দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তৃত কৃষি বলয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে যাওয়ায় জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসই সেচব্যবস্থা এক গভীর সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে| বিশেষ করে দেশের খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত বরেন্দ্র অঞ্চলের পরিস্থিতি এখন চরম উদ্বেগজনক| দশকের পর দশক ধরে অপরিকল্পিত ও মাত্রাতিরিক্ত গভীর নলকূপ দিয়ে পানি উত্তোলন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন, প্রাকৃতিক নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাধারের দ্রুত বিলুপ্তি এবং ভূ-উপরিস্থিত পানির কার্যকর ব্যবহারে অবহেলার কারণে মাটির নিচের পানির স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে| এর ফলে দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে একদিকে তীব্র সুপেয় পানির হাহাকার শুরু হয়েছে, অন্যদিকে দেশের প্রধান দানাদার ফসল বোরো ধান উৎপাদন তথা সামগ্রিক সেচনির্ভর কৃষি এক দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে|
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সাতটি প্রধান কৃষিপ্রধান জেলায় মাটির নিচের পানির প্রাকৃতিক মজুত পুনর্ভরণের হারে এক ভীতিকর চিত্র উঠে এসেছে| স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মে বছরে ১০০ থেকে ৫১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত বা ভূ-উপরিস্থিত পানি মাটির নিচে চুইয়ে জমা হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে মাত্র ১০০ থেকে ২১০ মিলিমিটারে এসে ঠেকেছে| ১৯৮৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ চার দশকের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সময়ের ব্যবধানে ওই অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির গড় স্তর ১৬ মিটার গভীরতা থেকে নেমে গিয়ে ৩৬ মিটারে পৌঁছেছে| শুষ্ক মৌসুম এলে পরিস্থিতি আরও চরম আকার ধারণ করে; নাচোল, তানোর, নিয়ামতপুর এবং পোরশার মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পানির স্তর ৩৩ থেকে ৩৬ মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে পুরোপুরি নাগালের বাইরে চলে যায়| পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাজশাহীর বেশ কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমনকি ৮০০ ফুট গভীরে খনন করেও পানির কোনো দৃশ্যমান স্তর পাওয়া যাচ্ছে না| উচ্চ বরেন্দ্র, মধ্য বরেন্দ্র এবং নিম্ন বরেন্দ্র—সব অঞ্চলেই পানির স্তর অস্বাভাবিক দ্রুততায় নেমে যাওয়ার কারণে মানুষ খাওয়ার পানি নিয়ে পর্যন্ত তীব্র সংকটে পড়ছে|
এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী বরেন্দ্র অঞ্চল| রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর ও জয়পুরহাট জেলার কৃষিব্যবস্থা প্রায় এককভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল| ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সালের দিকেও এই অঞ্চলে মাটির নিচে গড়ে মাত্র ২৬ ফুট গভীরে পানির স্তর পাওয়া যেত| কিন্তু অবিরাম গভীর ও অগভীর নলকূপ দিয়ে উত্তোলনের ফলে ২০১০ সালে তা নেমে যায় ৫০ ফুটে এবং পরবর্তীতে তা কোনো কোনো অঞ্চলে ৬০ ফুট ছাড়িয়ে বহুদূর নেমে যায়| বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর ভূগর্ভ থেকে প্রায় ৩২ ঘনকিলোমিটার পানি উত্তোলন করা হয়, যার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই সরাসরি সেচের কাজে ব্যবহার করা হয়| বাকি মাত্র ১০ শতাংশ পানি ব্যয় হয় গৃহস্থালি ও কলকারখানার কাজে| ফলে কৃষিতে পানির এই অতি-নির্ভরশীলতাই ভূগর্ভের প্রাকৃতিক একুইফারগুলোকে পুরোপুরি শুকিয়ে ফেলছে|
পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে চলতি বছরের মে মাসে সরকার বাধ্য হয়ে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার বিস্তীর্ণ জনপদকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পানি সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে| সরকারি প্রজ্ঞাপনে অত্যন্ত কঠোরভাবে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে যে, মানুষের জীবন ধারণের সুপেয় পানি ছাড়া সেচ বা অন্য কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এসব এলাকায় নতুন করে কোনো ধরনের নলকূপ স্থাপন কিংবা ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে| সরকারি এই কঠোর অবস্থানই প্রমাণ করে যে, মাটির নিচের পানির মজুত ইতোমধ্যে চরম ঝুঁকির শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে|
এই সংকটের সরাসরি আঘাত পড়ছে দেশের সেচনির্ভর কৃষিতে, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমের বোরো ধান আবাদে| কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, দেশে সেচ সুবিধাপ্রাপ্ত আবাদি জমির প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল| এমনকি গবেষণায় দেখা গেছে, বোরো চাষে ব্যবহৃত সেচের পানির প্রায় ৯১ শতাংশই সরাসরি মাটির নিচ থেকে পাম্পের মাধ্যমে তোলা হয়| সবচেয়ে বড় অপচয় ঘটছে কৃষকদের সনাতন সেচ পদ্ধতির কারণে| বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) তথ্য অনুযায়ী, বোরো মৌসুমে এক কেজি ধান উৎপাদনের জন্য কৃষকরা জমিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে গড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশ অতিরিক্ত পানি সেচ দেন, যার বড় অংশই বাষ্পীভূত হয়ে বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে অপচয় হয়| অথচ এই অতিরিক্ত পানি ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কোনো কাজেই আসে না| ফলে পানির এই বিপুল অপচয় রোধ করে সেচ ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি করাই এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ|
বিশেষজ্ঞ ও কৃষি প্রকৌশলীদের মতে, এই সংকটের হাত থেকে বাঁচতে হলে কেবল নলকূপের গভীরতা বাড়িয়ে সমস্যা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই| কারণ যত গভীরে যাওয়া হবে, পানির স্থায়িত্ব ততই কমে আসবে এবং মাটির ভূতাত্ত্বিক ভারসাম্যে বড় ধরনের স্থায়ী বিপর্যয় ঘটবে| এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো—কৃষিতে ব্যাপকভিত্তিতে ‘স্মার্ট ইরিগেশন’ বা আধুনিক পানিসাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটানো| বরেন্দ্র ও সংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে নতুন করে গভীর নলকূপ স্থাপন বন্ধ রেখে পুরোনো নষ্ট নলকূপগুলো মেরামতের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে বিএডিসি| তবে এর স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন বৃষ্টির পানি ধরে রাখার বিশাল জলাধার নির্মাণ, কৃত্রিম উপায়ে ভূগর্ভে পানি প্রবেশ করিয়ে রিচার্জ বা পুনর্ভরণ নিশ্চিত করা এবং মৃতপ্রায় পুকুর, খাল ও নদ-নদীগুলো দ্রুত পুনঃখনন করে ভূ-উপরিস্থিত পানির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা| এর পাশাপাশি কৃষকদের বোরো ধানের মতো অতিরিক্ত পানিনির্ভর ফসলের বিকল্প হিসেবে কম পানিতে চাষযোগ্য গম, ভুট্টা, ডাল ও তেলবীজের মতো উচ্চমূল্যের ফসল এবং খরাসহিষ্ণু নতুন উদ্ভাবিত ধানের জাত চাষে উদ্বুদ্ধ করতে হবে| সেচব্যবস্থায় দ্রুত মৌলিক রূপান্তর ও পানি ব্যবহারের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের শস্যভাণ্ডার বরেন্দ্র অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জমি মরুভূমিতে রূপ নেবে এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা স্থায়ী বিপর্যয়ের মুখে পড়বে|