শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫৩ অপরাহ্ন

নতুন ৩ কূপে দিনে মিলবে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকট যখন বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি প্রবল চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই এক বিশাল আশার আলো দেখাচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্র। দীর্ঘদিনের পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য এই গ্যাসক্ষেত্রের বুক চিরে নতুন করে তিনটি কূপ খননের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ বর্তমানে চলমান রয়েছে, যা থেকে অচিরেই জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন অন্তত ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই মেগা প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ও চমকপ্রদ আকর্ষণ হলো দেশের প্রথম ও সর্বাপেক্ষা গভীর অনুসন্ধান কূপ, যা প্রথাগত গ্যাস উত্তোলনের চেনা গণ্ডি ও সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে বাংলাদেশকে গভীর গ্যাস অনুসন্ধানের এক সম্পূর্ণ নতুন ও রোমাঞ্চকর অধ্যায়ে প্রবেশ করাচ্ছে। আগামী মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই এই বিপুল কর্মযজ্ঞের সুফল দেশের সাধারণ মানুষ ও শিল্প খাত ভোগ করতে পারবে বলে অত্যন্ত জোরালো আশা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড বা বিজিএফসিএল কর্তৃপক্ষ। একদিকে এই যুগান্তকারী উদ্যোগ তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ক্রমহ্রাসমান উৎপাদন সক্ষমতাকে যেমন নতুন জীবন দান করবে, ঠিক তেমনি অন্যদিকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির ওপর রাষ্ট্রের নির্ভরতা কমিয়ে চলমান জ্বালানি সংকট নিরসনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বুকে দেশের সবচেয়ে বড় এই প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রটি আবিষ্কার করে জ্বালানি খাতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল। এরপর ১৯৬৮ সাল থেকে এই সুবিশাল ক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়, যা গত কয়েক দশক ধরে দেশের শিল্পকারখানা এবং বাসাবাড়ির জ্বালানি চাহিদার এক বিশাল ও অপরিহার্য অংশ মিটিয়ে আসছে। বর্তমানে এই বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্রটির ২৩টি সক্রিয় কূপ থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত তিতাসের ভূগর্ভস্থ সর্বোচ্চ তিন হাজার ৭০০ মিটার গভীর থেকে এই অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু সময়ের নির্মম পরিক্রমায় এবং দীর্ঘ নিরবচ্ছিন্ন ব্যবহারের ফলে বিদ্যমান পুরোনো কূপগুলোতে গ্যাসের মজুত ও প্রাকৃতিক চাপ ধীরে ধীরে কমে আসছে, যার অনিবার্য নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দৈনন্দিন উৎপাদনের ওপর। উৎপাদনের এই নিম্নমুখী ধারাকে টেকসইভাবে ঊর্ধ্বমুখী করতে এবং ভূগর্ভের আরও গভীরে লুকিয়ে থাকা অজানা গ্যাসের সন্ধান পেতেই মূলত বিজিএফসিএল তিতাসের বুকে ২৯, ৩০ এবং ৩১ নম্বর কূপ খননের এই সময়োপযোগী মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
এই সুবিশাল খনন প্রকল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তিতাসের ৩১ নম্বর কূপ, যা দেশের গ্যাস উত্তোলনের ইতিহাসে একটি অনন্য ও ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নন্দনপুর এলাকায় খননাধীন এই কূপটি দেশের সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে গভীর অনুসন্ধান কূপ। জ্বালানি ও ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ভূকম্পন জরিপের তথ্য অনুযায়ী এই কূপের তলদেশের গভীরে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের এক বিশাল মজুত লুকিয়ে থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যা দেশের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে সক্ষম। দেশের সবচেয়ে উচ্চচাপ ও উচ্চতাপসম্পন্ন এই ৩১ নম্বর কূপটি ভূগর্ভের পাঁচ হাজার ৬০০ মিটার গভীরতায় নিয়ে যাওয়ার এক দুঃসাহসিক ও চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই খননকাজে প্রকৌশলীরা ইতিমধ্যে চার হাজার ৬৩৭ মিটার গভীরতা পর্যন্ত সফলভাবে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন। বিজিএফসিএল কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত আশাবাদী যে, চলতি বছরের মধ্যেই এই কূপের বাকি খননকাজ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নতুন করে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
গভীর অনুসন্ধান কূপ খননের এই বিশাল ও জটিল কর্মযজ্ঞের বিষয়ে প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কিছু কারিগরি তথ্য তুলে ধরেছেন। ১৯৬৯ সালে যখন তিতাসের তিন হাজার ৭০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল, তখন তিন হাজার ৬০০ মিটার গভীরতায় একটি অত্যন্ত উচ্চচাপের স্তর বা হাইপ্রেশার জোনের সম্মুখীন হয়েছিলেন সে আমলের প্রকৌশলীরা। তখনকার কারিগরি সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপত্তার কথা সর্বোচ্চ বিবেচনা করে সেই ভয়ংকর উচ্চচাপ স্তর ভেদ করে আরও গভীরে যাওয়ার কোনো ঝুঁকি নেওয়া হয়নি। কিন্তু বর্তমান ৩১ নম্বর কূপটির মূল বিশেষত্বই হলো এটি একটি অত্যাধুনিক গভীর অনুসন্ধান কূপ, যা সেই উচ্চচাপ এবং উচ্চতাপমাত্রার চরম বৈরী স্তরগুলোকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় অতিক্রম করে আরও গভীরে প্রবেশ করবে। তিতাসের তিন হাজার ৭০০ মিটার থেকে শুরু করে পাঁচ হাজার ৬০০ মিটার গভীরতার বিশাল ও অজানা স্তরে নতুন কোনো গ্যাসের বিশাল ভাণ্ডার আছে কি না, তা নিশ্চিতভাবেই জানাই এই খননের মূল বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য। এর পাশাপাশি ২৯ নম্বর কূপটির খননকাজও অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে এবং ইতিমধ্যে দুই হাজার ৮৬০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত খনন সম্পন্ন হয়েছে। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কারিগরি জটিলতা বা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা না দিলে আগামী মাত্র দুই মাসের মধ্যেই এই কূপটির কাজ চূড়ান্তভাবে শেষ হয়ে যাবে। এরপর ওই একই অত্যাধুনিক রিগ বা খননযন্ত্র ব্যবহার করে ৩০ নম্বর কূপের খননকাজ শুরু করা হবে, যা সামগ্রিক গ্যাস উত্তোলন প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করে তুলবে।
নতুন এই তিনটি কূপ সফলভাবে উৎপাদনে এলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব হবে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও অভাবনীয়। বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুল জলিল প্রামাণিকের বাস্তবসম্মত মূল্যায়নে, আগামী ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে এই তিনটি কূপ থেকে উৎপাদিত গ্যাস সরাসরি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। সামগ্রিক জাতীয় বিশাল চাহিদার তুলনায় দৈনিক ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস হয়তো খুব বিশাল কোনো অঙ্ক নয়, কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। এর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সুবিধাটি হলো, এই পরিমাণ গ্যাস নিজস্ব দেশীয় উৎস থেকে পাওয়ার ফলে ঠিক সমপরিমাণ এলএনজি বিদেশ থেকে আমদানি করা থেকে সরকার সরাসরি রেহাই পাবে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চরম চড়া দামে এলএনজি কিনতে গিয়ে রাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ মহামূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে। দেশীয় কূপ থেকে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট গ্যাস সরকার যেখানে মাত্র এক টাকা মূল্যে পাচ্ছে, সেখানে সমপরিমাণ এলএনজি আমদানি করে দেশে আনতে সরকারের খরচ পড়ছে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ টাকা। ফলে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেশীয় উৎস থেকে প্রাপ্তি নিশ্চিত হলে তা সরকারকে বিশাল অঙ্কের আর্থিক ভর্তুকি ও বৈদেশিক মুদ্রা খরচের হাত থেকে এক অনাবিল স্বস্তির জায়গায় নিয়ে যাবে।
তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের এই নতুন তিনটি কূপের খননকাজ বিজিএফসিএলের একটি বৃহত্তর ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনারই একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। চলমান এই বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে এবং দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিজিএফসিএল আরও কিছু সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তিতাসের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির আওতাধীন অন্যান্য গ্যাসক্ষেত্রগুলোতেও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধ ও পরিত্যক্ত কূপগুলোর ওয়ার্কওভার বা কারিগরি সংস্কারের বিশাল প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন আরও গভীর অনুসন্ধান কূপ খননের জন্য আধুনিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও কারিগরি মূল্যায়ন অব্যাহত রয়েছে। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের ওপর শক্তভাবে দাঁড়ানোর যে জাতীয় আকাঙ্ক্ষা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের এই নতুন উদ্যোগগুলো সেই পথেই একটি অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপ। দেশের প্রকৌশলী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অদম্য প্রচেষ্টা এবং আধুনিক প্রযুক্তির অপূর্ব সমন্বয়ে গভীর ভূগর্ভের এই লুক্কায়িত সম্পদ অচিরেই দেশের শিল্পায়নের চাকাকে আরও বেগবান করবে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে, এটাই এখন সমগ্র জাতির ঐকান্তিক প্রত্যাশা।
তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর


এ জাতীয় আরো খবর...