দেশের সামগ্রিক শিল্প খাতে বিরাজমান মন্থরতা ও স্থবিরতা ক্রমেই আরও গভীর সংকটের রূপ নিচ্ছে| নতুন শিল্প কারখানা স্থাপন কিংবা বিদ্যমান কারখানার সম্প্রসারণে উদ্যোক্তাদের অনীহার প্রভাব সরাসরি দৃশ্যমান হচ্ছে আমদানি বাণিজ্যে| চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে শিল্পোৎপাদন ও অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে জড়িত প্রায় সব মৌলিক উপকরণের ঋণপত্র বা এলসি খোলার হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে| একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমেছে পূর্বের খোলা এলসির নিষ্পত্তির হারও| কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারী ও হালকা শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে কারখানার কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলার হার সর্বোচ্চ প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে| গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট, বিনিয়োগের অনুৎসাহী পরিবেশ এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের ধারাবাহিক পতনের কারণেই শিল্প খাতের এই নিম্নমুখী ধারা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টরা|
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জুলাই মাসে শিল্পের ভিত্তি হিসেবে পরিচিত মূলধনি বা ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানির জন্য এলসি খোলা কমেছে ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং একই সময়ে এসব যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ| এই পতন নতুন কোনো ঘটনা নয়; বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও মূলধনি যন্ত্রপাতির সামগ্রিক আমদানি কমেছিল ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ| আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, শিল্পের চাকা সচল রাখার প্রধান উপকরণ অর্থাৎ কাঁচামাল আমদানিতেও বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে| জুলাইয়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলা কমেছে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং নিষ্পত্তি কমেছে ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ| এছাড়া ভারী যন্ত্রপাতির বাইরে ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিবিধ যন্ত্রাংশ আমদানির এলসি খোলার হার কমেছে ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ এবং এ খাতের এলসি নিষ্পত্তির হার হ্রাস পেয়েছে ১০ শতাংশেরও বেশি|
যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির এই স্থবিরতার সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে দেশের বড় বড় কারখানার সামগ্রিক উৎপাদন সূচকে| বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘মেজর ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস: মান্থলি আপডেট’-এর জুলাই সংখ্যার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক নজিরবিহীন চিত্র| সেখানে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ মেয়াদে দেশের বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন সূচক ঋণাত্মক দশমিক ৩৮ শতাংশে নেমে গেছে| এর আগের তিন অর্থবছরে যেখানে এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ, ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং ৬ দশমিক ২ শতাংশ, সেখানে উৎপাদন সূচকের এই ঋণাত্মক রূপ দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এবারই প্রথম রেকর্ড করা হলো| উৎপাদন কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি তো দূরের কথা, বিদ্যমান শিল্প ইউনিটগুলো সচল রাখাই এখন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে|
একই বাস্তবতার প্রতিধ্বনি মিলছে বেসরকারি খাতের সামগ্রিক ঋণ বিতরণের চিত্রেও| কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা যেখানে ছিল সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির মধ্যেও অন্তত ৮ দশমিক ৫ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা, সেখানে চলতি বছরের জুন শেষে বেসরকারি খাতে প্রকৃত ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে| অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকের সামান্য বেশি বাস্তবায়িত হয়েছে| অথচ একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ, যা বেসরকারি খাতের চেয়ে প্রায় সাত গুণ বেশি| এই পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের চাপে বেসরকারি খাতের ঋণ পাওয়ার সুযোগ যেমন সীমিত হয়েছে, তেমনি উদ্যোক্তাদের দিক থেকেও নতুন মূলধনের চাহিদায় বড় ধরনের ভাটা পড়েছে|
শিল্পে এই অচলাবস্থার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট| শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে জানিয়েছেন, দেশে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সংকটের কারণে বাস্তবে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না| উপরন্তু বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে সরকার বিদ্যুৎ কিনলেও সময়মতো বিল পরিশোধ করতে পারছে না| এর ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে অর্থায়ন করা ব্যাংকগুলো যেমন বিপাকে পড়ছে, তেমনি চরম গ্যাস ও বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে উদ্যোক্তারা নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে সাহস পাচ্ছেন না| জ্বালানি নিশ্চয়তা ছাড়া বেসরকারি খাতের ঋণ বা বিনিয়োগ কোনোটিই বাড়ানো সম্ভব নয়|
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান স্বীকার করেছেন যে, দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা চলছে| তবে তাঁর মতে, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পরিস্থিতি উত্তরণে নীতি সুদহার কমানোসহ ঋণের চাহিদা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে| তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রধান প্রতিশ্রুতিই ছিল কর্মসংস্থান বাড়ানো ও অর্থনীতিকে সচল করা| তবে শুধু আর্থিক নীতি দিয়ে এই সংকট কাটবে না; গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, আধুনিক বন্দর ও অবকাঠামো সুবিধার স্থায়ী সমাধান দেওয়া সরকারের নির্বাহী বিভাগের মৌলিক দায়িত্ব|
এদিকে শিল্পের মৌলিক উপাদানগুলোর আমদানি কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে দেশের সামগ্রিক এলসি খোলার ব্যয় কিন্তু কমেনি| জুলাই মাসে মোট ৬ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি| মূলত বিশ্ববাজারের অস্থিরতায় জ্বালানি তেল আমদানি প্রায় ৬৯ শতাংশ এবং খাদ্যপণ্য আমদানি ২৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলেই সামগ্রিক ব্যয় স্ফীত হয়েছে| অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রার একটি বিরাট অংশ চলে যাচ্ছে তাৎক্ষণিক জ্বালানি ও খাদ্য চাহিদা মেটাতে, যার সুফল শিল্পের স্থায়ী কাঠামোগত বিকাশে কোনো অবদান রাখতে পারছে না| গ্যাস ও বিদ্যুতের টেকসই সরবরাহ নিশ্চিত করে বিনিয়োগের সার্বিক পরিবেশ স্বাভাবিক করা না গেলে শিল্পের এই দীর্ঘমেয়াদি সংকোচন দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে গভীর সংকটে নিমজ্জিত করবে|