শিরোনামঃ
নারীস্বাস্থ্য রূপান্তরে বৈশ্বিক অংশীদারত্ব ও উদ্ভাবনী অর্থায়নের আহ্বান জুবাইদা রহমানের অবৈধ অভিবাসন বন্ধে বাংলাদেশ-ইইউ একসঙ্গে কাজ করবে দেশের কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে ৩০৩ শিশু ৫ ধাপে হবে ইউপি নির্বাচন, ২১ জানুয়ারি শুরু বিএনপির নেতাকর্মীদের ফ্যাসিবাদী আচরণ না করার আহ্বান রিজভীর সারা দেশে ২ দিন এলপিজি বিক্রি বন্ধ ঘোষণা কমফোর্ট জোন: কারার ঐ লৌহকপাট… গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে কানাডার প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে জিরো টলারেন্স নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান রাষ্ট্রপতির আইএমএফের ঋণ নিয়ে আলোচনা চলছে : অর্থমন্ত্রী
সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১১ অপরাহ্ন

রিয়াদে হুথি হামলা: দুই প্রান্তে আটকে ৭ হাজার রেমিট্যান্স যোদ্ধা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি যখন আবারও রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও ছায়াযুদ্ধের ভয়াল রূপ নিচ্ছে, তখন সেই বারুদের অনলে সবার অজান্তেই পুড়ে ছারখার হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লাইফলাইন এবং লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্য| সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর থেকে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলে নেমে এসেছে এক মারাত্মক অচলাবস্থা| একদিকে বিদেশের মাটিতে প্রাণ হারিয়েছেন নিরপরাধ বাংলাদেশি নাগরিক, রক্তাক্ত হয়েছেন বহু মানুষ; অন্যদিকে হাজার হাজার মাইল দূরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জমে উঠেছে স্বজন হারানোর কান্না, আটকে পড়া রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের দিশেহারা আর্তনাদ আর ফ্লাইট বাতিলের চরম অনিশ্চয়তা| বেসামরিক বিমান চলাচলের মতো সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক অবকাঠামোকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার এই অপতৎপরতা কেবল হাজারো প্রবাসীর কর্মজীবনকেই অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়নি, বরং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের একক বৃহত্তম শ্রমবাজার ও জাতীয় অর্থনীতির মূল ভিত্তি রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর এক অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে|

গত শনিবার দুপুরের ব্যস্ত সময়ে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি এক মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়| সাধারণ ট্রানজিট লাউঞ্জে যখন শত শত নারী, পুরুষ ও শিশু পরবর্তী ফ্লাইটের অপেক্ষায় বসে ছিলেন, তখনই বিকট শব্দে আছড়ে পড়ে মারণাস্ত্র| মুহূর্তের মধ্যে কেঁপে ওঠে পুরো টার্মিনাল ভবন, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়া, ধ্বংসাবশেষ আর মানুষের ছিন্নভিন্ন দেহাংশ| আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই নৃশংস হামলায় বিভিন্ন দেশের ১২ জন নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন তিন শতাধিক মানুষ| নিহতদের মধ্যে দুই হতভাগ্য বাংলাদেশি রয়েছেন, যাদের একজন বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামের বাসিন্দা মো. শাহেদ আহমেদ (৩৬) এবং অন্যজন কুমিল্লার অধিবাসী মুফতি নাসরুল্লাহ বদরপুরী| এ ছাড়া আরও বহু বাংলাদেশি গুরুতর আহত হয়ে রিয়াদের বিভিন্ন হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন, যাদের মধ্যে অন্তত চারজন কিং খালিদ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করছেন| রোববার সকালেও রিয়াদের কেন্দ্রস্থলে পরপর দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, যা পুরো অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতার মাত্রা আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে|

এই হামলার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে এক হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের জামিয়া আরাবিয়া রবিউল উলুম মাদ্রাসার প্রধান মুফতি মুহাম্মদ আলী কাসেমি| দীর্ঘ দুই-তিন বছরের পরিকল্পনা ও স্বপ্ন নিয়ে তিনি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা মিলিয়ে ৪৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে শনিবার ঢাকা ছেড়েছিলেন| স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে বারোটায় তারা কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে জেদ্দাগামী রিয়াদ এয়ারলাইন্সের আরএক্স-১৭ ফ্লাইটের বোর্ডিং লাউঞ্জে অপেক্ষা করছিলেন| সেই অপেক্ষাগারে থাকা চার থেকে পাঁচশত যাত্রীর প্রায় অর্ধেকই ছিলেন বাংলাদেশি| ফ্লাইট ছাড়ার পূর্বমুহূর্তে যখন তারা বিমানে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই টার্মিনালের মূল ভবনে সরাসরি আঘাত হানে ক্ষেপণাস্ত্র| বিকট শব্দে পায়ের নিচের মেঝে কেঁপে ওঠে এবং চোখের পলকে রক্তে ভেসে যায় পুরো লাউঞ্জ| মুফতি কাসেমি ও তার সঙ্গে থাকা প্রায় বিশজন সহযাত্রী প্রাণভয়ে টার্মিনাল থেকে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে খেজুরবাগানে আশ্রয় নেন| তবে তাদের দীর্ঘদিনের লালিত ওমরাহর আনন্দ চিরতরে বিষাদে রূপ নেয়, যখন তারা দেখতে পান দলের অন্যতম প্রিয় সদস্য মুফতি নাসরুল্লাহ বদরপুরী ঘটনাস্থলেই শাহাদাত বরণ করেছেন এবং আরও নয়জন সহকর্মী রক্তাক্ত হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন|

রিয়াদের রক্তক্ষয়ী এই ঘটনার ধাক্কা তৎক্ষণাৎ আছড়ে পড়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালে| হামলার পরপরই সৌদি কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা বিবেচনায় কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করে| পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা জারি থাকায় ঢাকা থেকে রিয়াদ ও জেদ্দাগামী বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের অন্তত দশটি শিডিউল ফ্লাইট একের পর এক বাতিল করা হয়| বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৩৯ ও বিজি-৩৪০ রাউন্ড ট্রিপসহ ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্স, রিয়াদ এয়ার এবং শ্রীলংকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটগুলো পুরোপুরি স্থগিত হয়ে পড়ে| বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের হিসাবে, কেবল ঢাকা বিমানবন্দরেই শনিবার রাত থেকে রোববার পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার প্রবাসী শ্রমিক ও যাত্রী আটকে পড়েন| অন্যদিকে রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরে দেশে ফেরার অপেক্ষায় অনিশ্চিত অবস্থায় দিন গুনছেন প্রায় ৪ হাজার বাংলাদেশি যাত্রী| দুই প্রান্তের এই আকস্মিক অচলাবস্থায় প্রায় সাত হাজার মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াত পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়েছে|

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক অবর্ণনীয় মানবিক সংকট| দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল—কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী কিংবা উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে জমানো সঞ্চয় ভেঙে কিংবা ঋণ করে গাড়ি ভাড়া করে ছুটে আসা প্রবাসীরা টিকিট আর পাসপোর্ট হাতে নিয়ে কাউন্টারে কাউন্টারে ছুটছেন| কুমিল্লার রফিকুল ইসলামের মতো শত শত শ্রমিকের চোখেমুখে কেবলই আতঙ্ক আর উদ্বেগের ছাপ| ছুটি কাটিয়ে সময়মতো কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে সৌদি আরবের কড়া অভিবাসন আইনের কবলে পড়ে চাকরি হারানোর সরাসরি ঝুঁকি রয়েছে| কফিল বা নিয়োগকর্তার বেঁধে দেওয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হাজিরা দিতে ব্যর্থ হলে কাজের ভিসা বাতিল হয়ে যাবে, যার ফলে সারা জীবনের বিনিয়োগ মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে| অথচ এয়ারলাইন্সগুলোর পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস বা পরবর্তী যাত্রার বিকল্প কোনো সূচি না পাওয়ায় এই মানুষগুলো বিমানবন্দরের মেঝেতে বসে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন| ঢাকায় থাকা-খাওয়ার মতো বাড়তি আর্থিক সামর্থ্য অনেকেরই নেই, আবার গ্রামে ফিরে গিয়ে পুনরায় ঢাকায় আসার মতো পরিস্থিতিও তাদের অবশিষ্ট নেই|

এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই মরিয়া হয়ে বিকল্প ট্রানজিট রুটের টিকিট কাটার চেষ্টা করছেন, কিন্তু সেখানেও দেখা দিয়েছে চরম নৈরাজ্য| ভারতের মুম্বাই হয়ে কিংবা দুবাই ও ওমান হয়ে রিয়াদ বা জেদ্দায় যাওয়ার রুটের টিকিটের দাম ট্রাভেল এজেন্সিগুলো এক ধাক্কায় কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে| চাঁদপুরের এক যাত্রী জানান, তিনি ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের মুম্বাই ট্রানজিটের টিকিট কেটেছিলেন, কিন্তু বিমানবন্দরে আসার পর জানতে পারেন যে ভারতীয় বিমানবন্দরগুলোতে সৌদিগামী ট্রানজিট যাত্রীদের বোর্ডিং পাস দেওয়াই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে| এর ওপর হুথি বিদ্রোহীরা আন্তর্জাতিক বেসামরিক এয়ারলাইন্সগুলোকে সৌদি আকাশসীমা ব্যবহারে ক্রমাগত চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে চলায় অন্য কোনো বিদেশি সংস্থাও অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনায় সাহস পাচ্ছে না| ফলে চড়া মূল্যেও কোনো নিশ্চিত বিকল্প পথ খুঁজে পাচ্ছেন না অসহায় এই যাত্রীরা| শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ এই সংকটকে একটি বৈশ্বিক বিপর্যয় আখ্যা দিয়ে যাত্রীদের সরাসরি বিমানবন্দরে না এসে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখার এবং ধৈর্য ধারণের অনুরোধ জানিয়েছেন|

এই বিমান চলাচল সংকটের সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা| তাদের মতে, এটিকে কেবল সাময়িক ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা হিসেবে দেখলে মারাত্মক ভুল হবে| ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং বা বিএমইটির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে মোট ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৩ জন কর্মী বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, যার মধ্যে এককভাবে সৌদি আরবেই গেছেন ৩ লাখ ৭ হাজার ৮৮৭ জন| অর্থাৎ দেশের মোট আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের অর্ধেকেরও বেশি বা ৫৪ দশমিক ৬ শতাংশ কর্মসংস্থান সরাসরি সৌদির ওপর নির্ভরশীল| দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান আরও বেশি নির্ভরতার চিত্র তুলে ধরে; ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিদেশে যাওয়া ২৮ লাখ ১৮ হাজার ২৬৩ জন কর্মীর মধ্যে ১৭ লাখ ৪০ হাজার ৫৯৭ জনই গেছেন এই মরুভূমির দেশে, যা মোট বহির্গমনের ৬১ দশমিক ৭৬ শতাংশ| ফলে এই করিডোরে যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী সামরিক আঘাত বাংলাদেশের সার্বিক বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যবস্থার মেরুদণ্ডে সরাসরি আঘাত হানার শামিল|

আন্তর্জাতিক জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে যদি নিরাপত্তার এই সংকট দীর্ঘায়িত হয় এবং ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত থাকে, তবে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে তিল তিল করে গড়ে ওঠা দ্বিপাক্ষিক জনশক্তি রপ্তানির যে পাইপলাইন, তা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়বে| হাজার হাজার প্রস্তুত ভিসা ও চাহিদাপত্র বাতিল হয়ে যেতে পারে, যার ফলে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ যেমন বিনষ্ট হবে, তেমনি বিদেশে কাজের আশায় জমিজমা বিক্রি করা লাখ লাখ গ্রামীণ তরুণ সর্বস্বান্ত হয়ে পড়বেন|

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের উদ্বেগ আরও গভীর| নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি ও সিপিডির সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাতের এই নতুন বিস্তার আঞ্চলিক অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশকে চরমভাবে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে| সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর অভ্যন্তরে যদি যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, তবে সেখানে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থমকে যাবে, যা প্রবাসী শ্রমিকের চাহিদাকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করবে| এর প্রত্যক্ষ ও নিষ্ঠুর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের লাখ লাখ সাধারণ পরিবারের ওপর, যারা মাস শেষে প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে তাদের সংসার চালায়| জাতীয় রিজার্ভ যখন নানামুখী বৈদেশিক চাপে রয়েছে, তখন সৌদি আরব থেকে আসা রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বড় ধরনের দেউলিয়াত্বের ঝুঁকিতে পড়তে পারে|

একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এবং অভিবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর নির্বাহী পরিচালক তাসনিম সিদ্দিকী উল্লেখ করেছেন যে, ভূরাজনৈতিক কোনো স্বার্থের অংশীদার না হয়েও কীভাবে দরিদ্র অভিবাসী শ্রমিকরা আন্তর্জাতিক ছায়াযুদ্ধের নির্মম বলির পাঠায় পরিণত হয়, রিয়াদের এই ট্র্যাজেডি তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ| তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুদ্ধের নামে সাধারণ বেসামরিক বিমানবন্দর এবং নিরস্ত্র যাত্রীদের ওপর এমন হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন| তিনি নিহত বাংলাদেশি কর্মীদের দ্রুত রাষ্ট্রীয় খরচে দেশে ফিরিয়ে আনা, তাদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং রিয়াদে আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের আহ্বান জানান|

এ ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম গভীর শোক ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন| তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, সরকার নিহত দুই বাংলাদেশির মরদেহ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে এবং আইসিইউতে থাকা চারজনসহ সব আহতের চিকিৎসার খোঁজখবর সার্বক্ষণিক রাখা হচ্ছে| একই সঙ্গে তিনি বেসামরিক বিমানবন্দর ও নিরপরাধ মানুষের ওপর এমন বর্বরোচিত সামরিক হামলা অবিলম্বে বন্ধের জোর দাবি জানান| অন্যদিকে এই বর্বরোচিত হামলার বিরুদ্ধে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় সংগঠনগুলো অভিন্ন সুরে তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেছে| ওমরাহ পালন শেষে ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এই আক্রমণকে একটি জঘন্য ও কাপুরুষোচিত কাজ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন যে, যুদ্ধ কখনোই কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না; সব পক্ষকে অবিলম্বে কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে| ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, ইসলামী যুব আন্দোলনের সভাপতি মুফতি মনসুর আহমদ সাকী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিও পৃথক বিবৃতিতে বেসামরিক আকাশপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে|

রিয়াদের মাটি থেকে ঢাকার রানওয়ে পর্যন্ত বিস্তৃত এই সংকট আজ প্রমাণ করছে যে, আধুনিক বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে কোনো যুদ্ধই আর নির্দিষ্ট সীমানার ভেতর আবদ্ধ থাকে না| দূরপাল্লার ড্রোন আর মিসাইলের নিশানা যখন আন্তর্জাতিক এভিয়েশন করিডোরে এসে পড়ে, তখন তার ক্ষত গিয়ে লাগে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একটি দরিদ্র দেশের শ্রমজীবী মানুষের ঘরে| যে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা ঘাম ঝরিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার চাকা সচল রাখেন, তাদের জীবনের নিরাপত্তা আজ এক অনিশ্চিত ভূকৌশলগত সংঘাতের মুখে জিম্মি হয়ে পড়েছে| আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত বেসামরিক আকাশপথের নিরাপত্তা অবিলম্বে পুনর্বহাল করা এবং আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর উচিত যুদ্ধংদেহী মনোভাব পরিহার করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা| অন্যথায় এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকেই রক্তরঞ্জিত করবে না, বরং বাংলাদেশের মতো শ্রমনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিকেও এক অনিবার্য পতনের মুখোমুখি দাঁড় করাবে|

তথ্যসূত্র: নিউএজ ও যুগান্তর


এ জাতীয় আরো খবর...