শিরোনামঃ
ইসরায়েলে আরও একটি প্যাট্রিয়ট পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র সাত বছরে ছয় নির্বাচন, কেন থিতু হতে পারছে না ইসরায়েল? ৫৫ বছরে সবজির দাম স্থিতিশীল রাখতে উদ্যোগ নেই: বাণিজ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যখাতে আওয়ামী লীগ সরকার ব্যাপক লুটপাট করেছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঠাকুরগাঁও উপ-নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই : ইসি সচিব ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ডেভিড ইমন ৭ দিনের রিমান্ডে আগামীতে স্কুল-মাদ্রাসায় একই প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হবে: শিক্ষামন্ত্রী ঢাকা শহরে পদ্মা থেকে ১০০ কোটি লিটার পানি সরবরাহের নতুন প্রকল্প জয়-পুতুলসহ ৮ জনের মামলায় সিআরআইয়ের আয়কর নথি জব্দের আদেশ গুরুদাসপুর থানার ওসি প্রত্যাহার
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২২ পূর্বাহ্ন

কাগজে শতভাগ সাফল্যের দাবি: হামে চিকিৎসাধীন ৯৮ শতাংশই টিকাবিহীন!

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৮ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

দেশের জনস্বাস্থ্য খাতের ওপর দীর্ঘদিন ধরে জেঁকে বসা হামের মহামারি পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার এক নির্মম ও বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে রাজধানীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড আইসোলেশন সেন্টারের পরিসংখ্যানে । দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা হামে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে নিরানব্বই শতাংশের কাছাকাছি মানুষই যে জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে জীবনরক্ষাকারী এই টিকার বাইরে থেকে গেছেন, তা আমাদের টিকাদান কর্মসূচির সুদূরপ্রসারী ও মারাত্মক দুর্বলতাগুলোকে নতুন করে জাতির সামনে উন্মোচন করে দিয়েছে । স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন পরিচালিত এই বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রে সাম্প্রতিক সময়ে সংগৃহীত তথ্যে দেখা গেছে যে, চিকিৎসাধীন চার শতাধিক রোগীর মধ্যে মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন নির্দিষ্ট টিকা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন, বাকি বিশাল সংখ্যক রোগীই সম্পূর্ণ টিকা ছাড়াই এই মারাত্মক ভাইরাসের শিকার হয়েছেন । দেশের চৌষট্টিটি জেলা থেকেই যখন রোগীরা এই কেন্দ্রে চিকিৎসার্থে ভিড় জমাচ্ছেন, তখন একক এই প্রতিষ্ঠানের এই পরিসংখ্যান কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের চিত্র নয়, বরং গোটা জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির কার্যকারিতা ও সঠিক তদারকির অভাবকেই জোরালোভাবে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে ।

চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া এই মারাত্মক হামের প্রাদুর্ভাব দীর্ঘ সময় ধরে দেশের শিশুস্বাস্থ্যকে এক অচলাবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে । স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, গত চব্বিশ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত ব্যবধানেও দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও এর উপসর্গে নতুন করে সাতটি নিষ্পাপ প্রাণ ঝরে গেছে এবং প্রায় তেরোশো মানুষের শরীরে নতুন করে এই রোগের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে । গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই মহামারিতে এ পর্যন্ত মোট মৃতের সংখ্যা ১২৪০ জনে গিয়ে ঠেকেছে এবং দেশজুড়ে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মিলিয়ে আক্রান্তের মোট সংখ্যা প্রায় দুই লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, যেকোনো কমিউনিটিতে হামের প্রাদুর্ভাব কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করতে হলে হাম-যুক্ত টিকার দুটি ডোজের ক্ষেত্রে অন্তত পঁচানব্বই শতাংশ কভারেজ বা টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে । অথচ আমাদের দেশে চলমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, রোগটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও টিকাদানের এই কাঙ্ক্ষিত ও নিরাপদ সীমানায় পৌঁছাতে আমরা মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়েছি, যার খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ।

সরকার ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের পরিসংখ্যান নিয়ে নানা সময়ে বড় বড় দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র তার সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক বলে প্রতীয়মান হচ্ছে । স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং রোগতত্ত্ব ও পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী পরিচালিত জরুরি টিকাদান ক্যাম্পেইনের পর শতভাগের বেশি বা প্রায় ১১৮ শতাংশ অর্জিত হয়েছে বলে ফলাও করে প্রচার চালানো হয়েছিল । কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে যে, যদি কাগজে-কলমে টিকাদানের হার এত বেশিই হয়ে থাকে, তবে আজ ডিএনসিসি আইসোলেশন সেন্টারে চিকিৎসাধীন রোগীদের প্রায় সবাই কেন সম্পূর্ণ টিকাবিহীন অবস্থায় হাজির হচ্ছেন । ইপিআই বা সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি এক কোটি আশি লক্ষ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, কিন্তু তাদের কাছে দেশের মোট যোগ্য শিশুর প্রকৃত ও নিখুঁত কোনো পরিসংখ্যানই ছিল না । অন্যদিকে ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন বা আইপিএইচএন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি লক্ষ্যমাত্রা ধরে দাবি করেছিল যে তারা প্রায় দুই কোটি ছাব্বিশ লক্ষ শিশুকে টিকা দিয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় আটানব্বই শতাংশ । এই দুই সরকারি সংস্থার দেওয়া পরস্পরবিরোধী লক্ষ্যমাত্রা ও সাফল্যের অংক নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মনে তীব্র সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে এবং এর মাধ্যমে তথ্যগত গরমিল ও সঠিক মনিটরিংয়ের অভাবই প্রকট হয়ে উঠেছে ।

গ্রাম কিংবা শহর—সর্বত্রই সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় টিকা পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে বহু পরিবার ও অভিভাবক এই জরুরি ক্যাম্পেইনের আওতার বাইরে থেকে গেছেন । ডিএনসিসি আইসোলেশন সেন্টারে চিকিৎসাধীন শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বললে জানা যায় যে, সচেতনতার অভাব এবং সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য না পাওয়ার কারণেই অনেক শিশু টিকা গ্রহণ করতে পারেনি । মানিকগঞ্জ থেকে চিকিৎসার জন্য আসা এক শিশুর অভিভাবক জানান যে, তিনি ঢাকায় কাজের ব্যস্ততায় এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে তার পরিবার এই টিকাদান ক্যাম্পেইনের কোনো খবরই সময়মতো জানতে পারেনি । আবার এমন অনেক শিশুও রয়েছে যাদের বয়স ছয় মাসের কম হওয়ায় তারা ক্যাম্পেইনের নির্ধারিত বয়সের সীমার বাইরে ছিল, কিন্তু নবজাতক ও দুধের শিশুদের মধ্যেও এই সংক্রমণ মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে । আইসোলেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চিকিৎসাধীন শিশুদের অনেকের বয়সই মাত্র চল্লিশ-পঞ্চাশ দিন থেকে শুরু করে উনিশ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে হাম কেবল নির্দিষ্ট বয়সের শিশুদেরই নয়, বরং সামগ্রিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি থাকা যেকোনো বয়সীর জন্যই বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনছে ।

বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট ও দেশের চিকিৎসা গবেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়মিত টিকাদানে বিঘ্ন ঘটা, মহামারির পরবর্তী বিরতি এবং টিকার সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতির কারণেই মূলত এই অনাক্রম্যতার বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়েছে । ২০২০ সাল থেকেই হাম ও রুবেলা বা এমআর টিকার ধারাবাহিক সরবরাহ সংকটের কারণে বহু শিশু তাদের নিয়মিত শিডিউলের টিকা সময়মতো গ্রহণ করতে পারেনি । এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেসব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, তার কার্যকারিতা এবং মাঠপর্যায়ে প্রকৃত বিতরণ ব্যবস্থার মধ্যে বিস্তর ফারাক থাকার কারণে এই বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠেছে । আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফও বারবার সতর্ক করে বলেছে যে, এই প্রাদুর্ভাবের প্রধান শিকার হচ্ছে অত্যন্ত কম বয়সী এবং আংশিক বা সম্পূর্ণ টিকাবিহীন শিশুরা । তাই কেবল শহরকেন্দ্রিক লোকদেখানো প্রচারণা না চালিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে খুঁজে বের করতে হবে ঠিক কতগুলো শিশু নিয়মিত বা জরুরি টিকাদান কর্মসূচির বাইরে রয়ে গেছে ।

পরিশেষে বলা যায়, হামের মতো একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু এবং লাখ লাখ মানুষের আক্রান্ত হওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, এটি আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রশাসনিক ও কাঠামোগত দুর্বলতার এক করুণ দলিল । টিকাদানের মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত পরিসংখ্যানের বেড়াজাল থেকে বের হয়ে এসে মাঠপর্যায়ের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে হবে এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে । সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যকার সমন্বয়হীনতা দূর করে এবং টিকাদান ক্যাম্পেইনের তদারকি জোরদার করার মাধ্যমেই কেবল এই মহামারি রোধ করা সম্ভব । অন্যথায় স্বাস্থ্য খাতের এই মারাত্মক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ফাঁকফোকড় ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো জাতীয় সংকটের জন্ম দিতে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

তথ্যসূত্র: নিউএজ


এ জাতীয় আরো খবর...