ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী বাণিজ্যিক ও ভৌগোলিক সংযোগস্থল হিসেবে পরিচিত কুমিল্লা জেলা বর্তমানে অপরাধের এক বিপজ্জনক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শান্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত এই জেলায় একের পর এক রক্তক্ষয়ী ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এখন চরম আতঙ্কের ছায়ায় ঢাকা পড়েছে। মহাসড়কে যাত্রীবেশে ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারী চক্র, কিশোর গ্যাংয়ের লাগামহীন উন্মাদনা এবং রাতের আঁধারে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের অপরাধপ্রবণতায় প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল। গত মাত্র নয় মাসের সরকারি পরিসংখ্যানে এই জেলায় ১০৪টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য নথিবদ্ধ হয়েছে, যা জেলার সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতিকে স্পষ্ট করে তুলেছে। কাস্টমস কর্মকর্তা থেকে শুরু করে স্কুলপড়ুয়া কিশোর-কিশোরী—কেউই রক্ষা পাচ্ছে না এই বর্বর অপরাধচক্রের হাত থেকে। একের পর এক এমন নৃসংশ ঘটনার পর জনমনে এখন একটিই আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে, এই মৃত্যুর মিছিলে পরবর্তী শিকার আসলে কে হতে চলেছে।
সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটেছিল একজন দায়িত্বশীল কাস্টমস কর্মকর্তাকে কেন্দ্র করে। ৩৫ বছর বয়সী কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী রাতে চট্টগ্রাম থেকে একটি দূরপাল্লার বাসে করে নিজ গন্তব্য কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। দীর্ঘ যাত্রাপথে ক্লান্ত শরীরে গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়ার কারণে তিনি তাঁর নির্ধারিত স্টপেজে সময়মতো নামতে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে মধ্যরাতে তিনি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা ঝাগুরঝুলি বিশ্বরোড এলাকায় বাস থেকে নামেন। গভীর রাতে নির্জন মহাসড়কে পৌঁছানোর পরপরই তিনি একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের পাতা ফাঁদে জড়িয়ে পড়েন। ওই চক্রের সদস্যরা চালক ও সাধারণ যাত্রীর ছদ্মবেশ ধারণ করে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে তাঁর সামনে হাজির হয়। বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে তাঁকে গাড়িতে তোলার পর চলন্ত যানের ভেতরেই তাঁর ওপর নির্মম শারীরিক নির্যাতন শুরু করা হয় এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। সর্বস্ব লুটে নেওয়ার পর রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় বুলেট বৈরাগীকে চলন্ত অটোরিকশা থেকেই রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে ঘাতকেরা পালিয়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান এই সরকারি কর্মকর্তা। চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল সকালে মহাসড়কের কোটবাড়ী আইরিশ হিল হোটেলের পাশ থেকে পুলিশ তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার করে, যা মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রীদের নিরাপত্তার দৈন্যদশাকে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
এই রেশ কাটতে না কাটতেই জেলাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে দেশব্যাপী আলোচিত অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। মাত্র ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিম ছিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। কোটবাড়ী এলাকার এই সম্ভাবনাময় কিশোর গত ১৯ সেপ্টেম্বর বাসা থেকে বের হয়ে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায়। পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘ অপেক্ষা ও উদ্বেগের অবসান ঘটিয়ে ঠিক পরদিন কোটবাড়ীর লালমাই পাহাড়ের গভীর জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয় তার নিথর মৃতদেহ। পরবর্তী তদন্তে বেরিয়ে আসে এক শিউরে ওঠার মতো সত্য। স্রেফ একটি দামি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার লোভ থেকেই এই নিষ্পাপ কিশোরকে নির্দয়ভাবে খুন করেছিল তারই পরিচিত অপরাধীরা। শিক্ষাবিদ পরিবারের একমাত্র সন্তানের এমন অকাল মৃত্যু কুমিল্লার সাধারণ অভিভাবকদের মনে সন্তানকে ঘরের বাইরে পাঠানোর ক্ষেত্রে গভীর শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
কিশোর অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই কুমিল্লা মহানগরীতে নেমে আসে আরও এক ভয়াল ট্র্যাজেডি। মহানগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন গত ৪ অক্টোবর সহপাঠী এক বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে নিজ বাসা থেকে বের হয়েছিল। এরপর নিখোঁজ থাকা অবস্থায় ৭ অক্টোবর দিবাগত রাত ২টা ৫৮ মিনিটে তাজমিন চরম বিপদের মুখে পড়ে শেষ চেষ্টা হিসেবে নিজের বাবার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ‘লাইভ লোকেশন’ পাঠিয়েছিল। সেই খুদে বার্তায় তাকে বাঁচানোর জন্য এক আকুল আর্তি ছিল, কিন্তু গভীর রাতে ঘুমিয়ে থাকায় তার পিতা তাৎক্ষণিকভাবে সেই বার্তা দেখতে পাননি। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ভোরাজগতপুর গ্রামের এক নির্জন ধানখেত থেকে পুলিশ ওই স্কুলছাত্রীর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে। পুলিশের তদন্তে জানা যায়, মধ্যরাতে বাড়ি ফেরার পথে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠেছিল তাজমিন। অটোরিকশার চালক সুমন মিয়া তাকে গন্তব্যে না নিয়ে লালমাইয়ের এক অন্ধকার ও নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে কিশোরীটিকে পাশবিকভাবে ধর্ষণের পর নিজের গলার গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করে লাশ ফেলে দেয়। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম থেকে মূল ঘাতক সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার এবং তাজমিনের ছিনতাই হওয়া আইফোনটি উদ্ধার করা হলেও একটি পরিবারের বুক খালি হওয়া আর রোধ করা যায়নি।
জেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত এই নয় মাসে কুমিল্লায় নথিবদ্ধ হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মোট ১০৪টিতে। মাসের হিসাবে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৯টি, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ১২টি, মার্চে ১১টি, এপ্রিলে ১০টি, মে মাসে সর্বোচ্চ ১৭টি, জুনে ১০টি, জুলাইয়ে ১০টি এবং আগস্ট মাসে ১১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া সেপ্টেম্বর মাসের হত্যাকাণ্ডের খসড়া তালিকা পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা সভায় উপস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে। শুধু হত্যাকাণ্ডই নয়, সামগ্রিক অপরাধ ও মামলার সূচকেও দেখা যাচ্ছে আশঙ্কাজনক ঊর্ধ্বগতি। জুলাই মাসের তুলনায় আগস্টে জেলা পুলিশে অপরাধের মামলা বেড়েছে ৭৬টি। জুলাইয়ে যেখানে বিভিন্ন অপরাধে মামলার সংখ্যা ছিল ৫০৯টি, সেখানে আগস্টে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮৫টিতে। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর জেলাজুড়ে কিশোর গ্যাংবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে পুলিশ দুই সহস্রাধিক কিশোর ও তরুণকে আটক করলেও অপরাধের ধারাবাহিকতায় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি। আটক হওয়ার কিছুদিন পরেই আইনের নানা ফাঁকফোকর গলে জামিনে বেরিয়ে এসে অপরাধীরা আবারও দ্বিগুণ উৎসাহে অপরাধকর্মে জড়াচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই চরম অবনতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কুমিল্লার সচেতন নাগরিক ও সমাজকর্মীরা। সমাজকর্মী ও আলোকিত বজ্রপুরের সংগঠক রফিকুল ইসলাম সোহেল মনে করেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কুমিল্লা একটি সীমান্তসংলগ্ন জেলা হওয়ায় এখানে দীর্ঘকাল ধরেই মাদক চোরাচালানের এক শক্তিশালী রুট গড়ে উঠেছে। তাঁর মতে, মাদকের এই সর্বগ্রাসী আগ্রাসনই তরুণ সমাজকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মাদক চোরাচালান বন্ধ করতে না পারলে অপরাধপ্রবণতা কোনোভাবেই রোধ করা যাবে না। এজন্য জেলা পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তিনি মন্তব্য করেন যে, সাধারণ মানুষ এখন আর দায়িত্বশীলদের লোকদেখানো শোডাউন বা মহড়া দেখতে চায় না, বরং দৃশ্যমান সমাধান দেখতে চায়।
একই সুরে কথা বলেছেন কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মাসুক আলতাফ চৌধুরী। তিনি উল্লেখ করেন, রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী ট্রানজিট পয়েন্ট হওয়ায় কুমিল্লায় জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং ভাসমান মানুষের আনাগোনা অত্যন্ত বেশি। এই বাড়তি জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশ প্রশাসনের জনবল এবং আধুনিক সুরক্ষা সরঞ্জামের সংকট রয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সামাজিক অনুশাসন ও পারিবারিক নজরদারি ভেঙে পড়াও এই অস্থিরতার একটি বড় কারণ। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ও সমাজের দায়িত্বশীল মহলের একযোগে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাবিদরাও এই পরিস্থিতিকে গতানুগতিক পুলিশি ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে দেখার তাগিদ দিচ্ছেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিমের মতে, সনাতন ধারায় পুলিশ টহল দিয়ে বর্তমান অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। অপরাধীরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার সাহস পান না সাধারণ ভুক্তভোগীরা। ফলে আইনের মারপ্যাঁচে আসামিরা দ্রুত খালাস পেয়ে যায় এবং সমাজে ফিরে এসে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তিনি প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশ এবং অপরাধের শেকড় উপড়ে ফেলতে রাষ্ট্রকে নতুন নিরাপত্তা কৌশলে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
উদ্বেগজনক এই পরিস্থিতির মুখে জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশি টহল ও সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। মহাসড়ক ও পাড়ামহল্লায় চিহ্নিত চক্রগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। সম্প্রতি মাদক ব্যবসা ও কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই হাজারের বেশি অভিযুক্তকে আটক করা হয়েছে। তবে পুলিশ প্রশাসনের দাবি, অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে শুধু পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়, বরং পরিবার ও সমাজের প্রতিটি স্তরের সচেতন সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। যতক্ষণ না অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর হচ্ছে, ততক্ষণ কুমিল্লার মানুষের মনে এই নিরাপত্তাহীনতার কালো মেঘ কাটানো কঠিন হবে।