বিশ্বায়নের এই আধুনিক যুগে পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সংঘাতের সৃষ্টি হয়, তার অর্থনৈতিক ঢেউ খুব দ্রুতই আছড়ে পড়ে হাজার মাইল দূরের দেশগুলোতেও। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে যে চরম অস্থিরতা ও সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তার সরাসরি ও মারাত্মক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে। লোহিত সাগর, গালফ অব এডেন এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে একের পর এক ভূ-কৌশলগত অচলাবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম যেন এক লাগামহীন পাগলা ঘোড়ায় পরিণত হয়েছে। বিশ্ববাজারের এই টালমাটাল পরিস্থিতি বাংলাদেশের মতো পুরোপুরি জ্বালানি আমদানিনির্ভর এবং উদীয়মান অর্থনীতির দেশের জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চলমান চাপের মধ্যে জ্বালানি তেলের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক নতুন ও ভয়াবহ সংকটের দিকে ধাবিত করছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের সাম্প্রতিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই মূল্যবৃদ্ধির এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ১২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৯৭ ডলার ৩৮ সেন্ট। কিন্তু গতকাল রাত ৯টা ২০ মিনিটের আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্য অনুযায়ী, সেই ব্রেন্ট ক্রুডের ফিউচার্স মূল্য এক লাফে বেড়ে ১০৭ ডলার ৭৩ সেন্টে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম এক সপ্তাহ আগে ব্যারেলপ্রতি ৯২ ডলার ৩৮ সেন্ট থাকলেও, বর্তমানে তা লাফিয়ে বেড়ে ১০২ ডলার ৭৪ সেন্টের আশপাশে ওঠানামা করছে। অর্থাৎ, প্রতিটি মানদণ্ডেই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি গড়ে ১০ থেকে ১২ ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য রীতিমতো আতঙ্কজনক।
তবে সবচেয়ে বড় লাফ দেখা গেছে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেলের দামের ক্ষেত্রে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে উৎপাদিত মারবান ক্রুডের দামের উল্লম্ফন সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর প্রতি ব্যারেল মারবান ক্রুডের দাম ছিল ১০৬ ডলার ৭৭ সেন্ট। কিন্তু বর্তমানে সেই দাম অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে ১৩১ ডলার ২১ সেন্টে গিয়ে ঠেকেছে। একইভাবে অন্যান্য গ্রেডের তেলের দামেও আগুন লেগেছে। আরব লাইট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮১ ডলার ৩৯ সেন্ট থেকে এক ধাক্কায় বেড়ে ১০৪ ডলার ৮৬ সেন্ট হয়েছে। আর অপেক্ষাকৃত উন্নত মানের আরব লাইট এক্সট্রার দাম ব্যারেলপ্রতি ৮১ ডলার ৮৯ সেন্ট থেকে বেড়ে বর্তমানে ১০৫ ডলার ৬ সেন্টে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তেলের দামের এই আকাশমুখী প্রবণতা প্রমাণ করে যে, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ক্রেতাদের মধ্যে এক ধরনের চরম আতঙ্ক বা প্যানিক বায়িং শুরু হয়েছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের এই আকস্মিক ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে রয়েছে মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় তৈরি হওয়া চরম অনিশ্চয়তা এবং একের পর এক ভূ-রাজনৈতিক সংকট। ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীরা সম্প্রতি বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। এই প্রণালিটি লোহিত সাগরকে গালফ অব এডেনের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত রুট হিসেবে এটি বিশ্বব্যাপী পরিচিত। হুথিদের এই নিয়ন্ত্রণের ফলে এই পথ দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক তেলবাহী ট্যাংকারগুলো চরম নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর পাশাপাশি সৌদি আরবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত জ্বালানি তেল পাইপলাইনে (ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন) ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলার জেরে সতর্কতা হিসেবে পাইপলাইনটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বিশাল এক শূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর জলপথেও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে নতুন করে শঙ্কা ও অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয়। ইরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নির্বিঘ্নে নৌ-চলাচল ও নিরাপত্তা নিয়ে যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত কূটনৈতিক আলোচনা নির্ধারিত ছিল, তা আকস্মিকভাবে স্থগিত হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে রূপ ধারণ করেছে। কূটনৈতিক সমাধানের এই সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে পড়ার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফিউচার্স মার্কেটে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করে। এই প্রণালিগুলো দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার অর্থ হলো, তেলবাহী জাহাজগুলোকে এখন আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। এতে একদিকে যেমন পরিবহনের সময় কয়েক গুণ বেড়ে যাবে, তেমনি জাহাজ ভাড়া এবং ইন্স্যুরেন্স বা বিমা খরচও অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাবে।
আন্তর্জাতিক বাজারের এই ভয়ংকর পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য এক অশনিসংকেত। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানির একটি বিশাল অংশ মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমদানি করে থাকে। বিশেষ করে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বা ক্রুড অয়েল আমদানি করা হয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য। পাশাপাশি ওই অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল বা রিফাইনড অয়েলও (যেমন ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল) আমদানি করা হয়। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালি হুথিদের দখলে যাওয়ায় জ্বালানি পরিবহনে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি ভুক্তভোগী হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই অঞ্চলগুলো থেকে তেল আমদানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতার কারণে বাংলাদেশ এখন সরবরাহ সংকট এবং আকাশচুম্বী দাম—এই দ্বিমুখী ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে বলে জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।
জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারের এই তীব্র অস্থিরতা, সরবরাহ সংকট এবং ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণে বাংলাদেশের সামগ্রিক আমদানি ব্যয়ের ওপর অচিরেই এক বিশাল ও অসহনীয় চাপ নেমে আসতে যাচ্ছে। এই বিষয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি আমদানিকারক সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিবিড়ভাবে বাজার পর্যবেক্ষণ করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে আমদানি ব্যয় মেটানো এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এমনিতেই দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে, তার ওপর বিশ্ববাজারের পরিস্থিতি আরও অস্থির হলে এই চাপ সামলানো বিপিসির একার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। তবে বৈশ্বিক এই সংকট কতদিন স্থায়ী হবে, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের বিবদমান পক্ষগুলোর পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করলে যে চিত্রটি ফুটে ওঠে, তা রীতিমতো আতঙ্কজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) একটি গবেষণা ও হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি মাত্র ১০ ডলার বৃদ্ধি পেলেই বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় অন্তত ৭ থেকে ৮ কোটি ডলার বেড়ে যায়। আর বছর শেষে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৯৬ কোটি মার্কিন ডলারে। বর্তমান বাজারে যেহেতু তেলের দাম ইতিমধ্যে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২ থেকে ২৫ ডলার পর্যন্ত (মারবানের ক্ষেত্রে) বৃদ্ধি পেয়েছে, তাই বাংলাদেশের অতিরিক্ত আমদানি ব্যয়ের অঙ্কটি যে কতটা বিশাল হবে, তা সহজেই অনুমেয়।
জ্বালানি তেলের এই আকাশচুম্বী দাম দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করবে। দেশে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখতে এবং আসন্ন সেচ মৌসুমের প্রস্তুতি হিসেবে আগামী ২০ সেপ্টেম্বরের পর জ্বালানি তেলের নতুন একাধিক চালান দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। কিন্তু উচ্চ মূল্যের এই তেল আমদানি করতে গিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা ডলারের মজুতের ওপর নতুন করে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হবে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা হলো মূল্যস্ফীতি। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতের ওপর। বাস, ট্রাক ও পণ্যবাহী যানের ভাড়া বৃদ্ধি পেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় চাল, ডাল, সবজিসহ প্রতিটি পণ্যের দাম ভোক্তাপর্যায়ে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাবে। এছাড়া কৃষিখাতে সেচযন্ত্রের জন্য ডিজেলের ব্যবহার অপরিহার্য। তেলের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিশেষে এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূ-রাজনৈতিক দাবানল কেবল ওই অঞ্চলের জন্যই হুমকিস্বরূপ নয়, বরং এটি সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত করছে। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশের জন্য এই পরিস্থিতি এক মহাবিপর্যয়ের শঙ্কা তৈরি করেছে। বিশ্ববাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে দেশের চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র আকার ধারণ করবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যাবে। এই সংকট মোকাবিলার জন্য সরকারকে এখনই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে হবে এবং জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি গ্রহণ করা ছাড়া আপাতত কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।