ভিন্ন নাম, ঠিকানা ও পেশার মুখোশ পরে একের পর এক অপরাধ করে চলেছে বিভিন্ন অপরাধীচক্র| এক এলাকায় অপরাধ ঘটিয়ে অন্য এলাকায় গিয়ে নতুন পরিচয় ধারণ করার মাধ্যমে তারা নির্বিঘ্নে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে| অপরাধীদের অতীত কর্মকাণ্ড শনাক্তকরণে কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস বা তথ্যভাণ্ডারের দুর্বলতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও বিচারিক সংস্থাগুলোর মধ্যকার সমন্বয়হীনতার কারণে গুরুতর অপরাধের মাত্রা যথাযথভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে না| সরকারি চাকরিতে পুলিশ বা বিশেষ শাখার মাধ্যমে প্রার্থীর অতীত কর্মকাণ্ড যাচাইয়ের সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকলেও বেসরকারি খাতের জন্য কেন্দ্রীয় কোনো যাচাই ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি| ফলে গৃহকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী কিংবা পরিবহন শ্রমিক থেকে শুরু করে করপোরেট কর্মকর্তা—কোনো স্তরের কর্মীর ক্ষেত্রেই নিয়োগের আগে অতীতের ফৌজদারি অপরাধের ইতিহাস জানার সুনির্দিষ্ট ও দ্রুত কোনো মাধ্যম নেই| বাসাভাড়া, চাকরি প্রদান কিংবা বাণিজ্যিক লেনদেনে মানুষের পরিচয় যাচাই এখনও কাগুজে নথি ও মৌখিক তথ্যের ওপর নির্ভরশীল থাকায় সার্বিক জননিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে|
সম্প্রতি ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে হাত ও মুখ স্কচটেপ দিয়ে পেঁচানো অবস্থায় ইসমাঈল হোসেন নামের এক ব্যক্তির মরদেহ বাস থেকে ফেলে দেওয়ার ঘটনায় চালক ও তার সহযোগীকে গ্রেপ্তারের পর এই সংকট তীব্রভাবে সামনে এসেছে| বাসের সুপারভাইজার ও চালকের বিরুদ্ধে একাধিক ডাকাতি ও মাদকের মামলা এবং আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও তারা নির্বিঘ্নে গণপরিবহন চালনার কাজে যুক্ত হয়েছিল| পরিবহন ও বেসরকারি খাতে পূর্ববর্তী রেকর্ড যাচাই না করে নিয়োগ দেওয়ার এই প্রবণতাই অপরাধীদের বারবার নতুন সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে| এমনকি থানাগুলোতে আধুনিক বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থার পর্যাপ্ততা না থাকায় গ্রেপ্তার হওয়া অপরাধীরা প্রায়ই নিজেদের নাম-ঠিকানা বদলে ফেলে বিভ্রান্তি তৈরি করে| পরবর্তীতে কারাগারে বায়োমেট্রিক পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের আসল পরিচয় উন্মোচিত হওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে, যা দেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার প্রাথমিক স্তরের বড় এক দুর্বলতা|
শহরাঞ্চলে বাসাভাড়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের অন্ধকারের চিত্র বিদ্যমান| বাড়ির মালিকরা সাধারণত জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি, ছবি বা রেফারেন্স সংগ্রহ করলেও কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অন্য কোনো থানায় মামলা বা সাজার ইতিহাস রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের কোনো উন্মুক্ত বা আইনি ব্যবস্থা তাদের হাতে নেই| ফলে ভাড়াটিয়া সেজে বাসাভাড়া নিয়ে কিছুদিন পর ডাকাতি করে পালিয়ে যাওয়া কিংবা পরিচয় নিশ্চিত না করে গৃহকর্মী নিয়োগের পর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে| কেবল স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা ওয়ার্ড কাউন্সিলরের দেওয়া প্রচলিত ‘চারিত্রিক সনদ’ দিয়ে কোনো ব্যক্তির অপরাধের ইতিহাস যাচাই করা সম্ভব নয়, কারণ এতে কোন ব্যক্তি অতীতে কোথায় ছিলেন বা তাঁর বিরুদ্ধে কী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল তার কোনো হালনাগাদ বিবরণ থাকে না|
আইনশৃঙ্খলা ও বিচার প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে তথ্য একেবারেই নেই তা নয়; পুলিশ, আদালত, প্রসিকিউশন ও কারাগারের নিজস্ব ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার রয়েছে| ই-কোর্ট, অনলাইন জিডি বা কেন্দ্রীয় ক্রাইম ডেটাবেইস আলাদাভাবে কার্যকর হলেও এগুলোর মধ্যে পারস্পরিক কোনো কার্যকর ডেটা ইন্টারকানেকশন বা আন্তঃসংযোগ নেই| এর ফলে এক সংস্থার সংরক্ষিত তথ্য অন্য সংস্থার কার্যক্রমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দৃশ্যমান হয় না| প্রতিবেশী ভারতে ‘ইন্টার-অপারেবল ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম’ (আইসিজেএস)-এর মাধ্যমে বিচার ও তদন্তের সব শাখাকে একক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার যে নজির তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশে এখনও তার মতো কোনো সমন্বিত কাঠামোর অনুপস্থিতি স্পষ্ট| ফলে কোনো অপরাধী জামিন পাওয়ার পর বা জেল থেকে ছাড়া পেয়ে পুনরায় একই অপরাধে জড়ালে তাকে দ্রুত ‘রিপিট অফেন্ডার’ বা পুনরাবৃত্ত অপরাধী হিসেবে শনাক্ত করতে গিয়ে পুলিশকে দীর্ঘ সময় বেগ পেতে হয়|
তবে অপরাধীদের কেন্দ্রীয় ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় সাংবিধানিক অধিকার ও মানবাধিকার সুরক্ষার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে| সম্প্রতি হাইকোর্ট জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্তদের তথ্য যুক্ত করার বিষয়ে রুল জারি করলেও ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার রোধের বিষয়টি সামনে এসেছে| মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা বা অভিযোগ থাকা মানেই তিনি দোষী নন; আদালতে অকাট্যভাবে দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সংবিধানের পরিপন্থী| এছাড়া ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন ও জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই ডেটাবেইস পরিচালনা করা জরুরি, যাতে ঢালাও উন্মুক্ত তথ্যের কারণে নির্দোষ ব্যক্তিরা সামাজিক বঞ্চনা বা পেশাগত বৈষম্যের শিকার না হন|
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানে কয়েকটি ধাপে সংরক্ষিত ও নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে| যেখানে সাধারণ জনসাধারণের জন্য ঢালাও উন্মুক্ত না রেখে কেবল পুলিশ, আদালত ও অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রবেশাধিকার সীমিত রাখা হবে| পাশাপাশি শিশু, বয়স্ক ও আর্থিক সুরক্ষার মতো স্পর্শকাতর পেশায় নিয়োগের ক্ষেত্রে গভীরতর যাচাইয়ের নিয়ম চালু করা এবং ডেটাবেইসে কেবলমাত্র চূড়ান্ত সাজাপ্রাপ্তদের তথ্য দৃশ্যমান রাখার রূপরেখা তৈরি করা যায়| খালাস পাওয়া ব্যক্তিদের অবিলম্বে অপরাধের রেকর্ড থেকে মুক্ত রাখা এবং কে কখন কার তথ্য দেখছে তা নজরদারির জন্য ‘অডিট ট্রেইল’ ব্যবস্থা থাকাও আবশ্যক| একটি নিরাপদ ও জনবান্ধব রাষ্ট্র বিনির্মাণে সমন্বিত ডেটাবেইসের আধুনিকায়ন যেমন সময়ের দাবি, তেমনি নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সমানভাবে অপরিহার্য|