শিরোনামঃ
হাসপাতালের সিসিইউতে ভর্তি জ্বালানিমন্ত্রী টুকু শ্বশুরবাড়ির সাথে সম্পর্ক: অভিজ্ঞতা থেকে ৬টি পরামর্শ বিপিএলে ফিক্সিং : সাবেক পরিচালকসহ তিনজন নিষিদ্ধ থার্ড টার্মিনালের র‌্যাম্প থেকে পিকআপ পড়ে বিমানবাহিনীর ৩ সদস্য নিহত সরকারি অর্থের অপচয় মেনে নেয়া হবে না: অর্থমন্ত্রী স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী সীমান্ত নজরদারিতে যুক্ত হচ্ছে থার্মাল ও নাইট ভিশন ড্রোন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক বরখাস্ত বেআইনি: হাইকোর্ট যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে ফিরলে ইরানও প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে আইপিইউ: শামা ওবায়েদ
বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩৬ পূর্বাহ্ন

বাড়ল গ্যাস সংকট: এলএনজি সরবরাহ নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করল কাতার

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান তীব্র সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই যুদ্ধাবস্থা ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে কাতার এনার্জি তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহে ঘোষিত ‘ফোর্স মেজর’-এর মেয়াদ আগামী নভেম্বর মাস পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ এশিয়া ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি ক্রেতা দেশ দীর্ঘমেয়াদে গভীর জ্বালানি সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে।
ফোর্স মেজর এবং হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি
বাণিজ্যিক চুক্তির ভাষায় ‘ফোর্স মেজর’ বলতে এমন এক অপ্রত্যাশিত ও অনিবার্য পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামারীর মতো কারণ দেখিয়ে কোনো পক্ষ চুক্তির বাধ্যবাধকতা পালন থেকে সাময়িক অব্যাহতি লাভ করে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ জাহাজ চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, কাতার এনার্জি গত ৪ মার্চ প্রথমবারের মতো তাদের এলএনজি কার্যক্রম স্থগিত করে এই ফোর্স মেজর ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল। এরপর থেকে বৈশ্বিক বাজার থেকে কাতার কার্যত তাদের অধিকাংশ এলএনজি কার্গো সরবরাহ গুটিয়ে নিয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় এই স্থগিতাদেশের মেয়াদ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হলো।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে চরম অনিশ্চয়তা
দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী দেশ হলো কাতার। প্রতি বছর সেখান থেকে অন্তত ৪০ কার্গো এলএনজি দেশের ঘাটতি মেটাতে আমদানি করা হয়। সবকিছু ঠিক থাকলে দীর্ঘমেয়াদি দুটি চুক্তির আওতায় চলতি অর্থবছরে কাতার থেকে মোট ৫৬ কার্গো এলএনজি আসার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধাবস্থার কারণে পেট্রোবাংলা এখন এই নির্ধারিত কার্গোর অর্ধেক পেলেই স্বস্তি বোধ করবে বলে জানিয়েছে। ব্লুমবার্গের বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দোহা নিউজ নিশ্চিত করেছে যে, বাংলাদেশের জন্য এলএনজি সরবরাহে ফোর্স মেজরের মেয়াদ সেপ্টেম্বরের পর আরও বাড়ানো হয়েছে। যদিও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কাতার এনার্জির তরফ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো নোটিস তারা এখনো হাতে পাননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে না পেলেও অন্যান্য দেশের ফোর্স মেজরের মেয়াদ বৃদ্ধির খবরটি তারা অবগত আছেন।
বিকল্প পথে হাঁটার চেষ্টা ও স্পট মার্কেটের চড়া দাম
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে এলএনজি আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো এখন বিকল্প উপায়ে গ্যাস সংগ্রহের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে গ্যাসের তীব্র সংকট তৈরি হওয়ায় সরকার সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) এলএনজি আমদানির একটি জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু এই পদ্ধতিতে গ্যাস কিনতে গিয়েও বড় ধরনের হোঁচট খেতে হয়েছে। সরবরাহকারীরা অন্তত ছয়টি এলএনজি কার্গো দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। এর ফলে দেশে গ্যাসের বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা ইতিমধ্যে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, ভারী শিল্প-কারখানা, আবাসিক রান্নার কাজ এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
দীর্ঘমেয়াদি উৎস থেকে গ্যাস পাওয়ার ক্ষেত্রে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় বাধ্য হয়েই আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট বা খোলা বাজার থেকে এলএনজি কেনা বাড়িয়েছে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের ভেতরে গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে এখন অর্থের দিকে না তাকিয়ে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে গ্যাস কেনা হচ্ছে। গত সপ্তাহেই পেট্রোবাংলা স্পট মার্কেট থেকে দুই কার্গো এলএনজি কিনেছে, যার প্রতি এমএমবিটিইউর দাম পড়েছে ২৪ ডলারের ওপরে, যা স্বাভাবিক দামের চেয়ে অনেক বেশি। পাশাপাশি, এলএনজি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং কেনাকাটায় প্রতিযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে পেট্রোবাংলা সরবরাহকারীর তালিকা আরও সম্প্রসারিত করছে। বর্তমানে তাদের তালিকায় ২৯টি কোম্পানি রয়েছে। নতুন করে আরও ৯টি কোম্পানিকে যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করে তালিকাভুক্ত করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে।
বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে কাতার এনার্জি
হরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের কারণে কাতার নিজেও বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বৈশ্বিক বাজার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইসিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে কাতার বিশ্ববাজারে মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে। অথচ এর আগের বছর ঠিক একই সময়ে তারা ৫০৯টি কার্গো রপ্তানি করেছিল। রপ্তানি এই ভয়াবহ মাত্রায় কমে যাওয়ার কারণে গ্যাস বিক্রি থেকে কাতার ইতিমধ্যে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার বা ২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউরো রাজস্ব হারিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কাতার এনার্জির প্রেসিডেন্ট, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং কাতারের জ্বালানি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সাদ শেরিদা আল-কাবি জানিয়েছেন, ইরানের ছোড়া বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে কাতারের নিজস্ব এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা অন্তত ১৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে তীব্র জ্বালানি হাহাকার
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানি বাজার সম্পর্কিত গবেষণা ও বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি সংকটের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যৌথভাবে পাকিস্তানের মোট এলএনজি আমদানির ৯৯ শতাংশ, বাংলাদেশের ৭২ শতাংশ এবং ভারতের ৫৩ শতাংশ একাই সরবরাহ করে থাকে। এসব দেশে এলএনজির মূল ব্যবহার মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প কারখানায় কেন্দ্রীভূত। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ লাইন প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে এই তিন দেশই চরম সংকটে পড়েছে। বাধ্য হয়ে ভারত তাদের শিল্প খাতে এলএনজি সরবরাহে রেশনিং বা বরাদ্দ সীমিত করেছে, বাংলাদেশ বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কেনার দিকে ঝুঁকেছে এবং পাকিস্তান জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হয়েছে। আগামী অক্টোবর পর্যন্ত পাকিস্তানের জন্যও ফোর্স মেজর বহাল থাকবে বলে তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।


এ জাতীয় আরো খবর...