শিরোনামঃ
এসআরবির মহাপরিচালকসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন ৭ কর্মকর্তাকে বদলি সরকার বিরোধী দল দমনে তৎপর, ফ্যাসিস্ট দমনে নমনীয়: নাহিদ জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এবার আলাদা কমিটি গঠনের চিন্তা ১১ দলীয় ঐক্যের সরকারের অদক্ষতার দায় বিরোধী দলের ওপর চাপানো হচ্ছে: জামায়াত আমির ‘রাইট ট্র্যাকে’ রূপপুর প্রকল্প, দ্রুতই মিলবে বিদ্যুৎ: প্রযুক্তিমন্ত্রী ধর্মের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির চট্টগ্রাম কাস্টমসে চার মাসে ২৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় দ্বিতীয় পদ্মা ও যমুনা সেতু এবং পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর খুলনায় শুরু হচ্ছে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ সিজন-২, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী ডি-৮ বাণিজ্যের বাধা কাটাতে এফটিএ-পিটিএ বাস্তবায়নের তাগিদ বাংলাদেশের
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৩১ অপরাহ্ন

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে সহজ শর্তের অর্থায়নের তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬

দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সহজ শর্তে অর্থায়ন, অনুদান ও উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, সরকারি ঋণের চাপ না বাড়িয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাতে অর্থায়নের শর্ত সহজ করা এবং বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো প্রয়োজন।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বছরে প্রায় ১৫৪ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। বর্তমানে এ খাতে বছরে বিনিয়োগ হচ্ছে মাত্র ১৯ কোটি ডলার। ফলে বছরে বিনিয়োগ ঘাটতি থাকছে প্রায় ১৩৫ কোটি ডলার।

একই সঙ্গে জ্বালানি খাতের জলবায়ু অর্থায়নের প্রায় ৯০ শতাংশই ঋণ হিসেবে আসছে।

‘বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে ঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনা: সরকারি অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রবাহিত করা’ শীর্ষক গবেষণাটি আজ মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এক জাতীয় সংলাপে প্রকাশ করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

গবেষণায় বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে শুধু বিনিয়োগ বাড়ানো যথেষ্ট নয়, অর্থায়নের শর্তও সহজ করতে হবে। প্রকল্প প্রস্তুতির ব্যয় কমাতে অনুদান, ঋণদানের ঝুঁকি ভাগাভাগি করতে উন্নয়ন ব্যাংকের গ্যারান্টি এবং স্থানীয় মুদ্রায় সাশ্রয়ী ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব। এতে সরকারি ঋণের ওপর নির্ভরতাও কমতে পারে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এম. জাকির হোসাইন খান বলেন, আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাকে বৈশ্বিক সংকটের ঝুঁকিতে ফেলেছে। জ্বালানি সার্বভৌমত্ব অর্জন এবং নিজেদের জ্বালানির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার জরুরি।

তিনি বলেন, ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সাশ্রয়ী অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে সহায়তা দিতে অনুদান, সহজ শর্তের অর্থায়ন ও দায়িত্বশীল বিনিয়োগ প্রয়োজন। এতে সরকারি অর্থের ওপর চাপও কমবে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও অতিরিক্ত ঋণের চাপ কমাতে হবে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে স্বচ্ছতা, সমন্বিত বিনিয়োগ ও জলবায়ু কূটনীতি জোরদার করা প্রয়োজন।

কপ৩১ কমসূচিকে সামনে রেখে গবেষক, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি খাত ও তরুণ উদ্ভাবকদের মতামতের ভিত্তিতে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় অবস্থান তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।

গবেষণায় ২০০২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত জ্বালানি খাতের জলবায়ু অর্থায়নের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি ১ ডলার অনুদানের বিপরীতে বাংলাদেশ প্রায় ৯ ডলার ঋণ পেয়েছে।

স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জ্বালানি খাতে এ অনুপাত গড়ে ১ ডলার অনুদানের বিপরীতে ১ দশমিক ৫৩ ডলার ঋণ। অর্থাৎ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঋণ ও অনুদানের অনুপাত স্বল্পোন্নত দেশগুলোর গড়ের প্রায় ছয় গুণ।

আলাদা বিশ্লেষণে ২০০০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিনিয়োগের ৯০ দশমিক ৪ শতাংশ ঋণ হিসেবে এসেছে। অনুদানের পরিমাণ ছিল মাত্র ৭ শতাংশ। ইকুইটি বা গ্যারান্টির ব্যবহার ছিল খুবই সামান্য।

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা জেসমিন বলেন, জলবায়ু অর্থায়নে ঋণ ও অনুদানের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা দেশের ওপর এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ তৈরি করছে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ ও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অর্থায়ন আরও সাশ্রয়ী করতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু অর্থায়নে পানির নিরাপত্তা ও কৃষকের জীবিকার বিষয়গুলোকে সরাসরি গুরুত্ব দিতে হবে।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. ফজলে রাব্বি সাদেক আহমেদ বলেন, অভিযোজন কার্যক্রম অনেক সময় সরাসরি আয় তৈরি করে না, যদিও তা জনকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কারণে অভিযোজনের জন্য অনুদান ভিত্তিক অর্থায়ন জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও সাশ্রয়ী অর্থায়ন ও উপযুক্ত প্রযুক্তির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু মোকাবিলায় বাংলাদেশের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এমন অর্থায়নব্যবস্থা দরকার, যা দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বাড়াবে, কিন্তু ঋণের অসহনীয় বোঝা তৈরি করবে না।

উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থ ছাড় বাড়ানোর সুপারিশ

গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের জন্য পাঁচটি বড় বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকের বার্ষিক সরকারি অর্থায়নের সম্ভাব্য পরিসর ৬৩০ কোটি ডলার। তবে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে প্রযোজ্য হিসেবে চিহ্নিত অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি ছিল প্রায় ৮২ কোটি ডলার। এটি তিন বছরের সম্ভাব্য অর্থায়নের পরিসরের প্রায় ৪ শতাংশ।

গবেষণায় বলা হয়েছে, অনুমোদিত অর্থ ছাড় করাও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাংকের নথির বরাত দিয়ে এতে উল্লেখ করা হয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে একটি অর্থায়ন সুবিধা অনুমোদনের পাঁচ বছর পরও মাত্র ১২ শতাংশ অর্থ ছাড় হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বার্ষিক বাজেট ছাড়েও চার থেকে পাঁচ মাস বিলম্ব হয়েছে।

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও সৌরসেচের মতো ছোট প্রকল্পে অর্থায়ন সহজ করতে অনুমোদন প্রক্রিয়া ও অর্থায়ন ব্যবস্থা সরল করার সুপারিশ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বিভাগের সাবেক পরিচালক খন্দকার মোরশেদ মিল্লাত বলেন, সবুজ অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অর্থায়ন নিশ্চিত হয় না। তিনি মোট ঋণের অন্তত ১ দশমিক ৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে সামগ্রিক সবুজ অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা ধাপে ধাপে ১৫ থেকে ২০ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলেন।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়, তথ্যের আদান-প্রদান ও অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বাড়াতে হবে। তাহলেই বরাদ্দ করা অর্থ বাস্তব বিনিয়োগে রূপ নিতে পারে।

বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অনুদান, উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তা, দেশীয় সম্পদ ও বেসরকারি বিনিয়োগ একত্র করতে ‘রিনিউয়েবল এনার্জি সভরেইনটি ফ্যাসিলিটি’ (আরইএসএফ) নামে একটি বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) তহবিলটি পরিচালনা করবে এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রকল্পে সহায়তার বিষয়টি তদারক করবে।

প্রকল্প প্রস্তুতির ব্যয় ও সুদের খরচ কমাতে অনুদান দেওয়া হবে। পাশাপাশি গ্যারান্টির মাধ্যমে ঋণদানের ঝুঁকি ভাগাভাগি করে ব্যাংকগুলোকে টাকায় সাশ্রয়ী ঋণ দিতে উৎসাহিত করা হবে।

গবেষণার মডেল ভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ৭৯০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ চাহিদা পূরণে নতুন সার্বভৌম ঋণের প্রয়োজন প্রচলিত অর্থায়ন ব্যবস্থার আনুমানিক ৪৬০ কোটি ডলার থেকে কমিয়ে ৮০ কোটি ডলারে আনা সম্ভব হতে পারে। তবে এটি মডেল ভিত্তিক হিসাব, নিশ্চিত অর্থায়ন বা অর্জিত ফল নয়।

গবেষণায় ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে বিশেষ তহবিলটি গঠন এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে বিদ্যুৎ ও এলএনজি খাতের ভর্তুকির অন্তত ৫ শতাংশ তহবিলের ঋণবহির্ভূত অর্থায়ন অংশে স্থানান্তরের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ভর্তুকির বরাদ্দের হিসাব অনুযায়ী, এতে বছরে প্রায় ১৯ কোটি ডলার পাওয়া যেতে পারে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সরকারের প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন থাকতে হবে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রসার, আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশ সুরক্ষা জোরদার করা এখনকার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।

কপ সম্মেলনে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা তুলে ধরা এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ জাতীয় নীতি ও বাস্তবায়নে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।

গবেষণায় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই সবুজ অর্থায়নের সুযোগ তৈরি, অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং নেট মিটারিং নীতিমালা স্থিতিশীল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন শক্তি ফাউন্ডেশনের উপনির্বাহী পরিচালক ইমরান আহমেদ এবং গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশনস কাউন্সিলের (জিএসসিসি) বাংলাদেশ প্রধান ফারাহ আঞ্জুমসহ অন্যরা।


এ জাতীয় আরো খবর...