কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অভাবনীয় বিকাশের এই যুগে স্বয়ং এর নির্মাতারাই এখন লাগাম টানার কথা বলছেন| অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদি, স্যাম অল্টম্যান এবং ইলন মাস্কের মতো প্রযুক্তি মহারথীরাও এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন| তাদের আশঙ্কা, এআই এজেন্টগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে শক্তিশালী বটনেট তৈরি করে ইন্টারনেটের বিশাল অংশ দখলে নিতে পারে, যার ক্ষতি শত শত কোটি ডলারে পৌঁছাবে| বিশ্বজুড়ে খোদ নির্মাতাদের মধ্যেই যখন শঙ্কা কাজ করছে, তখন কেবল ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতিটি অত্যন্ত চিন্তার| এআইয়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব কেবল মুনাফালোভী প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না, রাষ্ট্রকেও সচেতন হতে হবে|
আমরা নিজেরা এআই বানাচ্ছি না বলে এর ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকব, এমনটি ভাবার যৌক্তিক কারণ নেই| আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতে এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ইতিমধ্যেই মারাত্মক আকার ধারণ করেছে| কাজের সুবিধার্থে অনেক কর্মী গ্রাহকের সংবেদনশীল তথ্য বা ঋণ প্রস্তাবের খসড়া বিদেশি সার্ভারে থাকা চ্যাটবটগুলোতে দিচ্ছেন| ফলে ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সম্পূর্ণ অনিরাপদভাবে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, যা ২০১৬ সালের বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মতো ডিজিটাল বিপর্যয়ের শঙ্কা তৈরি করে| বর্তমানে কণ্ঠস্বর ও চেহারা নকল করার প্রযুক্তি এতই সহজলভ্য হয়েছে যে, সনাতন পদ্ধতির নিরাপত্তা দিয়ে এই জালিয়াতি ঠেকানো অসম্ভব| বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং খাতে এআই নীতিমালা চালুর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা|
এআইয়ের এই দৌড় আমাদের কর্মসংস্থানের বাজারেও এক বিশাল ও নীরব ঝুঁকি তৈরি করেছে| উন্নত দেশগুলোতে এআইয়ের কারণে মাঝারি মানের অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাচ্ছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং খাতের ওপর| ডেটা এন্ট্রি, কাস্টমার সাপোর্ট, সহজ অনুবাদ বা গ্রাফিক ডিজাইনের মতো যেসব কাজে সস্তা শ্রমের কারণে বাংলাদেশ এতদিন সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল, এআই এখন মুহূর্তের মধ্যেই তা নিখুঁতভাবে করে দিচ্ছে| ফলে কেবল সস্তা শ্রমের ওপর ভর করে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার দিন দ্রুত শেষ হয়ে আসছে| এই চরম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কর্মীদের চাকরিচ্যুত না করে তাদের দ্রুত নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলার কোনো বিকল্প নেই|
তথ্য সুরক্ষা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও এআই এক অশনিসংকেত| দেশের ভূমি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থা ডিজিটাল হলেও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার আইনি কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল| বাংলা ভাষার নিজস্ব উন্মুক্ত তথ্যভান্ডারের অভাবে বিদেশি কোম্পানিগুলোর এআই মডেলের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হচ্ছে| এর ফলে ভুয়া খবর, গুজব এবং বানানো ভিডিও খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে| নির্বাচন বা ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে এআইয়ের মাধ্যমে ছড়ানো গুজব সমাজে মানুষে মানুষে আস্থার চরম সংকট তৈরি করতে পারে|
সবচেয়ে গভীর প্রভাবটি পড়ছে শিক্ষাব্যবস্থায়| বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এখন গবেষণা প্রতিবেদন বা তথ্য বিশ্লেষণে ব্যাপকভাবে এআইয়ের ওপর নির্ভরশীল| সফটওয়্যারের নকল ধরার পরীক্ষা থেকে বাঁচতে তারা শেষ মুহূর্তে লেখায় কিছুটা পরিবর্তন আনছেন| অতিরিক্ত এআই নির্ভরতার কারণে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে এবং অনেক সময় এআই কাল্পনিক তথ্য সরবরাহ করছে| তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এআই পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা অবাস্তব| বরং কোথায় এআই ব্যবহার করা যাবে এবং কোথায় শিক্ষার্থীর নিজস্ব মেধা প্রয়োগ করতে হবে, তার একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা জরুরি|
এআইয়ের এই দ্রুতগতির বৈশ্বিক দৌড় আমরা কোনোভাবেই থামাতে পারব না| তবে এই প্রযুক্তির বিশাল ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করার চাবিকাঠি এখনো আমাদের হাতেই রয়েছে| ব্যাংকের সংবেদনশীল তথ্য পাচার রোধে কঠোর গোপনীয়তা নীতি, কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের প্রযুক্তিগত পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং শিক্ষাঙ্গনে এআইয়ের যৌক্তিক ও নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে| অযথা ভয় পেয়ে প্রযুক্তি থেকে পিছিয়ে থাকা নয়, বরং এর ঝুঁকিগুলো সঠিকভাবে অনুধাবন করে সচেতন ও নিয়ন্ত্রিতভাবে এআইয়ের ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কাজ|