একটি রাষ্ট্রের মানবিক মানদণ্ড পরিমাপের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটা নিরাপদে বেড়ে উঠছে। কিন্তু প্রতিদিন ভোরের খবরের কাগজ খুললে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় চোখ বোলালে যে আতঙ্কের ছবি ভেসে ওঠে, তা কোনো সুস্থ সমাজের চিত্র হতে পারে না। রাজধানীর সদরঘাট থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত মফস্বলের মেঠোপথ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন আজ প্রতিটি অভিভাবকের চোখে মুখে আতঙ্ক হয়ে জমেছে—সন্তান ঘর থেকে বের হলে কি নিরাপদে মায়ের কোলে ফিরবে? সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এবং রাজপথের বাস্তবতা বলছে, আমাদের শৈশব আজ এক অদৃশ্য অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। এটি নিছক পথ ভুলে হারিয়ে যাওয়া বা সাময়িক কোনো ছন্দপতন নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে এক ভয়ংকর অন্ধকার অপরাধজগত, যার বিষবাষ্প ক্রমাগত গ্রাস করছে গোটা দেশকে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে শিউরে উঠতে হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মাত্র সাত মাসে সারা দেশের থানাগুলোতে শিশু নিখোঁজ সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি বা জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ৭১৭টি। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে দুই হাজারেরও বেশি এবং প্রতিদিন অন্তত ৭১টি নিষ্পাপ মুখ চোখের পলকে হারিয়ে গেছে পরিবারের বুক থেকে। মাসভিত্তিক হিসাবের দিকে তাকালে দেখা যায়, জানুয়ারিতে সংখ্যাটি ছিল ১ হাজার ৭৬৮, ফেব্রুয়ারিতে কিছুটা কমে ১ হাজার ৩৯২ হলেও মার্চে তা আবার বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭০৮-এ। এরপর এপ্রিলে ২ হাজার ৬৬০, মে মাসে ২ হাজার ৫৬ এবং জুনে এসে এই সংখ্যা এক লাফে ৩ হাজার ১৬৩-তে গিয়ে ঠেকে। জুলাই মাসে সংখ্যাটি ৩১১ দেখানো হলেও এর পেছনে রাষ্ট্রীয় স্থবিরতা ও অস্থিরতার বাস্তবতা কতটা দায়ী, তা গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। পুলিশ প্রশাসন দাবি করতে পারে যে, নিখোঁজদের মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু যে ২ হাজার ৩৮টি অবুঝ প্রাণের কোনো হদিস আজ পর্যন্ত মেলেনি, তাদের পরিণতি কী হয়েছে? এই তেরো শতাংশ নিখোঁজ শিশুর হিসাব কি শুধুই একটি পরিসংখ্যানের অঙ্ক, নাকি দুই সহস্রাধিক পরিবারে জীবন্ত নরক নেমে আসার দলিল?
ঝিনাইদহের এক সাধারণ কাপড় বিক্রেতা কিংবা ঢাকার সাভারের সন্তানহারা মায়ের বুকফাটা আর্তি যখন সংবাদ সম্মেলনের টেবিলে আছড়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংবেদনশীলতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠে। দিনের পর দিন থানার বারান্দায় ঘুরে জিডি করার অনুমতি পেতে সাধারণ মানুষকে যে অবর্ণনীয় লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়, তা জননিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম ঔদাসীন্যকে সামনে এনে দেয়। ভুক্তভোগী মা-বাবাকে যখন থানা থেকে শুনতে হয় ‘তোমার বাচ্চা হারালে আমরা কী করব’, তখন বুঝতে বাকি থাকে না নাগরিকের জীবনের মূল্য এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কাছে কতটুকু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া শিশুর সন্ধান মেলে, অপহরণকারী চক্রের হুমকি আসে মুঠোফোনে, তবু তদন্তের ফাইল এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতেই মাসের পর মাস পার হয়ে যায়। এই প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা অপরাধীদের সাহস বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রায়ই যুক্তি দেওয়া হয় যে, বয়সের ভিত্তিতে নিখোঁজের ধরন আলাদা। পুলিশের তথ্যানুযায়ী, শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে পথ ভুলে যাওয়া বা অপরিচিত জায়গায় হারিয়ে যাওয়ার প্রবণতাই বেশি। অন্যদিকে দশ থেকে সতেরো বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে মানসিক অভিমান, পড়াশোনার মাত্রাতিরিক্ত চাপ, বয়ঃসন্ধিকালীন আবেগ, কিংবা টিকটক ও অনলাইন মাধ্যমে ভুয়া সম্পর্কের ফাঁদে পড়ে ঘর ছাড়ার প্রবণতা দেখা যায়। পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, উদ্ধার হওয়ার পর অনেক পরিবারই মামলা না করে সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে আপস করে নেয়। কিন্তু এই ব্যাখ্যাকে একমাত্র সত্যি বলে ধরে নেওয়া আত্মঘাতী অন্ধত্বের শামিল। কারণ সমাজ ও অপরাধবিজ্ঞানীদের বাস্তব অনুসন্ধান বলছে, প্রতিটি হারিয়ে যাওয়ার আড়ালে নিছক পারিবারিক দূরত্ব কাজ করে না; দেশের ভেতরে ও বাইরে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ সিন্ডিকেট এই নিখোঁজের ফাঁদকে লাভজনক শিল্পে পরিণত করেছে।
শিশু পাচার ও অপহরণের এই কারবার আজ আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা শিশুদের একটি বড় অংশকে ব্যবহার করা হচ্ছে নিষিদ্ধ সব অপরাধের চালিকাশক্তি হিসেবে। সীমান্ত পেরিয়ে ভিনদেশের নিষিদ্ধ পল্লীতে বিক্রি করে দেওয়া থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ অপরাধ চক্রের কাছে শিশুদের তুলে দেওয়ার তথ্য মোটেও অমূলক নয়। রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন বড় শহরের রাস্তায় চোখ মেললেই দেখা যায় পঙ্গু ও বিকলাঙ্গ শিশুদের করুণ মুখ। বহু শিশুকে সুকৌশলে অপহরণ করে দীর্ঘদিন অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে অঙ্গহানি ঘটিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয় ভিক্ষাবৃত্তির সিন্ডিকেটে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবৈধ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বাণিজ্যের যে রমরমা রূপ সামনে এসেছে, তার শিকার হিসেবেও শিশুদের ব্যবহার করার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এছাড়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের চরম অপব্যবহারের মাধ্যমে অবুঝ শিশুদের দিয়ে অশ্লীল কনটেন্ট তৈরি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের এক নোংরা বাজার গড়ে উঠেছে, যা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার খোলসকে ভেতর থেকে ধসিয়ে দিচ্ছে।
শহরাঞ্চলের সাম্প্রতিক অপরাধের গতিপ্রকৃতি আরও বেশি শিউরে ওঠার মতো। রাজধানীর ব্যস্ততম রাজপথগুলো এখন শুধু সাধারণ ছিনতাইয়ের ক্ষেত্র নয়, বরং তরুণী ও স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের নিশানা করে গড়ে উঠেছে ভয়ংকর অপহরণ চক্র। কখনো মিথ্যা বন্ধুত্বের ফাঁদ পেতে, কখনো মোটরসাইকেল বা প্রাইভেটকারে লিফট দেওয়ার মিথ্যা প্রলোভনে, আবার কখনো বা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তরুণ-তরুণীদের। সেখানে জোরপূর্বক আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে পরিবারের কাছ থেকে দাবি করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ। ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, আদাবর কিংবা তিনশ ফিট ও কুড়িল বিশ্বরোডের মতো নতুন আবাসিক ও ফাঁকা এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরার অনুপস্থিতি এবং কিশোর গ্যাংগুলোর প্রকাশ্য বিচরণ এই অপরাধী চক্রগুলোকে নির্বিঘ্নে তাদের জাল বিস্তার করার সুযোগ করে দিচ্ছে।
অপরাধ তদন্তে বিশ্বজুড়ে একটি প্রচলিত পরিভাষা রয়েছে—‘গোল্ডেন আওয়ার’। শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা উদ্ধার অভিযানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ের মধ্যে যত দ্রুত প্রযুক্তির সহায়তায় নজরদারি বাড়ানো যায় এবং বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া যায়, শিশুকে জীবিত ও অক্ষত ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা ততটাই উজ্জ্বল থাকে। অতীতে এমন বহু নজির দেখা গেছে, যেখানে জরুরি সতর্কবার্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ‘মুন অ্যালার্ট’ বা ডিজিটাল বিলবোর্ডের তাৎক্ষণিক ব্যবহারের ফলে চাপের মুখে অপহরণকারীরা শিশুদের ফেলে পালাতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে এই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ধার তৎপরতা এখনো একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিখোঁজের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার আগেই শিশুটিকে অন্য জেলা বা সীমান্ত এলাকায় সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হয় সংঘবদ্ধ চক্রগুলো। আন্তঃথানা সমন্বয়ের যে নিদারুণ ঘাটতি আমাদের পুলিশি ব্যবস্থায় বিদ্যমান, তাতে একটি এলাকার অপরাধী অনায়াসেই অন্য এলাকায় গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে যায়।
এই গভীর মানবিক সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজের সমন্বিত দায়বদ্ধতা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সবার আগে তাদের সনাতনী ও ঔদাসীন্যপূর্ণ মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি থানায় শিশু নিখোঁজ সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ পাওয়া মাত্রই সেটিকে নিছক একটি জিডি হিসেবে ফেলে না রেখে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জরুরি উদ্ধার অভিযান শুরু করার প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে। প্রতিটি জেলায় আলাদা ডেডিকেটেড ‘চাইল্ড রেসকিউ সেল’ গঠন করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে সারা দেশের স্কুল, কলেজ, বিনোদন কেন্দ্র ও জনবহুল স্থানগুলোকে আধুনিক ফেস-রিকগনিশন ক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি নেটওয়ার্কের আওতায় এনে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। নিখোঁজ হওয়া শিশুর ছবি ও তথ্য এক নিমেষেই দেশের সব থানা, রেলওয়ে স্টেশন, বাস টার্মিনাল এবং স্থলবন্দরগুলোতে পৌঁছে দেওয়ার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে অভিভাবকত্বের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনতে হবে। সন্তানদের শুধু পড়াশোনার অসুস্থ প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে না দিয়ে তাদের সঙ্গে মানসিক দূরত্বের দেয়ালটি ভেঙে ফেলা জরুরি। যে শিশুরা পরিবারের ভেতর ভালোবাসা ও সহমর্মিতা পায় না, তারাই বাইরের জগতের রঙিন প্রলোভন ও ডিজিটাল প্রতারণার শিকারে পরিণত হয় দ্রুত। প্রাথমিক স্তর থেকেই শিশুদের আত্মরক্ষা এবং অপরিচিত মানুষের আচরণ বোঝার শিক্ষা দিতে হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে পুলিশ বা সাহায্যকারী প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়, অন্তত বাবা-মায়ের মুঠোফোন নম্বর ও স্থায়ী ঠিকানা মুখস্থ রাখার মতো মৌলিক সতর্কতাগুলো তাদের মগজে গেঁথে দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাধ্যতামূলক মানসিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে যেকোনো সংকট বা হতাশায় শিশু বা কিশোরটি ঘর ছেড়ে পালানোর মতো চরম ভুল পথ বেছে না নেয়।
একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের কোনো অর্থই থাকে না, যদি সেই দেশের শিশুরা ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা না পায়। শৈশবকে অনিরাপদ রেখে কোনো সভ্য সমাজ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। নিখোঁজ হওয়া প্রতিটি শিশুর সঙ্গে মূলত হারিয়ে যায় একটি পরিবারের অস্তিত্ব, একটি সম্ভাবনাময় স্বপ্ন এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা। রাষ্ট্রযন্ত্রকে উপলব্ধি করতে হবে যে, অপহৃত বা নিখোঁজ শিশুর কান্না শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি সামগ্রিক বিচারহীনতা ও দুর্বল শাসনব্যবস্থার মুখে এক বড় চপেটাঘাত। এখনই যদি আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে পাচারকারী ও অপহরণকারী চক্রের শিকড় উপড়ে ফেলা না যায়, তবে এই অন্ধকারের ঢেউ অচিরেই প্রতিটি ঘরের দরজায় আঘাত হানবে। আমাদের শিশুদের জন্য একটি ভয়হীন, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ নিশ্চিত করাই হোক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।