থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে সপ্তাহব্যাপী নানা আলোচনা, বিতর্ক ও সমীক্ষা উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের দুই হাজার ছাব্বিশ সালের বার্ষিক সম্মেলন। তবে বিশ্বজুড়ে চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঘাড়ে চেপে বসা ঋণের অস্বাভাবিক বোঝা, ক্রমহ্রাসমান বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা এবং প্রকটতর হতে থাকা বেকারত্বের মতো মৌলিক সংকটগুলো নিরসনে কোনো কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ছাড়াই এই বৈশ্বিক আয়োজন সমাপ্ত হয়েছে। বারোই অক্টোবর থেকে আঠারোই অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংককের কুইন সিরিকিট ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, অর্থনীতিবিদ এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সম্মেলনের শেষ দিন রোববার প্রকাশিত সার্বিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, বড় ধরনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে বিশ্ব অর্থনীতি আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও তার সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো। মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, রাশিয়া ও ইউক্রেনের দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ সুদের হার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির প্রভাবে শ্রমবাজারে সম্ভাব্য অস্থিরতার গভীর উদ্বেগকে সঙ্গী করেই সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেছেন উন্নয়নশীল বিশ্বের নীতিনির্ধারকরা।
সাত দিনব্যাপী এই সম্মেলনের মূল আলোচনায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সরকারি ঋণের ঝুঁকি, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তরের মতো বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়। তবে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষ থেকে যে জরুরি আর্থিক ও নীতিগত সহায়তার প্রত্যাশা করা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে তার বিপরীতে বরাবরের মতোই গতানুগতিক পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক মূলত বাজেট ঘাটতি কমিয়ে আনা, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কারের গতি বাড়ানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার মতো চিরাচরিত শর্ত ও সুপারিশের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহ কমে যাওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলো যে তীব্র তহবিল সংকটে পড়েছে, তা মোকাবিলায় নতুন কোনো জরুরি তহবিল বা ঋণ মওকুফের কার্যকর ঘোষণা আসেনি। ফলে সংকট উত্তরণে সমন্বিত বৈশ্বিক উদ্যোগের ঘাটতি আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সম্মেলনের সমাপনী দিবসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান ঋণঝুঁকির বিষয়টি অকপটে স্বীকার করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে বৈশ্বিক বাজেট ভারসাম্যহীনতার মূল উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে মূলত উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কিছু উন্নয়নশীল দেশ তাদের সামগ্রিক ঋণের মাত্রা কমিয়ে আনতে সক্ষম হলেও আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে বন্ডের মুনাফা বা ইল্ড বেড়ে যাওয়ার কারণে নতুন ঋণ গ্রহণের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জর্জিয়েভা তথ্য দিয়ে জানান, মাত্র এক দশক আগের তুলনায় বর্তমানে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে এই দেশগুলোকে তাদের মোট অভ্যন্তরীণ সরকারি রাজস্ব আয়ের প্রায় চৌদ্দ শতাংশ ব্যয় করতে হচ্ছে কেবল পুরনো ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের পেছনে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের এত বড় একটি অংশ ঋণ পরিশোধে চলে যাওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় করার মতো অর্থের তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে। মূলত ধনী দেশগুলোর কঠোর আর্থিক নীতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার চড়া থাকায় দরিদ্র দেশগুলোর অর্থনীতিতে তার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
ব্যাংকক সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা ও উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো বর্তমানে নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বাজেট সংকট সামাল দিতেই বেশি ব্যস্ত। ফলে দরিদ্র দেশগুলোর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বা উন্নয়ন সহায়তার বিষয়টি তাদের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট জশ লিপস্কি এই সম্মেলনের ফলাফল মূল্যায়ন করতে গিয়ে জানান, উন্নয়নশীল বিশ্বের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি যুগোপযোগী ও বাস্তবসম্মত পথনির্দেশনা তৈরির বড় সুযোগ এবারের সম্মেলনে ছিল, কিন্তু নীতিনির্ধারকরা তা কাজে লাগাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। উন্নত দেশগুলো যখন নিজেরাই আর্থিক চাপের মুখে থাকে, তখন বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে কলম্বিয়ার সাবেক অর্থমন্ত্রী এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের বিশিষ্ট গবেষক মাউরিসিও কার্দেনাস জানান, সম্মেলনে আসা অধিকাংশ দেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেই ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা দেখা গেছে। কিন্তু সেই আসন্ন ঝড় মোকাবিলায় কোন পথে এগোতে হবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা সম্মেলনে পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে উন্নয়নশীল দেশের শ্রমবাজারে যে বড় আঘাত আসতে পারে, তা নিয়ে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সচেতন থাকলেও তা মোকাবিলায় কোনো বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা দিতে পারেনি।
অর্থনৈতিক নীতিমালার পাশাপাশি এবারের সম্মেলনে ভূরাজনৈতিক উত্তাপ ও কূটনৈতিক বিভাজন ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। দুই হাজার বাইশ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের পর থেকে আন্তর্জাতিক এই দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে তীব্র মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, ব্যাংককেও তার প্রভাব দেখা গেছে। আইএমএফের স্টিয়ারিং কমিটির নীতিনির্ধারণী বৈঠকে রুশ অর্থমন্ত্রী বক্তব্য দিতে শুরু করলে প্রতিবাদস্বরূপ প্রায় অর্ধেক দেশের প্রতিনিধি সভাকক্ষ ত্যাগ করে চলে যান। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের সরাসরি আঁচও লেগেছে এই সম্মেলনে। আইএমএফের স্টিয়ারিং কমিটির প্রধান এবং সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদআনের ব্যাংকক যাত্রা চরম নিরাপত্তাজনিত সংকটের মুখে পড়ে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে বিমান চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় তিনি নির্ধারিত সময়ে রওনা হতে পারেননি। পরবর্তীতে তাঁকে সড়কপথে প্রতিবেশী দেশ কাতারে গিয়ে সেখান থেকে বিশেষ বিমানে করে ব্যাংককের সম্মেলনে যোগ দিতে হয়। এই ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংকট আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার পথকে কতটা জটিল করে তুলেছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া প্রচলিত কঠোর শর্তাবলির সমালোচনা করে সম্মেলনে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের অধ্যাপক কেট পিকেট। তিনি জানান, কেবল কঠোর কাঠামোগত সংস্কার এবং ব্যয় সংকোচনের ওপর জোর দিয়ে কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, বরং এখন প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। তাঁর মতে, সমাজে ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য বাড়তে থাকলে এবং দারিদ্র্য আরও প্রকট হলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র ও অর্থনীতির সামাজিক ব্যয় অনেক গুণ বেড়ে যায়। কোনো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে কেবল কাগজে-কলমে স্থিতিশীল বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না, বরং সেই স্থিতিশীলতার সুফল সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে নাকি কেবল মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণির হাতে পুঞ্জীভূত হচ্ছে, তা যাচাই করা জরুরি।
বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস নিয়েও সম্মেলনে খুব একটা আশার বাণী শোনা যায়নি। বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে সম্মেলনে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির যে বড় ধাক্কা লেগেছিল, বিশ্ব অর্থনীতি তা ধারণার চেয়ে ভালোভাবেই সামাল দিয়েছে এবং সরাসরি বৈশ্বিক মন্দা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। উন্নত অর্থনীতির প্রায় অর্ধেক দেশেই প্রবৃদ্ধির হার আগের পূর্বাভাসের চেয়ে কমে গেছে। আর উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির হার চার দশমিক চার শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে তিন দশমিক ছয় শতাংশে নেমে এসেছে। আয়হান কোসে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেন, আজকের অর্থনৈতিক সহনশীলতা আগামীকালের স্থিতিশীলতার কোনো নিশ্চয়তা দেয় না। বর্তমানে প্রতি তিন থেকে ছয় মাসের ব্যবধানে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন নতুন অপ্রত্যাশিত আঘাত আসছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সার্বক্ষণিক আতঙ্কের মধ্যে রেখেছে।
এবারের সম্মেলনে উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে পরিসংখ্যানটি সামনে এসেছে, তা হলো সরকারি উন্নয়ন সহায়তা বা ওডিএ নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়া। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত দুই হাজার পঁচিশ সালে বিশ্বজুড়ে সরকারি উন্নয়ন সহায়তা বা অনুদানের পরিমাণ তেইশ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা একক কোনো বছরে বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পতন। ধনী দেশগুলোর এই সহায়তা কমে যাওয়ার ফলে দরিদ্র দেশগুলোকে এখন বাধ্য হয়ে অভ্যন্তরীণ কর আহরণ, বাণিজ্যিক ঋণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা গত ষোলোই অক্টোবরের মূল অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে উন্নয়ন অর্থায়নে নতুন কৌশলের ওপর জোর দেন। তিনি জানান, কেবল সরকারি অর্থ দিয়ে উন্নয়নের বিশাল চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়; এজন্য সরকারি তহবিলের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ, দাতব্য সংস্থার অনুদান এবং আধুনিক প্রযুক্তিকে একীভূত করে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা সবসময় কম ঝুঁকি ও অধিক মুনাফার খাত খোঁজেন। ফলে দারিদ্র্য বিমোচন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা কিংবা গ্রামীণ অবকাঠামোর মতো অলাভজনক কিন্তু অত্যাবশ্যকীয় খাতে বেসরকারি পুঁজি পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
ব্যাংকক সম্মেলনের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বেগজনক আলোচ্য বিষয় ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কর্মসংস্থান সংকট। সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্যে জানানো হয়, আগামী দশ থেকে পনেরো বছরের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায় একশ বিশ কোটি তরুণ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করবেন। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক ধারা অব্যাহত থাকলে এই সময়ে বিশ্বজুড়ে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হতে পারে মাত্র চল্লিশ কোটি। অর্থাৎ আগামী দেড় দশকে শ্রমবাজারে আসা প্রায় আশি কোটি তরুণই প্রথাগত কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এই বিশাল কর্মসংস্থান ঘাটতি মোকাবিলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসার, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও উন্নত অবকাঠামো নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তরুণদের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও ব্যাংককের এই বার্ষিক সম্মেলনের আলোচনা ও পর্যবেক্ষণগুলো বিশেষ নীতিগত বার্তা বহন করছে। যদিও সম্মেলনে এককভাবে বাংলাদেশকে নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা আসেনি, তবু বৈশ্বিক এই প্রবণতা দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য তিনটি বড় সতর্কবার্তা সামনে এনেছে। প্রথমত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে না পারলে বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণ পরিশোধের চাপে দেশের উন্নয়ন বাজেট আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বৈদেশিক অর্থায়নের কঠোর শর্তাবলি মোকাবিলায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা মজবুত করতে হবে। তৃতীয়ত, দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে বাঁচাতে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার করে শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে নতুন কোনো ঋণ প্রস্তাবের আলোচনা চললেই সেটিকে চূড়ান্ত প্রাপ্তি হিসেবে না ধরে ঋণের সুদের হার, পরিশোধের মেয়াদ ও শর্তাবলি গভীরভাবে যাচাই করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সব মিলিয়ে ব্যাংককের এই সম্মেলন বিশ্ব অর্থনীতির গভীর ক্ষতগুলোকে চিহ্নিত করতে পারলেও দরিদ্র দেশগুলোর ঋণের বোঝা কমানো এবং কোটি কোটি তরুণের কাজের সংস্থান কীভাবে হবে, সেই মৌলিক প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।
তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট