বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৪ অপরাহ্ন

নির্দেশিকার চরম অবহেলায় প্রাণঘাতী ডেঙ্গু: শকের শিকার হয়ে মৃত্যু ৮০ শতাংশের

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২ বার
প্রকাশ: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬

কীটতত্ত্ববিদ ও বিশেষজ্ঞদের বারবার সতর্কবার্তা এবং মশা নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট জাতীয় নির্দেশিকা থাকার পরও ডেঙ্গু পরিস্থিতি দেশের সর্বত্র এক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে| রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং তৃণমূল ইউনিয়ন পর্যায়ে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে জাতীয় নির্দেশিকার কোনো তোয়াক্কাই করা হচ্ছে না| ফলে সেপ্টেম্বর মাস পেরিয়ে অক্টোবরে এসেও ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার কোনো লক্ষণ নেই, উল্টো তা আরও বেশি প্রাণঘাতী ও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে| গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে আরও ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা চলতি বছর এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড| একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও এক হাজার ৯০২ জন রোগী| স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) কাছে হাসপাতালগুলোর পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া রোগীদের মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর মূল কারণ ছিল ডেঙ্গু ‘শক সিনড্রোম’| সময়মতো হাসপাতালে না আসা এবং জ্বর কমার পর সতর্কতা অবলম্বন না করাই এই বিশাল সংখ্যক মৃত্যুর প্রধান কারণ বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা|

মশক নিয়ন্ত্রণে ২০২১ সালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে জাতীয় নির্দেশিকা’ প্রণয়ন করা হয়েছিল| এরপর রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের জন্য আলাদাভাবে ‘মশক নিধন স্থায়ী নির্দেশিকা’ তৈরি করা হয়| এই দুই নির্দেশিকাতেই মশক নিয়ন্ত্রণে করণীয়, মশককর্মী ও তদারককারীসহ সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা রয়েছে| জাতীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিবছর ১৫ জানুয়ারির মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের সঠিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী ছয় মাসের মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করার কথা| কিন্তু স্থানীয় সরকারের একাধিক স্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ ধরনের কোনো কর্মপরিকল্পনা কোনো পর্যায় থেকেই আজ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো হয়নি|

নির্দেশিকায় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশনকে প্রতি মাসে মশার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে| প্রতিটি পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে একটি কার্যকর কমিটি গঠনের কথাও সেখানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে| তবে স্থানীয় পর্যায়ে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, এমন কোনো কমিটি আদতে আছে কি না বা থাকার কথা কি না, সেই তথ্যই অনেক জনপ্রতিনিধি বা কর্মকর্তা জানেন না| ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের নিজ নিজ ওয়ার্ডে মশার বিস্তার সম্পর্কে প্রতি মাসে চেয়ারম্যানকে বিস্তারিত জানানোর কথা| কিন্তু বিভিন্ন এলাকার বর্তমান ও সাবেক জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের মেয়াদকালে কেউই এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেননি| এমনকি জাতীয় নির্দেশিকার বিষয়বস্তু সম্পর্কেও তাদের অধিকাংশের কোনো সুস্পষ্ট ধারণা নেই|

শুধু প্রান্তিক পর্যায়ে নয়, খোদ সিটি করপোরেশনও মানছে না মশক নিধনের জাতীয় নির্দেশিকা| নির্দেশিকার শুরুতেই বছরজুড়ে ধারাবাহিকভাবে মশক নিধন কার্যক্রম চালু রাখার কথা বলা হয়েছে| সাধারণ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি আবাসিক এলাকার ময়লা, পচা পানি, নালা-নর্দমা, ড্রেন, সেপটিক ট্যাংক, জলাভূমি, ঝোপঝাড় এবং পরিত্যক্ত পাত্রে সকাল-বিকেল নিয়ম করে মশার ওষুধ প্রয়োগের নির্দেশনা রয়েছে| লার্ভা ধ্বংস করার জন্য সকালে এবং উড়ন্ত পূর্ণাঙ্গ মশা নিধনে বিকেলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে কীটনাশক প্রয়োগের কথা থাকলেও বাস্তবে তা সেভাবে কার্যকর হচ্ছে না| কোনো বাসাবাড়ির ভেতরে এডিস মশার প্রজননস্থলের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে সেখানে ওষুধ প্রয়োগ বা ফগিং করে উৎসস্থল সম্পূর্ণ ধ্বংস করার কথা| এক্ষেত্রে ভবন বা অবকাঠামোর মালিকের কাছ থেকে একটি নির্ধারিত ফর্মে স্বাক্ষর নেওয়ার বিধান রয়েছে| কিন্তু বাস্তবে এমনটা প্রায় দেখাই যায় না| আবার অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে যে, টাকা না দিলে মশককর্মীরা বাড়ির ভেতরে ওষুধ ছিটান না|

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উপপ্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী জানিয়েছেন, গত তিন বছর ধরে তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করে মশা নিধনে ব্যবস্থা নিয়েছেন| তবে এটি খুব একটা কার্যকর পদ্ধতি নয় বলে তারা এখন নিজেরাই মশার উৎপত্তিস্থল শনাক্ত করার কাজ শুরু করেছেন| ঢাকার বড় ১০টি হাসপাতাল থেকে এক হাজার ৬৭২ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে ১০০টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা হয়েছে| সেই নির্দিষ্ট জায়গাগুলোতে দৈনিক ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবী দিয়ে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে| তিনি আরও জানান, এখন তাদের মূল পরিকল্পনা হলো হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়গুলোতে কীটনাশক ছাড়াই এডিসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মশা ধরতে ‘বিজি সেন্টিনেল ট্র্যাপ’ নামের আধুনিক ফাঁদ বসানো|

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ২০৬ জন এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ২২৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন| ঢাকার দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগের অন্যান্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪০১ জন রোগী| অন্যান্য বিভাগের মধ্যে বরিশালে ২১৬, চট্টগ্রামে ২৭২, খুলনায় ৩০৬, ময়মনসিংহে ৯৮, রাজশাহীতে ১০৫, রংপুরে ৬৬ এবং সিলেটে ৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন| চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন, আর এই এক মাসেই মৃত্যু হয়েছে ১৪৮ জনের| সব মিলিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৮ হাজার ৩৬০ জন| স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুর তথ্য সংরক্ষণ করছে| এর মধ্যে গত ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং সেই বছর ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়|

ডেঙ্গু চিকিৎসায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো প্রতিবেদনগুলোর বিশ্লেষণ বলছে, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া রোগীদের মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে শক সিনড্রোমের কারণে| বাকি মৃত্যুগুলো অন্যান্য জটিলতা যেমন রক্তক্ষরণ, বয়সজনিত অসুস্থতা বা কোমর্বিডিটি এবং অন্যান্য কারণে হয়েছে| স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশীদ জানান, অধিদপ্তর আলাদাভাবে ডেঙ্গু মৃত্যুর কোনো গবেষণা করেনি, তবে হাসপাতালগুলোর পাঠানো প্রতিবেদন থেকেই এই শক সিনড্রোমের আধিক্যের কথা স্পষ্টভাবে জানা গেছে| চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক রোগী এবং তাদের পরিবার জ্বরের তীব্রতা কমে যাওয়াকে ভুলবশত সুস্থতার লক্ষণ হিসেবে ধরে নেন| অথচ ডেঙ্গুর সবচেয়ে ক্রিটিক্যাল বা সংকটময় পর্যায়টি মূলত শুরুই হয় জ্বর ছেড়ে যাওয়ার পর| মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. নুর মোহাম্মদ বলেন, অনেক রোগী যখন তাদের কাছে আসেন, তখন তারা ইতিমধ্যেই শকে চলে গেছেন| শকে চলে যাওয়ার পর রোগীদের বাঁচানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে| অথচ এই রোগীরা যদি জ্বর ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বা এক দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হতেন, তবে তাদের জীবন খুব সহজেই বাঁচানো সম্ভব হতো|

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউএস সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের মতে, ডেঙ্গুর ক্রিটিক্যাল পর্যায় সাধারণত জ্বর কমার পর শুরু হয় এবং এটি ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে| এই সময়ে রোগীর শরীরে প্লাজমা লিকেজ শুরু হয়, যা দ্রুত গুরুতর ডেঙ্গু এবং শকের দিকে নিয়ে যায়| মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্ট গ্রুপের ফোকাল পারসন ডা. মোহাম্মদ আব্দুল কাদির জানান, ডেঙ্গুর সতর্কতা বা ওয়ার্নিং সাইনগুলোকে অবহেলা করার কারণেই রোগীরা শকে চলে যান| জ্বর নেই বলে তারা মনে করেন রোগী সুস্থ হয়ে গেছেন, অথচ তখনই আসল বিপদ শুরু হয়| স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পর (৩১ জন) এ বছর সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে মুগদা হাসপাতালে (২৮ জন)| ডা. কাদির আরও জানান, তীব্র পেট ব্যথা, অনবরত বমি হওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া, শরীরের কোথাও রক্তপাত, রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং চরম দুর্বলতা দেখা দিলে এক মুহূর্ত দেরি না করে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে|

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আতিকুর রহমান জানান, শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সময় মৃদু উপসর্গ দেখা দিলেও জ্বর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অভিভাবকের উচিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া| শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন, কারণ তারা খুব দ্রুত দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়ে| এদিকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে নতুন করে প্রায় ৩০০ শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন| তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের কঠোর নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো সরকারি হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগীকে কোনোভাবেই ফিরিয়ে দিতে পারবে না| কোনো হাসপাতালে শয্যা না থাকলে রোগীকে নির্ধারিত অন্য হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে| এছাড়া বেসরকারি হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করছে কি না, তা যাচাই করার জন্যও কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে|

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদ কবীরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গুর উচ্চ সংক্রমণের আশঙ্কা তারা অনেক আগেই করেছিলেন এবং বারবার মশা নিধনের কার্যকর পরামর্শ দিয়েছিলেন| তারপরও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এক ধরনের চরম অবহেলা পরিলক্ষিত হয়েছে| তিনি সতর্ক করে বলেন, সেপ্টেম্বরের তুলনায় চলতি অক্টোবরে ডেঙ্গুতে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার আরও বাড়তে পারে এবং এই ভীতিকর পরিস্থিতি আগামী মাস পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে| ডেঙ্গুর এই প্রাণঘাতী রূপ থেকে বাঁচতে হলে নির্দেশিকার কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে, বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সারা দেশে অত্যন্ত দ্রুত ও কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি গ্রহণ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই|

তথ্যসূত্র: সমকাল ও নিউএজ


এ জাতীয় আরো খবর...