রাজধানীসহ সারা দেশে এখন ঘরে ঘরে জ্বরের প্রকোপ। একদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু নিয়ে চরম আতঙ্ক, অন্যদিকে একশ্রেণির মানুষের চরম অবহেলা—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আজ এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। আগস্ট মাস থেকে শুরু হওয়া ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা সেপ্টেম্বরে এসে রীতিমতো প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসের মোট মৃত্যুর সংখ্যাকে মাত্র ২৩ দিনেই ছাড়িয়ে গেছে সেপ্টেম্বর।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের বারবার সতর্কবার্তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যে এখনো সচেতনতার তীব্র অভাব লক্ষণীয়। অনেকেই জ্বরকে সাধারণ মৌসুমি রোগ ভেবে ফার্মেসি থেকে সামান্য টাকার প্যারাসিটামল কিনে খাচ্ছেন। তাদের ভ্রান্ত যুক্তি হলো, সামান্য জ্বরের জন্য কেন হাজার টাকা খরচ করে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাবেন। এই অর্থনৈতিক হিস্যা টানতে গিয়েই মূলত মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের মতে, জ্বর হওয়ার তিন দিনের মধ্যেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করা জরুরি। জ্বর সাময়িক কমে যাওয়ার পরই যে ডেঙ্গুর আসল শারীরিক জটিলতাগুলো শুরু হয়, এই বৈজ্ঞানিক সত্যটি অনেকেই অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন এবং যখন হাসপাতালে আসছেন, তখন আর চিকিৎসকদের তেমন কিছু করার থাকছে না।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে শিউরে উঠতে হয়। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ইতিমধ্যে ২০১ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরেই মারা গেছেন ১০৪ জন। মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৬৭ হাজার ৩৬৭ জন। এই বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপে রাজধানীর বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো আজ দিশেহারা। স্বাস্থ্য খাত থেকে পর্যাপ্ত স্যালাইন সরবরাহ এবং জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে মোবাইল হাসপাতাল ও সেনাবাহিনী প্রস্তুত রাখার মতো সরকারি উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। একই সঙ্গে টারশিয়ারি বা বিশেষায়িত হাসপাতালে অহেতুক ভিড় না জমিয়ে উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার যে পরামর্শ স্বাস্থ্য উপদেষ্টা দিয়েছেন, তা বর্তমান সংকট ও শয্যা-সংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত যৌক্তিক।
ডেঙ্গু এখন আর কেবল একটি নির্দিষ্ট মৌসুমের বা নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের রোগ নয়। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই আজ এই নীরব ঘাতকের নিশানায়। মশক নিধনে সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাঠামোগত ব্যর্থতার পাশাপাশি নাগরিকদের ব্যক্তিগত চিকিৎসাগত উদাসীনতাও এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য সমানভাবে দায়ী। জ্বর আসামাত্রই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো এখন আর কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং জীবন বাঁচানোর আবশ্যিক শর্ত। এই মহামারির হাত থেকে বাঁচতে হলে রাষ্ট্রীয় সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিককে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য-সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে।