শিরোনামঃ
বেসরকারি খাতে ঋণের খরা: কেবল পদক্ষেপে নয়, প্রয়োজন আস্থার সংকট দূরীকরণ ব্যথামুক্ত জীবন ডেপুটি স্পিকারের সঙ্গে চার্চ অব ইংল্যান্ডের ফরেন পলিসি এ্যাডভাইজারের সাক্ষাৎ কোটালীপাড়ার প্রবীণ শামসুল হকের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা, প্রযুক্তিসহ বহুমুখী সহযোগিতা বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্ব আরও সুদৃঢ় হবে: শিক্ষামন্ত্রী বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশ-চীনের আলোচনা অর্থনৈতিক ও অবকাঠামো সহযোগিতায় বাংলাদেশ-চীনের সমঝোতা স্মারক সই মোংলা থেকে উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে : প্রধানমন্ত্রী হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশকে এআই প্রয়োগ ও উদ্ভাবনে সক্ষম একটি দেশে পরিণত করতে হবে : রাষ্ট্রপতি
বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:২৪ অপরাহ্ন

তালিকা না থাকায় দোকানভেদে দামের হেরফের: দোকান বদলালেই কেজিতে বাড়ে ৫০ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৯ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬

দেশের অন্যতম প্রধান ও প্রাচীন ফলের পাইকারি মোকাম পুরান ঢাকার বাদামতলী বাজারে ফল কিনতে এসে চরম বিভ্রান্তি ও অস্বস্তির মুখে পড়ছেন সাধারণ ভোক্তারা। ভোররাত থেকেই এই ঐতিহ্যবাহী বাজারে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দেশি ও বিদেশি বাহারি ফলের পাইকারি বিকিকিনি শুরু হলেও সকালের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে যায়। আড়তগুলোর সামনের চত্বর এবং সদরঘাট সংলগ্ন আশপাশের অলিগলিতে পাইকারি আড়ত থেকে সংগ্রহ করা ফল খুচরা দরে বিক্রি করতে শুরু করেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এই খুচরা ও আধা-পাইকারি বেচাকেনার মধ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান মূল্যতালিকা না থাকায় এক অদ্ভুত দামের তারতম্য চোখে পড়ছে। ক্রেতাদের অভিযোগ, মাত্র কয়েক কদম হেঁটে এক দোকান থেকে পাশের দোকানে গেলেই একই মানের ফলের কেজিতে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা পর্যন্ত দামের তারতম্য ঘটে যাচ্ছে।

সরেজমিনে বাদামতলী ও বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী ফলপট্টি ঘুরে দেখা গেছে, শত শত ফলের ডালিতে কমলা, মাল্টা, আপেল, আঙুর, ডালিমসহ হরেক পদের আমদানি করা ও দেশীয় ফল থরে থরে সাজানো রয়েছে। সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা মেটাতে কিংবা পরিবারের সদস্যদের জন্য ফল কিনতে ছুটে আসছেন এই বিশাল মোকামে। তবে বাজারে প্রবেশ করার পরই ক্রেতাদের পড়তে হচ্ছে চরম দরদামের পরীক্ষার মুখে। কারণ, বাজারের শতকরা নব্বই ভাগ দোকানেই নির্ধারিত বা প্রদর্শিত কোনো মূল্যতালিকা ঝুলিয়ে রাখা হয়নি। ফলে কোন ফলের প্রকৃত বাজারমূল্য কত এবং পাইকারি দরের তুলনায় খুচরা বিক্রেতা কত টাকা অতিরিক্ত মুনাফা দাবি করছেন, তা বোঝার কোনো সুস্পষ্ট উপায় সাধারণ ক্রেতার সামনে থাকছে না।

ফল কিনতে আসা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এহসানুল হক জানান তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা। তিনি মাল্টা, আঙুর ও কমলার মতো কিছু নিয়মিত ফল কিনতে এসে কয়েকটি দোকানে গিয়ে দরদাম জানতে চান। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, একটি দোকানে বিক্রেতা যে দর হাঁকছেন, ঠিক তার পাশের দোকানে একই ফলের দাম চাওয়া হচ্ছে ভিন্ন। কোনো দোকানে হয়তো কেজিতে বিশ টাকা কম বলা হচ্ছে, আবার অন্য দোকানে গিয়ে দেখা যাচ্ছে ত্রিশ টাকা বেশি। আইনজীবী এহসানুল হক বলেন যে বাজারে কোনো ধরনের উন্মুক্ত মূল্যতালিকা না থাকার কারণে সাধারণ ভোক্তারা সম্পূর্ণভাবে বিক্রেতাদের মর্জির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। কোন দোকানে কত দরে পণ্য ছাড়া হচ্ছে তা জানতে প্রতিটি দোকানে আলাদাভাবে সময় নষ্ট করে ঘুরতে হচ্ছে, যা ক্রেতাদের জন্য অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর ও কষ্টদায়ক।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে বাজারে যদি যথাযথভাবে দৃশ্যমান মূল্যতালিকা প্রদর্শন করার বাধ্যবাধকতা থাকত, তবে ক্রেতারা খুব সহজেই একাধিক দোকানের মান ও দাম তুলনা করে স্বচ্ছন্দে কেনাকাটা করতে পারতেন। বিশেষ করে পাইকারি বাজারের প্রকৃত দর এবং সেখান থেকে খুচরা বাজারে বিক্রির ক্ষেত্রে মুনাফার যৌক্তিক ব্যবধান কত হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছে কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। ফলে অনেক সময় না বুঝে কিংবা দরদাম করার ঝামেলা এড়াতে গিয়ে সাধারণ ক্রেতারা অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে প্রতারিত হচ্ছেন। বাদামতলীতে ফল কিনতে আসা প্রায় প্রতিটি সচেতন ক্রেতার মুখেই এখন একই ধরনের অসন্তোষ ও অভিযোগের সুর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

বর্তমানে বাদামতলীর আশপাশের খুচরা বাজারে বিভিন্ন ফলের দরদাম পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে বেশ চড়া মূল্যেই বিক্রি হচ্ছে আমদানিকৃত ফলমূল। খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি মাল্টা বিক্রি হচ্ছে তিন শ থেকে তিন শ বিশ টাকা দরে। ভালো মানের বিদেশি আঙুরের কেজি হাঁকা হচ্ছে তিন শ বিশ টাকা থেকে শুরু করে চার শ বিশ টাকা পর্যন্ত। কমলার ক্ষেত্রেও কেজিপ্রতি গুনতে হচ্ছে তিন শ থেকে তিন শ বিশ টাকা। দেশি ফলের মধ্যে পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি আশি থেকে এক শ টাকায়, পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ড্রাগন ফল এক শ বিশ থেকে এক শ পঞ্চাশ টাকা এবং সুস্বাদু কাটিমন আম প্রতি কেজি তিন শ থেকে তিন শ বিশ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে। এছাড়া রক্তবর্ণ ডালিমের দাম ঠেকেছে প্রতি কেজি চার শ টাকার ঘরে এবং আকারভেদে প্রতিটি নারকেলের মূল্য রাখা হচ্ছে নব্বই থেকে এক শ বিশ টাকা।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে পাইকারি আড়তগুলোতে এসব ফলের দর খুচরা দামের চেয়ে কেজিপ্রতি অন্তত চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা কম থাকে। তবে সব ফলের ক্ষেত্রে পাইকারি ও খুচরার এই ব্যবধান সমান থাকে না। ফলের সতেজতা, আকার, গ্রেড এবং আমদানির চালানের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে পাইকারি দর প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, আড়ত থেকে পণ্য কিনে দোকানে আনা পর্যন্ত পরিবহন খরচ, কুলি খরচ, পচে যাওয়া বা নষ্ট হওয়া ফলের আর্থিক ক্ষতি এবং দোকান ভাড়ার মতো আনুষঙ্গিক ব্যয় যুক্ত হওয়ার ফলেই খুচরা পর্যায়ে দাম কিছুটা বেড়ে যায়। তবে সাধারণ ভোক্তাদের প্রশ্ন হলো, একই বাজারের এক গলির ভেতরের দুই দোকানে এই পরিবহন খরচ ও পরিচালন ব্যয়ের পার্থক্য কীভাবে এত আকাশ-পাতাল হতে পারে।

আমদানি করা ও দেশি মৌসুমি ফলের পাশাপাশি বাদামতলীর আড়তগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জাতের পুষ্টিকর খেজুরের বিশাল মজুত ও বেচাকেনা লক্ষ্য করা গেছে। বাজারে বর্তমানে সুক্কারি জাতের তিন কেজির প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে এক হাজার নয় শ পঞ্চাশ টাকায়। মাঝারি মানের জনপ্রিয় কালমি খেজুরের পাঁচ কেজির প্যাকেটের দাম হাঁকা হচ্ছে তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। এছাড়া সুগাই জাতের পাঁচ কেজির প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার এক শ টাকা দরে। খেজুরের পাইকারি আড়ত তাওয়াক্কুল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মাহমুদুল হাসান জানান যে মূলত এই তিনটি নির্দিষ্ট জাতের খেজুরের চাহিদাই সারা বছর বাজারে সবচেয়ে বেশি থাকে।

ব্যবসায়ী মাহমুদুল হাসান আরও জানান যে আমদানিকারকরা মূলত পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখেই বছরের শুরুতে একযোগে বিপুল পরিমাণ খেজুর বিভিন্ন দেশ থেকে জাহাজে করে আমদানি করে থাকেন। পরবর্তীতে সেই খেজুরগুলো নিজস্ব হিমাগার ও আধুনিক গুদামে সংরক্ষণ করে সারা বছর পাইকারি মোকামে ধাপে ধাপে সরবরাহ করা হয়। তিনি জানান যে আড়ত পর্যায়ে তারা অত্যন্ত সীমিত লাভে পাইকারি দরে বিক্রি করলেও খুচরা বাজারে গিয়ে এই খেজুরের দাম কেজিপ্রতি আরও এক শ থেকে দুই শ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। উল্লেখ্য, পুরো বাজারে মূল্যতালিকা না থাকার সাধারণ অভিযোগ থাকলেও ব্যতিক্রম হিসেবে তাওয়াক্কুল এন্টারপ্রাইজের সামনে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা মূল্যতালিকা ঝুলিয়ে রাখতে দেখা গেছে।

ফলের দাম নির্ধারণের নেপথ্যে একাধিক জটিল অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক কারণ কাজ করে বলে দাবি করছেন আড়তদাররা। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানির এলসি খরচ, ডলারের বিনিময় হার, জাহাজের ভাড়া এবং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রাজধানীতে আনার পরিবহন ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে ফলের আমদানি মূল্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয় হিমাগারের সংরক্ষণ ফি ও বাজারে পণ্যের দৈনিক জোগানের ভারসাম্য। তবে বাজারে যখন কৃত্রিমভাবে তথ্য গোপন রাখা হয় এবং মূল্যতালিকা প্রদর্শন করা হয় না, তখন মধ্যস্বত্বভোগী ও একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়।

বাদামতলী ফল ব্যবসায়ী সমিতির কার্যনির্বাহী সদস্য রিফাত হাসান এ প্রসঙ্গে জানান যে সাধারণ সময়ে নিয়মিত মূল্যতালিকা প্রদর্শন করার ক্ষেত্রে অনেক ব্যবসায়ীর মধ্যেই এক ধরনের গাফিলতি বা অনীহা কাজ করে। তিনি স্বীকার করেন যে দোকানের সামনে বড় করে পণ্যের নাম ও দাম লিখে রাখলে সাধারণ ক্রেতারা নিশ্চিতভাবেই বহুলাংশে উপকৃত হন। তবে অনেক দোকানদারের অসচেতনতা এবং স্থানসংকুলানের অভাবসহ নানা ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতার কারণে এটি সব সময় কঠোরভাবে পরিপালন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন যে পবিত্র রমজান মাসে যখন সরকারিভাবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়, তখন সমিতির পক্ষ থেকে সবাইকে কড়াকড়িভাবে মূল্যতালিকা ঝুলিয়ে রাখতে বাধ্য করা হয়।

ফলের ভবিষ্যৎ বাজারদর নিয়ে ব্যবসায়ী সমিতির এই নেতা ইতিবাচক পূর্বাভাস দিয়ে জানান যে সামনে শীত মৌসুম পুরোদমে শুরু হতে যাচ্ছে। শীতের এই সময়ে দেশে নানা জাতের দেশি ফল যেমন কুল, পেয়ারা, কমলা ও লেবুজাতীয় পণ্যের সরবরাহ প্রাকৃতিকভাবে বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে বন্দর দিয়ে শীতকালীন ফলের আমদানির চালানও বাড়তে শুরু করেছে। ফলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিভিন্ন ফলের দাম ধীরে ধীরে কমে আসবে এবং সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বাজার সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ বিশ্লেষকরা মনে করেন যে একটি প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রতিটি দোকানে দৃশ্যমান মূল্যতালিকা টানিয়ে রাখা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। মূল্যতালিকা থাকলে ক্রেতারা প্রতারিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পান, অহেতুক দরদামের কালক্ষেপণ কমে যায় এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যেও একটি সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব গড়ে ওঠে। রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী বাদামতলীর মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মোকামে এই ধরনের অদৃশ্য দামের নৈরাজ্য বন্ধ করতে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

তথ্যসূত্র: জাগো নিউজ


এ জাতীয় আরো খবর...