রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোর চিরচেনা আবহ বদলে গেছে নিঃশব্দে। ভোর থেকে রাত অবধি ক্রেতা-বিক্রেতার যে দরদামের হাঁকডাক একসময় মুখর থাকত বস্তা, পাল্লা কিংবা ডজনের ভাষায়, সেখানে আজ নেমে এসেছে এক তীব্র সংকোচনের ছায়া। বাজারের থলে কেবল পরিবারের প্রয়োজনীয়তার আয়না নয়, বরং তা এখন হয়ে উঠেছে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ভারসাম্যহীন লড়াইয়ের এক নির্মম দলিল। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের পকেটের টান এতটাই তীব্র আকার ধারণ করেছে যে, চিরাচরিত কেনাকাটার পরিমাপে এসেছে নাটকীয় পরিবর্তন। যে বাজারে চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ কিংবা তেল কেনা হতো কেজি বা পাল্লার হিসাবে, সেখানে এখন কেনাবেচা চলছে পোয়া, হালি কিংবা নির্দিষ্ট ৫০, ১০০ বা ২০০ টাকার খুচরা অঙ্কে। পণ্যের অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির মুখে টিকে থাকার এই মরিয়া কৌশল কেবল যে মানুষের খাদ্যতালিকা সংকুচিত করে তুলছে তা নয়, বরং নগরের খুচরা বাণিজ্য, ক্রেতা-বিক্রেতার পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের ওপরও এক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করছে।
নিত্যপণ্যের বাজারের এই অদ্ভুত রূপান্তরের চিত্রটি সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে রান্নাঘরের অপরিহার্য পণ্যগুলোর দিকে তাকালে। মাসের নির্দিষ্ট সময়ে বড় ফর্দ নিয়ে মুদি দোকানে ঢোকার যে সংস্কৃতি এ দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে বংশপরম্পরায় চলে আসছিল, তা যেন এখন এক সুদূর অতীতে পরিণত হয়েছে। বাড়িভাড়া, সন্তানের লেখাপড়ার খরচ আর চিকিৎসা ব্যয়ের ধাক্কা সামলে মাসের শেষ দশ দিন নয়, বরং মাসের শুরু থেকেই হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সীমিত আয়ের মানুষ। ফলে বাজারের ফর্দ এখন আর মাসের নয়, হয়ে উঠেছে প্রতিদিনের। ক্রেতারা দোকানে গিয়ে নির্দ্বিধায় চেয়ে নিচ্ছেন মাত্র এক হালি ডিম, আড়াইশো গ্রাম মসুর ডাল, আধা কেজি পেঁয়াজ কিংবা কয়েকটি রসুনের কোঁয়া। একসময় যেসব কেনাকাটাকে ‘দিন এনে দিন খাওয়া’ অতিদরিদ্র শ্রেণির সংকট হিসেবে দেখা হতো, আজ তা নগরীর বিশাল একটি শিক্ষিত কর্মজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মানসম্মানের ভয়ে টিসিবির ট্রাকের পেছনে দাঁড়াতে না পারা এই মানুষগুলো পরিচিত দোকানির কাছে বাকির খাতা লম্বা করছেন কিংবা লজ্জা চেপে ছোট ছোট পুটলিতে সংসার টানার চেষ্টা করছেন।
আমিষের বাজারে এই রেশনিংয়ের চিত্রটি আরও বেশি করুণ ও উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। গরুর মাংস কিংবা বড় মাছ এখন সাধারণ পরিবারের কাছে প্রায় উৎসবকেন্দ্রিক খাদ্যদ্রব্যে পরিণত হয়েছে। মাংসের দোকানে দাঁড়িয়ে এখন আর কোনো সাধারণ ক্রেতাকে ওজন বেঁধে কেনার নির্দেশ দিতে দেখা যায় না বললেই চলে। বহু ক্রেতা এসে সোজা বিক্রেতাকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিয়ে বলছেন, তিনশো বা পাঁচশো টাকার মাংস দিতে। দোকানিরা সেই নির্দিষ্ট টাকার অনুপাতে হাড় ও মাংসের টুকরো মেপে প্লাস্টিকের ব্যাগে তুলে দিচ্ছেন। ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দৃশ্যমান। গোটা মুরগি কেনার সামর্থ্য হারিয়ে অনেকে এখন মুরগির ডানা, পা, গিলা কিংবা কলিজার মতো অপ্রচলিত অংশগুলো আলাদাভাবে কিনে বাড়ি ফিরছেন। ডিমের ক্ষেত্রেও খাঁচি বা ডজন ধরে কেনার রেওয়াজ উঠে গিয়ে তা ঠেকেছে এক হালি বা দুই হালির খুচরা স্তরে। মাছের বাজারেও বড় মাছ কেটে ভাগ করে কিংবা ছোট মাছ এক পোয়া বা দেড়শো গ্রাম মেপে নেওয়ার দৃশ্য এখন প্রতিদিনের স্বাভাবিক চিত্র।
ক্রেতাদের এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কেনাকাটার প্রভাব খুচরা বিক্রেতাদের ওপরও মারাত্মক অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে দোকানে ক্রেতার ভিড় লেগে আছে, কিন্তু দিনের শেষে বিক্রেতার মোট বিক্রির পরিমাণ ও মুনাফা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। আগে যে মুদিদোকানি মাত্র তিন-চারজন ক্রেতার কাছেই দিনে ১৫ থেকে ২০ কেজি মসুর ডাল বিক্রি করে ফেলতে পারতেন, এখন সেই একই পরিমাণ পণ্য বিক্রি করতে তাকে অর্ধশত ক্রেতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এতে করে বিক্রেতার সময় ও শ্রম ব্যয় হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি, অথচ দিনের শেষে ক্যাশবাক্সে টাকার অঙ্কে কোনো স্বস্তিদায়ক প্রবৃদ্ধি আসছে না। উপরন্তু, অল্প পরিমাণ পণ্য আলাদা আলাদা করে মেপে দিতে গিয়ে প্রতিটি পণ্যের পেছনে পলিথিন ও ছোট প্যাকেট ব্যবহারের পরিমাণ তিন থেকে চার গুণ বেড়ে গেছে। ফলে প্যাকেজিং বাবদ বিক্রেতার যে বাড়তি খরচ হচ্ছে, তা তাদের স্বল্প মুনাফাকে আরও সংকুচিত করে তুলছে।
সবজি বিক্রেতাদের সংকটটি আরও বেশি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। কাঁচাবাজারে অনেকেই এখন এসে একটি বেগুন, দুটো পটল কিংবা ২০ টাকার কাঁচামরিচ চেয়ে বসছেন। বিক্রেতারা ক্রেতার এই স্বল্প চাহিদাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যানও করতে পারছেন না, আবার এতে সম্মত হতে গিয়ে মারাত্মক লোকসানের মুখে পড়ছেন। স্তূপ করে রাখা শাকসবজি থেকে এভাবে খুচরো করে বাছাই করে নিয়ে যাওয়ার পর বাকি পণ্যগুলো রোদে ও বাতাসে শুকিয়ে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে দিনশেষে যে পণ্যটি অবিক্রীত থেকে যায়, তা বিক্রি করতে হয় পানির দরে কিংবা ফেলে দিতে হয় ডাস্টবিনে। এতে লাভ তো দূরের কথা, মূল পুঁজি তুলে আনাই ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের জন্য এক অসম্ভব লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
এই খুচরা কেনাকাটার ভেতরে লুকিয়ে আছে অর্থনীতির আরও এক নির্মম ও নিষ্ঠুর পরিহাস। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে অল্প টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্যটুকু কিনে সাধারণ মানুষ হয়তো নিজেদের বাজেট নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন। কিন্তু অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের গভীর স্তরে তাকালে দেখা যায়, এই ক্ষুদ্র পরিমাণের কেনাকাটায় ক্রেতারা অজান্তেই অনেক বেশি মূল্য পরিশোধ করছেন। খুচরা বাজারে যেকোনো পণ্যের পাইকারি বা কেজি দরের তুলনায় ভগ্নাংশ বা পোয়া হিসেবে কেনার দাম সবসময়ই বেশি রাখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, যে মসুর ডালের কেজি ১৫০ টাকা, তা যদি কোনো ক্রেতা এক পোয়া বা ২৫০ গ্রাম করে কেনেন, তবে বিক্রেতা তার কাছ থেকে নিচ্ছেন ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। ফলে চার দফায় এক কেজি ডাল কিনতে গিয়ে ওই ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা। অর্থাৎ নগদ টাকার চরম সংকটের কারণে দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষকেই প্রকারান্তরে প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত মাশুল দিতে হচ্ছে। দারিদ্র্যের এই দুষ্টচক্র মানুষকে এমন এক জালে আটকে ফেলছে, যেখানে কম কেনার কারণে তাকে উল্টো বেশি খরচের শিকার হতে হচ্ছে।
নিত্যপণ্যের এই নিয়ন্ত্রণহীন আগুন নেভাতে রাষ্ট্রীয় যেসব পদক্ষেপ দৃশ্যমান, তা প্রয়োজনের তুলনায় সাগরে বিন্দুবৎ। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবির ফ্যামিলি কার্ড কিংবা খোলা বাজারে বিক্রি (ওএমএস) কার্যক্রমের মাধ্যমে যে সাশ্রয়ী খাদ্যপণ্য সরবরাহ করা হয়, তা এই সুবিশাল নগরীর চাহিদার সিকিভাগও পূরণ করতে পারছে না। ভোর হওয়ার আগেই খোলা ট্রাকের পেছনে নারী, পুরুষ ও বৃদ্ধদের শত শত গজের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে পুড়ে, মানুষের ভিড়ে ধাক্কাধাক্কি সহ্য করেও শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ঘরে ফিরতে হচ্ছে অনেককে। অন্যদিকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের আকস্মিক অভিযান বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা বাজারে কোনো স্থায়ী স্বস্তি বয়ে আনতে পারছে না। তদারকি সংস্থাগুলো যখন বাজারে উপস্থিত থাকে, তখন হয়তো সাময়িকভাবে দোকান বন্ধ করে রাখা হয় কিংবা লোকদেখানো মূল্যে বিক্রি হয়। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাজার ফিরে যায় তার পুরোনো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। সরবরাহ চেইনের শীর্ষ স্তরে হাত না দিয়ে কেবল খুচরা দোকানে জরিমানা করার এই প্রথাগত পদ্ধতি যে পুরোপুরি ব্যর্থ, তা আজ দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।
তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে এই বাজার সংকোচনের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও ধ্বংসাত্মক প্রভাবটি পড়ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শরীরের ওপর। পরিবারের আয় সংকুচিত হওয়ার সাথে সাথে প্রথম কোপটি পড়ছে খাবারের পুষ্টিগুণের ওপর। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, নিত্যপণ্যের অতিরিক্ত মূল্যের কারণে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে প্রোটিন ও প্রয়োজনীয় অণুপুষ্টি গ্রহণের হার বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে। খাদ্যের প্লেটে এখন স্থান পাচ্ছে কেবল ক্ষুধা মেটানোর মতো সস্তা শর্করা, যেমন—ভাত আর আলুর আধিক্য। পাতলা ডাল আর ভাতের মিশ্রণ পেটের ক্ষুধা সাময়িকভাবে নিবারণ করতে পারলেও তা শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগাতে পারছে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে চিহ্নিত করা হয় ‘হিডেন হাঙ্গার’ বা লুকায়িত ক্ষুধা হিসেবে, যা বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও ভেতর থেকে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়।
বিশেষ করে পরিবারের বাড়ন্ত শিশু এবং বয়োবৃদ্ধদের ক্ষেত্রে এই লুকায়িত ক্ষুধার প্রভাব সুদূরপ্রসারী ও অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনছে। প্রয়োজনীয় প্রাণিজ আমিষ, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও জিংকের তীব্র ঘাটতির ফলে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি থমকে যাচ্ছে এবং তাদের মেধার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একটি প্রজন্মের মেধা ও শারীরিক সক্ষমতা যদি খাদ্যসংকটের কারণে এভাবে খাটো হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতে দেশ এক মারাত্মক কর্মক্ষমতাহীন ও রুগ্ণ জনগোষ্ঠীর ভার বহন করতে বাধ্য হবে। পুষ্টিবিদরা স্পষ্টভাবেই সতর্ক করছেন যে, আজ খাবারের বাজারে কয়েক টাকা বাঁচাতে গিয়ে যে আপস করা হচ্ছে, আগামী এক দশকে স্বাস্থ্য খাতের পেছনে পুরো জাতিকে এর চেয়ে বহুগুণ বেশি মূল্য শোধ করতে হবে।
বাজারের এই বর্তমান অস্থিরতা কেবল কোনো সাধারণ অর্থনৈতিক টানাপড়েন নয়; এটি একটি জাতির মৌলিক বেঁচে থাকার সংগ্রামের রূপরেখা। কেবল কিছু খোলা ট্রাকে চাল-ডাল বিক্রি করে কিংবা বাজার মনিটরিংয়ের নামে লোকদেখানো অভিযানের মাধ্যমে কোটি মানুষের এই নিঃশব্দ কান্না থামানো যাবে না। নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, সাধারণ মানুষ যখন কেজি ছেড়ে পোয়া কিংবা হালিতে নিজেদের জীবনকে বেঁধে ফেলে, তখন বুঝতে হবে সংকটটি আর উপরিভাগে নেই, তা পৌঁছে গেছে কাঠামোর একেবারে তলদেশে। মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের অদৃশ্য দৌরাত্ম্য ভেঙে উৎপাদন পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা, কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের পাশাপাশি শহরের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য সার্বজনীন খাদ্য সুরক্ষা বা পূর্ণাঙ্গ রেশনিং ব্যবস্থা অবিলম্বে চালু করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্যথায়, নিত্যপণ্যের এই অনল প্রবাহে পুড়তে থাকা সাধারণ মানুষের বোবা দীর্ঘশ্বাস পুরো অর্থনীতির সামাজিক ভিত্তিকে চিরতরে নড়বড়ে করে দেবে।
তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট