বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৭ পূর্বাহ্ন

ট্রানজিট রুট বাংলাদেশ, গন্তব্য ভারত: আকাশপথে চোরাচালানের নতুন কৌশল

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬

বিশ্বের হাজার হাজার বিমান প্রতিদিন আকাশের বুক চিরে এক গন্তব্য থেকে আরেক গন্তব্যে ছুটে চলেছে| এর মধ্যে বাংলাদেশের মাটি ছুঁতে আসা বিমানগুলোকে ঘিরে গোয়েন্দাদের এবং সাধারণ মানুষের কৌতূহলের যেন কোনো শেষ নেই| কারণ, এই বিমানগুলোর পরতে পরতে লুকিয়ে থাকে সোনার এক বিশাল ও রহস্যময় সাম্রাজ্য| চোরাকারবারিদের নিত্যনতুন কৌশল আর চোখ ধাঁধানো পরিকল্পনায় বাংলাদেশের আকাশসীমা এখন অবৈধ সোনা পাচারের এক অন্যতম প্রধান রুট হয়ে উঠেছে| বিমানের টয়লেটের প্যানেল থেকে শুরু করে যাত্রীদের আসনের নিচে, এমনকি যাত্রীদের শরীরের স্পর্শকাতর অংশ থেকে বিমানকর্মীদের জুতা ও বেল্টের ভেতরেও সুনিপুণভাবে সোনার বার লুকিয়ে রাখার অবিশ্বাস্য সব ঘটনা প্রতিনিয়তই উন্মোচিত হচ্ছে| আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং শুল্ক গোয়েন্দাদের কড়া নজরদারি সত্ত্বেও এই সোনালি কারবার কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না, উল্টো কারবারিরা গোয়েন্দাদের বোকা বানাতে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন ফন্দি আঁটছে|

একটি দৈনিক পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, দেশে প্রতি বছর বৈধভাবে যে পরিমাণ সোনার প্রয়োজন, তার চেয়ে অনেক বেশি সোনা দেশে প্রবেশ করছে| দেশে নতুন সোনার বার্ষিক চাহিদা আনুমানিক ১৮ থেকে ৩৬ টন হলেও, শুধু ব্যাগেজ রুলসের সুবিধাকে কাজে লাগিয়েই এর চেয়ে অনেক বেশি সোনা দেশে আনা হচ্ছে| উদাহরণস্বরূপ, শুধু ২০২২ সালেই বৈধভাবে দেশে প্রবেশ করেছিল প্রায় ৫৪ টন সোনা| এর বাইরে দেশের প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে নিয়মিতই অবৈধ সোনার বিশাল সব চালান ধরা পড়ছে| কিন্তু গোয়েন্দাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে সেই পরিসংখ্যান, যা বলছে ধরা পড়া সোনা মোট চোরাচালানের মাত্র ১০ শতাংশেরও কম| বাকি ৯০ শতাংশ সোনাই নজরদারির বাইরে থেকে অনায়াসে দেশে প্রবেশ করছে এবং পরবর্তীতে তা পাচার হয়ে যাচ্ছে|

প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, দেশের চাহিদার চেয়ে এত বিপুল পরিমাণ বাড়তি সোনা কোথায় যাচ্ছে? অনুসন্ধান এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, বৈধ বা অবৈধ যে পথেই সোনা দেশে আসুক না কেন, এর একটি বিশাল অংশ অত্যন্ত সুকৌশলে সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাচার হয়ে যাচ্ছে| ভারতে ব্যাগেজ রুলসের মাধ্যমে সোনা আনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কড়াকড়ি থাকায় চোরাকারবারিরা বাংলাদেশকেই তাদের প্রধান ট্রানজিট রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে| যশোর, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তগুলো দিয়ে প্রতিনিয়তই অবৈধ সোনার চালান ভারতে প্রবেশ করছে|

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সাল থেকে গত সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত পৌনে পাঁচ বছরে শুধু ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই জব্দ করা হয়েছে ১ হাজার ৯৫৮ কেজি সোনা| অর্থাৎ, বছরে গড়ে ৪১২ কেজি সোনা ধরা পড়ছে এই একটিমাত্র বিমানবন্দরে| ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, জব্দ হওয়া অবৈধ সোনার ৭৪ শতাংশই আসে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে| বাকি ২০ শতাংশ সৌদি আরব এবং ৬ শতাংশ আসে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে| শুধু দুবাই নয়, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং হংকং থেকেও সোনার চালান আসার প্রমাণ পেয়েছেন গোয়েন্দারা| চোরাকারবারিরা এখন একক কোনো রুট ব্যবহার না করে ঘন ঘন রুট পরিবর্তন করছে| তারা সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে না এসে পর্যটক হিসেবে শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড বা নেপাল হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে এবং অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের সুযোগও কাজে লাগাচ্ছে|

গোয়েন্দাদের নাকাল করতে চোরাকারবারিরা নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করছে| আগে তারা শরীরের বিভিন্ন অংশ বা লাগেজে সোনা লুকিয়ে আনলেও, এখন তারা সরাসরি যাত্রীর কাছে সোনা না রেখে বিমানের কাঠামোর ভেতরে সোনা লুকিয়ে রাখছে| উদ্দেশ্য হলো, আন্তর্জাতিক যাত্রীদের কাস্টমসের কড়া নজরদারি থেকে বাঁচানো এবং পরবর্তীতে সুবিধাজনক সময়ে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের ভেতরের চক্রের সাহায্যে সেই সোনা বের করে আনা| সাম্প্রতিক সময়ে এমন বেশ কিছু ঘটনা গোয়েন্দাদের রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে| গত ২৮ মার্চ দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি কার্গো ফ্লাইটের টয়লেট প্যানেল থেকে ১৭.৮ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়| একইভাবে ২ জুলাই এবং ৫ সেপ্টেম্বর দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের ফ্লাইটে তল্লাশি চালিয়ে যথাক্রমে ১৮.৭২ কেজি এবং ১৩.৯২ কেজি সোনা জব্দ করা হয়| সর্বশেষ গত রবিবার এমিরেটসের একটি ফ্লাইট থেকে দুই সন্দেহভাজন টেকনিক্যাল হেলপারের জুতার ভেতর থেকে ৯.৩৪ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়| সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিমানের ভেতরে এত বিপুল পরিমাণ সোনা পাওয়া গেলেও, অনেক ক্ষেত্রেই মূল কারবারিদের কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি|

শুধু ঢাকা নয়, চট্টগ্রাম এবং সিলেটের বিমানবন্দরগুলোও অবৈধ সোনা চোরাচালানের বড় রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে| চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ২৬২টি ঘটনায় প্রায় ১৬২ কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছে| অন্যদিকে, সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও বিভিন্ন সময়ে বড় বড় চালান ধরা পড়েছে| ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দুবাই থেকে আসা একটি ফ্লাইটে ৩৪ কেজির বেশি সোনা জব্দ করা হয়, যা এই বিমানবন্দরে ধরা পড়া অন্যতম বড় চালান|

চোরাকারবারিরা শুধু বিমানের ভেতরেই নয়, সোনা বহনের ধরনেও ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে| তারা এখন শুধু সোনার বার নয়, সোনা গলিয়ে পেস্ট বা পাউডার বানিয়ে, এমনকি রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় কাপড়ের সঙ্গে মিশিয়েও সোনা পাচার করছে| ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ভেতরে লুকিয়ে বা ফলের চালানের আড়ালে মিথ্যা ঘোষণা দিয়েও সোনা আনার চেষ্টা করা হচ্ছে| বিমানবন্দরকেন্দ্রিক এই বিশাল চোরাচালান চক্রের সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ অত্যন্ত পুরনো| ২০১৪ সালে পুলিশ বিমানের শীর্ষ কর্মকর্তাসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছিল, কিন্তু তারপরও এই অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ হয়নি| তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষের দাবি, যেকোনো অনিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাপারে তাদের অবস্থান সুস্পষ্ট এবং প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়|

অবৈধ সোনা চোরাচালান রোধে বিমানবন্দর কাস্টমস এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রতিনিয়তই বিশেষ অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত রেখেছে| কোনো আসামি আটক হলে তাৎক্ষণিকভাবে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হচ্ছে এবং লাইসেন্স বাতিলসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে| এরপরও এই বিশাল ও সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে| দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার স্বার্থে এই সোনালি কারবারের লাগাম টেনে ধরা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি|

তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ


এ জাতীয় আরো খবর...