শিরোনামঃ
জাতীয় দলের ফুটবলার আল আমিনকে ১৫ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করেছে ফিফা বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের ব্যাংক হিসাব খোলার নির্দেশনা জারি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নতুন চার সদস্যের শ্রদ্ধা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেনি কেউ, ভোট বৃহস্পতিবার: ইসি সচিব ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইমরান খানকে হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ মিয়ানমারের বক্তব্যে বাংলাদেশের উদ্বেগ কারাগারের নাম বদলে ‘কাস্টডিয়াল অ্যান্ড কারেকশন সার্ভিস’ করার উদ্যোগ সমাজের সবাই এগিয়ে এলে অনেক বড় সমস্যার সমাধান করা সম্ভব : প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা: প্রধানমন্ত্রী এআই ও সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার রোধে সচেতনতার বিকল্প নেই : তথ্যমন্ত্রী
মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:২৯ অপরাহ্ন

তিন দশকে ১৮০০ কোটি খরচ: তবু থামেনি মশার দাপট ও ডেঙ্গু

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬

মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ ও মশাবাহিত প্রাণঘাতী ডেঙ্গু প্রতিরোধে গত তিন দশকে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের কোষাগার থেকে খরচ হয়ে গেছে অন্তত ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। কেবল সাম্প্রতিক চার অর্থবছরেই মশক নিধনের পেছনে ব্যয় ছাড়িয়ে গেছে প্রায় ৫৪১ কোটি টাকা। তবে বাজেটের এই বিপুল অঙ্কের টাকা ফগার মেশিনের ধোঁয়া ও কীটনাশক ছিটানোতে খরচ হলেও তার সুফল পাননি নগরবাসী। বছর ঘুরে বর্ষা এলেই রাজধানীতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর মিছিল নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানো রোগীদের প্রায় অর্ধেকই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার বাসিন্দা। কীটতত্ত্ব গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, আগস্টের শেষ দিক থেকে সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে এডিস মশাবাহিত এই রোগের প্রকোপ আরও তীব্র রূপ নিতে পারে।
জনস্বাস্থ্য ও নগর বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, মশা দমনে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির পরিবর্তে বছরের পর বছর ধরে সনাতন ও ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি আঁকড়ে ধরে রেখেছে সংস্থা দুটি। একই ধরনের কীটনাশক বারবার প্রয়োগ করার ফলে মশার মধ্যে ওষুধপ্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরি হয়েছে, যার ফলে প্রচলিত কীটনাশকে এখন আর মশা মরছে না। এর ওপর রয়েছে নিম্নমানের ওষুধ কেনা এবং মশক নিধন যন্ত্রপাতির কেনাকাটায় দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ। গবেষকদের মতে, মশা নিয়ন্ত্রণের মতো একটি জটিল জৈবিক বিষয়কে বিজ্ঞানের ওপর ছেড়ে না দিয়ে নিছক আমলাতান্ত্রিক কেনাকাটা ও লোকদেখানো কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কারণেই হাজার কোটি টাকা খরচের পরও সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি।
বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মশক নিধন খাতে বরাদ্দের পরিধি প্রতি বছরই স্ফীত হয়েছে। গত চার অর্থবছরে কেবল ডিএনসিসি ব্যয় করেছে প্রায় ৩৮৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং ডিএসসিসির খরচ হয়েছে প্রায় ১৫৫ কোটি টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই মশা মারতে ডিএনসিসি বরাদ্দ রেখেছে ১১৭ কোটি টাকা, যার বড় অংশই ব্যয় হবে কীটনাশক ক্রয় ও আউটসোর্সিং কার্যক্রমে। অন্যদিকে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে বর্তমান দ্বিখণ্ডিত কাঠামোর ২৭ অর্থবছরের হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনা, পরিবহন এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা মেটাতেই ১ হাজার ২৭৫ কোটি টাকার বেশি অর্থ গলে গেছে। ২০১২ সালে দুই সিটি করপোরেশন বিভক্ত হওয়ার পর থেকে মশক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদই ব্যয় হয়েছে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি।
অর্থের এই বিপুল অপচয়ের সমান্তরালে অতীতে যুক্ত হয়েছিল একাধিক উদ্ভট ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন কর্মসূচি। বিশেষজ্ঞদের মতে, মশা মারার নামে ড্রেনে গাপ্পি মাছ ছাড়া, জলাশয়ে হাঁস ও ব্যাঙ অবমুক্ত করা, গাছে ফিঙে পাখি বসানোর আশায় কদমগাছ রোপণ কিংবা প্রতিটি বাড়ির ছাদে ড্রোন উড়িয়ে লার্ভা খোঁজার মতো উদ্যোগগুলো ছিল চরম অপেশাদার ও কল্পনাপ্রসূত। বিশ্বের কোনো উন্নত বা উন্নয়নশীল শহরে এ জাতীয় কাল্পনিক পদ্ধতির মাধ্যমে মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণের কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলেনি। তৎকালীন সিটি প্রশাসকদের এমন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড কেবল প্রচারের খোরাক জুগিয়েছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে মশার বংশবৃদ্ধি বিন্দুমাত্র থামাতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে সিটি করপোরেশনের শীর্ষ পর্যায় থেকেই স্বীকার করতে হয়েছিল যে, মশা নিধনে ভুল ও অকার্যকর পথ অনুসরণের কারণে শুধু জনগণের টাকারই অপচয় হয়েছে।
কীটতত্ত্ববিদদের মতে, বর্তমান বর্ষা মৌসুমের জমে থাকা পানিতে এডিস মশার ব্যাপক প্রজনন সম্পন্ন হয়েছে, যা ডেঙ্গুর বিস্তারকে দ্রুততর করার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। এই অবস্থায় সনাতনি স্প্রে করার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর বাসাবাড়ির চারপাশে জরুরি ভিত্তিতে হটস্পটভিত্তিক লার্ভিসাইডিং ও অ্যাডাল্টিসাইডিং জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়মিত কীটনাশক পরীক্ষার মাধ্যমে কার্যকর উপাদান নির্বাচন এবং জীববিজ্ঞানী ও কীটতত্ত্ববিদদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী ‘ভেক্টর কন্ট্রোল ইউনিট’ গঠন করা ছাড়া মশার স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব।
দুই সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা দাবি করছেন, নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি অভিযোগের ভিত্তিতে তিন গুণ জনবল নামিয়ে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তদের ঠিকানা সংগ্রহ করে দ্রুত কুইক রেসপন্স টিম পাঠানোর মাধ্যমে উৎস ধ্বংসের চেষ্টা চলছে। তবে নগরবাসীর অভিজ্ঞতা বলছে, মাঠপর্যায়ে মশক নিধন কর্মীদের নিয়মিত দেখা মেলে না এবং নামমাত্র ওষুধ ছিটানোর পর মশার উপদ্রব আগের মতোই বহাল থাকে। তাই দায়সারা ধোঁয়া ছিটানো এবং অদ্ভুত সব প্রকল্পের পেছনে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা অপচয় না করে বিজ্ঞানসম্মত সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার কঠোর প্রয়োগই রাজধানীকে ডেঙ্গুর প্রাণঘাতী ঝুঁকি থেকে রক্ষা করার একমাত্র পথ।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


এ জাতীয় আরো খবর...