শিরোনামঃ
এসআরবির মহাপরিচালকসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন ৭ কর্মকর্তাকে বদলি সরকার বিরোধী দল দমনে তৎপর, ফ্যাসিস্ট দমনে নমনীয়: নাহিদ জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এবার আলাদা কমিটি গঠনের চিন্তা ১১ দলীয় ঐক্যের সরকারের অদক্ষতার দায় বিরোধী দলের ওপর চাপানো হচ্ছে: জামায়াত আমির ‘রাইট ট্র্যাকে’ রূপপুর প্রকল্প, দ্রুতই মিলবে বিদ্যুৎ: প্রযুক্তিমন্ত্রী ধর্মের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির চট্টগ্রাম কাস্টমসে চার মাসে ২৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় দ্বিতীয় পদ্মা ও যমুনা সেতু এবং পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর খুলনায় শুরু হচ্ছে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ সিজন-২, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী ডি-৮ বাণিজ্যের বাধা কাটাতে এফটিএ-পিটিএ বাস্তবায়নের তাগিদ বাংলাদেশের
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৩৪ অপরাহ্ন

রাজধানীর গণপরিবহনে নতুন যুগের সূচনা: ৮৬১টি বাস নিয়ে সাত কোম্পানির যাত্রা ও শ্রমিকদের মাসিক বেতন নিশ্চিতকরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১০ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬

রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের নৈরাজ্যপূর্ণ গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং মালিক-শ্রমিকদের দৈনিভিত্তিতে বাস পরিচালনার পুরনো প্রথা চিরতরে বদলে ফেলতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। দৈনিক চুক্তিভিত্তিক বাস চালানোর অবসান ঘটিয়ে চালক ও সহকারীদের নির্ধারিত মাসিক বেতনে চাকরি নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে রাজধানীতে একযোগে সাতটি নতুন রুটে আধুনিক বাসসেবা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়েছে। বাস রুট রেশনালাইজেশন বা রুট পুনর্বিন্যাস কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে সাতটি পরিবহন কোম্পানির অধীনে মোট আটান্নটি নয়, বরং আটশত একষট্টিটি বাস নিয়ে এই সুদূরপ্রসারী সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। রাজধানী ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউ চত্বরে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই নতুন বাসসেবার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ বা ডিটিসিএর সুনির্দিষ্ট তালিকা এবং কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, পরীক্ষামূলক নয় বরং একেবারে চূড়ান্ত ও স্থায়ী সিদ্ধান্ত হিসেবে এই সাতটি রুটের প্রায় দুইশ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় বাসগুলো চলাচল করবে। নতুন এই কাঠামোর অধীনে শিববাড়ী থেকে আজিমপুর রুটে ভিআইপি সিটি পরিবহনের দুইশ তিপ্পান্নটি বাস, টঙ্গী থেকে আজিমপুর রুটে ঢাকা চাকা সিটি পরিবহনের বিশটি বাস এবং মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে চুনকুটিয়া রুটে চিড়িয়াখানা সিটি পরিবহনের একশত তেত্রিশটি বাস পরিচালনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঘাটারচর থেকে ডেমরা রুটে রমজান আলী সিটি পরিবহনের আশিটি, ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর রুটে থ্রি স্টার সিটি পরিবহনের একশত বিশটি, ঘাটারচর থেকে ধউর রুটে পিপিবি সিটি পরিবহনের দুইশ পঁচিশটি এবং মিরপুর এক থেকে কাকলী সার্কুলার রুটে ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসের ত্রিশটি বাস নিয়মিত চলাচল করবে।

যদিও এই আধুনিক বাসসেবা কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে গেছে, তবুও প্রাথমিক ও শুরুর পর্যায়ে যাত্রীদের পুরোনো ও প্রচলিত বাস দিয়েই আপাতত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে এবং পর্যায়ক্রমে এই পুরোনো ও লক্কড়ঝক্কড় বাসগুলোর পরিবর্তে সম্পূর্ণ নতুন এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত বাস বহরে যুক্ত করা হবে। রুট রেশনালাইজেশন নিয়মের আওতায় চলাচলকারী প্রতিটি বাস সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও যান্ত্রিকভাবে সচল রাখতে হবে। বাসের সামনে ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট রুট নম্বর, চূড়ান্ত গন্তব্য এবং গাড়ির সিরিয়াল নম্বর স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

যাত্রীসেবার মান উন্নত করার স্বার্থে নতুন নিয়মে চালক এবং পরিবহন শ্রমিকদের জন্য পরিচ্ছন্ন ও নির্দিষ্ট পোশাক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যাত্রীদের সঙ্গে মার্জিত ও ভালো আচরণ প্রদর্শনের পাশাপাশি কোনোভাবেই নির্ধারিত বা অনুমোদিত স্টপেজের বাইরে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানো যাবে না। এছাড়া সড়কে অতিরিক্ত সময় ধরে দাঁড়িয়ে থেকে জট সৃষ্টি করা, কোনো প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়া কিংবা নিয়মবহির্ভূত ওভারটেকিং করার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। অতীতে প্রভাবশালী মহল ও বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের বাধার কারণে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার এই মহৎ উদ্যোগ বারবার বিলম্বিত হলেও বর্তমান প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণেই অবশেষে তা বাস্তবে রূপ লাভ করেছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে এই সাতটি রুটে বাস চলাচলের সূচনা কেবল একটি প্রতীকী উদ্বোধন নয়, বরং এটি সমগ্র ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে একটি শৃঙ্খলিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার দীর্ঘ যাত্রার প্রথম বড় পদক্ষেপ। আগামী দিনগুলোতে পর্যায়ক্রমে রাজধানীর মোট বত্রিশটি রুটে এই রুট রেশনালাইজেশন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে এবং প্রতিটি রুটের বাসগুলোকে আলাদা ও নির্দিষ্ট রঙে চিহ্নিত করে সম্পূর্ণ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে। অতীতে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ নামে অনুরূপ একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও অবকাঠামোগত ও নানাবিধ সংকটের কারণে তা টেকসই হতে পারেনি। কিন্তু এবারের এই নতুন উদ্যোগটি কোনো পরীক্ষামূলক প্রজেক্ট নয়, বরং এটি অত্যন্ত কঠোরভাবে ও স্থায়ীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তকর্তারা।

নতুন এই ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় এবং যুগান্তকারী দিক হলো পরিবহন শ্রমিকদের বেতন কাঠামো। এতদিন পর্যন্ত প্রচলিত নিয়মে চালক ও অন্যান্য শ্রমিকরা সম্পূর্ণ দৈনিক চুক্তিতে বাস পরিচালনা করতেন, যেখানে প্রতিদিন গাড়ি নামানোর আগে মালিককে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জমা দিতে হতো এবং বাকি আয় দিয়ে নিজেদের সংসার চালাতে হতো। এই দৈনিক জমার টাকার চাপ সামাল দিতে গিয়ে চালকরা সবসময় গাড়ি ছোটার ও বেশি ট্রিপ মারার তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতেন, যা সড়কে মারাত্মক দুর্ঘটনা এবং অরাজকতার মূল কারণ ছিল। এখন থেকে নতুন নিয়মে চালক ও শ্রমিকদের কোনো দৈনিক জমা দিতে হবে না, বরং তাঁদের সরাসরি নির্ধারিত মাসিক বেতনে নিয়োগ দেওয়া হবে, যা চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা দূর করতে জাদুকরি ভূমিকা রাখবে।

পুলিশ প্রশাসন ও ট্রাফিক বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে চালকদের মাসিক বেতনে নিয়ে আসার ফলে সড়কে ওভারটেকিং ও যাত্রী তোলার অসুস্থ প্রতিযোগিতা চিরতরে বন্ধ হবে। আগামী দুই মাসের মধ্যেই আরও অন্তত চারটি নতুন রুটে এই আধুনিক ব্যবস্থা চালুর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে সরকারের নীতিনির্ধারণী ও আর্থিক সহযোগিতা পেলে মালিকপক্ষ দ্রুত নতুন বাস সংগ্রহের জন্য ডাউন পেমেন্ট ও সমিতির গ্যারান্টি দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। পুরোনো বাসগুলোকে এক এক করে সরিয়ে নিয়ে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন বাস নামানোর প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে ত্বরান্বিত করা হয়েছে।

পরিবহন খাতের এই আমূল পরিবর্তনের ফলে সাধারণ যাত্রীরাও ব্যাপক স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। অতীতে বাসের ভেতরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, সিটে বস নিয়ে চালকদের হেল্পারদের সঙ্গে যাত্রীদের বাকবিতণ্ডা এবং নির্ধারিত স্টপেজে গাড়ি না থামানোর মতো নৈমিত্তিক ভোগান্তি থেকে মানুষ মুক্তি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড এবং নির্দিষ্ট স্টপেজের তালিকা থাকায় যাত্রীরা সহজেই তাদের গন্তব্য সম্পর্কে অবগত হতে পারবেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেট ও নানা অনিয়মের কারণে জিম্মি হয়ে থাকা ঢাকার গণপরিবহন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে এই সমন্বিত কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা পদ্ধতি এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। তবে এই ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই চলবে না, বরং মাঠপর্যায়ে তার কঠোর তদারকি ও নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।

সব মিলিয়ে আটশত একষট্টিটি বাস এবং সাতটি বড় কোম্পানির হাত ধরে ঢাকার রাজপথে যে নতুন গণপরিবহন ব্যবস্থার সূচনা হলো, তা দেশের পুরো পরিবহন খাতের জন্য একটি অনুকরণীয় মাইলফলক হয়ে থাকবে। সরকার, মালিক সমিতি, শ্রমিক এবং সাধারণ যাত্রীদের সম্মিলিত সহযোগিতার মাধ্যমেই কেবল এই শৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

আগামী দিনে নগরবাসীর যাতায়াত আরও বেশি নিরাপদ ও আরামদায়ক করতে সরকারের এই বহুমুখী পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হোক—এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...