শিরোনামঃ
জাতীয় দলের ফুটবলার আল আমিনকে ১৫ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করেছে ফিফা বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের ব্যাংক হিসাব খোলার নির্দেশনা জারি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নতুন চার সদস্যের শ্রদ্ধা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেনি কেউ, ভোট বৃহস্পতিবার: ইসি সচিব ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইমরান খানকে হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ মিয়ানমারের বক্তব্যে বাংলাদেশের উদ্বেগ কারাগারের নাম বদলে ‘কাস্টডিয়াল অ্যান্ড কারেকশন সার্ভিস’ করার উদ্যোগ সমাজের সবাই এগিয়ে এলে অনেক বড় সমস্যার সমাধান করা সম্ভব : প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা: প্রধানমন্ত্রী এআই ও সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার রোধে সচেতনতার বিকল্প নেই : তথ্যমন্ত্রী
মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:২৯ অপরাহ্ন

হাসিনার তৎপরতা: দিল্লির কূটনৈতিক অস্বস্তির কারণ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং আগামী ডিসেম্বরে তাঁর বাংলাদেশে ফিরে আসার আকস্মিক ঘোষণা নয়াদিল্লির জন্য এক জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী গবেষণা প্রতিষ্ঠান Lowy Institute এর প্রকাশিত এক বিশেষ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যখন এক সংবেদনশীল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন হাসিনার এমন তৎপরতা ভারতের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাবেক মিত্রকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আশ্রয় দেওয়া অব্যাহত রাখলে তা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সাথে আস্থার সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলবে এবং ঢাকার ভূরাজনৈতিক মেরুকরণকে চীনের দিকে আরও ত্বরান্বিত করার বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
অস্ট্রেলিয়া-ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউটের ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক গ্রেস করকোরানের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, ক্ষমতা হারানোর পর ভারতে আশ্রিত শেখ হাসিনা রাজনৈতিক মঞ্চে পুনরায় ফেরার যে বার্তা দিচ্ছেন, তার প্রভাব কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এটি নয়াদিল্লির পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এক গভীর দোলাচল তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান নিষ্ঠুরভাবে দমনের দায়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতিমধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছেন। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ওই ঐতিহাসিক আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর নির্বিচার গুলিতে অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। এমন এক বিতর্কিত ও দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে দীর্ঘ মেয়াদে ভূখণ্ডে রেখে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা ভারতের জন্য ক্রমেই দুরূহ হয়ে পড়ছে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পটপরিবর্তন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার চিত্রও বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশকের দমন-পীড়ন ও ভোটবিহীন শাসনের অবসানের পর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন প্রশাসন যখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন এবং পূর্ববর্তী অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতজনিত কারণে জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার যে কোনো উসকানিমূলক পদক্ষেপ বাংলাদেশে পুনরায় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের পথ উন্মুক্ত করতে পারে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
নয়াদিল্লির দৃষ্টিকোণ থেকেও এই পরিস্থিতি অত্যন্ত বিব্রতকর। নরেন্দ্র মোদি সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছিল। কিন্তু চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে জনপরিসরে তৈরি হওয়া তীব্র ভারতবিরোধী ক্ষোভ দুই দেশের মধ্যকার প্রথাগত কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সাথে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার যে প্রাথমিক উদ্যোগ ভারত নিয়েছিল, তা এখন চরম বাধার মুখে পড়েছে। আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানানোর মতো কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বরফ এখনো পুরোপুরি গলানো সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা একাধিকবার আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ জানালেও নয়াদিল্লি তাতে সাড়া না দিয়ে বিষয়টিকে অমীমাংসিত রেখে দিয়েছে। এর ওপর ভারতের মাটিতে বসে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদানের সুযোগ তৈরি হওয়াকে বাংলাদেশ সরকার সার্বভৌমত্বের প্রতি অসৌজন্যমূলক আচরণ হিসেবে বিবেচনা করছে। যদিও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করছে যে এসব আয়োজন সম্পূর্ণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং এর সাথে রাষ্ট্রীয় অবস্থানের কোনো যোগসূত্র নেই, তবুও বাংলাদেশের জনমনে এর তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান হচ্ছে।
এই অচলাবস্থার সুযোগে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বেইজিংয়ের প্রভাব আরও দৃশ্যমান রূপ নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান নিজের প্রথম বড় কূটনৈতিক সফরে চীনকে বেছে নেন এবং দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে বড় আকারের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত অংশীদারিত্ব নিয়ে ফলপ্রসূ বৈঠক করেন। দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের একচ্ছত্র প্রভাব ধরে রাখতে মরিয়া ভারতের জন্য ঢাকার এই কৌশলগত রূপান্তর এক বড় সতর্কবার্তা। হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে ভারত হয়তো অতীত মিত্রতার দায় শোধ করছে, কিন্তু তার বিনিময়ে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিবেশীকে চিরতরে বেইজিংয়ের প্রভাব বলয়ে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বিশ্লেষণের উপসংহারে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আদৌ ফিরতে পারবেন কি না, তার চেয়েও বড় বাস্তবতা হলো ভারতে তাঁর নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি দ্বিপাক্ষিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের সার্বভৌম আকাঙ্ক্ষা, অতীত দমন-পীড়নের বিচারপ্রক্রিয়া এবং নয়াদিল্লির আঞ্চলিক কূটনীতির এই সংঘাতময় বাস্তবতায় ভারত শেষ পর্যন্ত কোন পথ বেছে নেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...