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি পর্যন্ত ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে প্রথমবারের মতো প্রার্থীদের নির্দিষ্ট আকারের (সর্বোচ্চ ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট) পরিবেশবান্ধব বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হচ্ছে, যা সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউপির প্রতিটি ওয়ার্ডে সর্বোচ্চ একটি করে বসানো যাবে।
প্রচারণায় আধুনিকতা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ রাখার পাশাপাশি খসড়া আচরণবিধিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর অনৈতিক অপব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণার সার্বিক খরচ প্রার্থীর মোট নির্বাচনী ব্যয়ের আইনি হিসাবের আওতায় আনা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এছাড়া মাইকে শব্দদূষণ রোধে দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাইক বা ভ্রাম্যমাণ ক্যারাভানে প্রচার চালানোর নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে শাস্তি ও জরিমানার বিধান ব্যাপকভাবে কঠোর করা হয়েছে—যেখানে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ছাড়াও শাস্তিমূলক জরিমানা ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাফে ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে গুরুতর অনিয়মের দায়ে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সরাসরি প্রার্থিতা বাতিলের কঠোর অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছে।
প্রশাসনিক দিক থেকে বিবেচনা করলে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে সারা দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভূতপূর্ব এক বিশৃঙ্খলা ও শূন্যতা বিরাজ করছে। অতীতে ফ্রি স্টাইলের একদলীয় ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা অনেকেই বৈষম্যবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের পর পালিয়ে যাওয়া, আত্মগোপনে থাকা কিংবা ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হওয়ায় বর্তমানে উপজেলাগুলোতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) বাড়তি দায়িত্ব পালন করছেন। একইভাবে জেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রশাসনিক কাজ চালাতে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে বসানো হয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতির কারণে ইউপি ও অন্যান্য স্থানীয় কার্যালয়গুলোতে সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন নাগরিক সেবা নিতে গিয়ে সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। প্রথম ধাপে ২০২১ সালে বরিশালের ২০৪টি ইউপিসহ দেশের যেসব ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, সেগুলোতে দ্রুত নতুন প্রতিনিধি নির্বাচনের বিকল্প নেই। এই সার্বিক প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটাতে ও জনগণের কাছে ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে চলতি অর্থবছরের বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রেখে ইসি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তৃণমূলের গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে।

 

তথ্যসূত্র: মানবজমিন


এ জাতীয় আরো খবর...