শিরোনামঃ
বেসরকারি খাতে ঋণের খরা: কেবল পদক্ষেপে নয়, প্রয়োজন আস্থার সংকট দূরীকরণ ব্যথামুক্ত জীবন ডেপুটি স্পিকারের সঙ্গে চার্চ অব ইংল্যান্ডের ফরেন পলিসি এ্যাডভাইজারের সাক্ষাৎ কোটালীপাড়ার প্রবীণ শামসুল হকের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা, প্রযুক্তিসহ বহুমুখী সহযোগিতা বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্ব আরও সুদৃঢ় হবে: শিক্ষামন্ত্রী বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশ-চীনের আলোচনা অর্থনৈতিক ও অবকাঠামো সহযোগিতায় বাংলাদেশ-চীনের সমঝোতা স্মারক সই মোংলা থেকে উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে : প্রধানমন্ত্রী হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশকে এআই প্রয়োগ ও উদ্ভাবনে সক্ষম একটি দেশে পরিণত করতে হবে : রাষ্ট্রপতি
বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:২৪ অপরাহ্ন

বেসরকারি খাতে ঋণের খরা: কেবল পদক্ষেপে নয়, প্রয়োজন আস্থার সংকট দূরীকরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬

দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধারাবাহিক পতন সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য এক গভীর অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত কয়েক বছর ধরে এই খাতে তীব্র শ্লথগতি বিরাজ করলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তা রীতিমতো তলানিতে এসে ঠেকেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি যেখানে ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে তা আরও নেমে ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০০৩ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নিয়মিত তথ্য সংরক্ষণ শুরুর পর থেকে এটিই দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির রেকর্ড। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সাধারণ সংখ্যা নয়, বরং এটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী দেশের অর্থনৈতিক মন্দা কাটেনি, বরং তা ক্রমশ আরও গভীর হচ্ছে।

একটি উন্নয়নশীল দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন শিল্পায়ন এবং টেকসই উদ্যোক্তা তৈরির প্রধান ইঞ্জিন হলো বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ। কিন্তু ঋণপ্রবাহের এই তীব্র ঐতিহাসিক সংকোচন প্রমাণ করে যে বাজারে উৎপাদন কর্মকাণ্ড ও নতুন মূলধনী বিনিয়োগ পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার পর ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরার প্রত্যাশা করা হলেও বাস্তবে শিল্প খাতে কোনো নতুন উদ্যম সঞ্চারিত হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী ডিসেম্বর নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করলেও বর্তমান ঋণ খরার বাস্তবতায় তা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি এই ঋণ সংকোচনের অনিবার্য ও নির্মম পরিণতি হিসেবে সামনে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি থমকে যাবে এবং দেশের সামগ্রিক বেকারত্ব পরিস্থিতিকে আরও উসকে দেবে।

উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগে অনাগ্রহের পেছনে বিদ্যমান তীব্র জ্বালানি সংকট এবং মাত্রাতিরিক্ত সুদের হার বড় ভূমিকা রাখলেও অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাই এর মূল দায় বহন করছে। দেশের ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর অবস্থা এখন সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই খেলাপি ঋণের খাতায় চলে গেছে এবং প্রায় ৬০ শতাংশ ঋণ এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে পরিণত হয়েছে। দুর্বল ব্যালান্স শিট নিয়ে বিপুল সংখ্যক ব্যাংকেরই এখন নতুন করে ঋণ দেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই। অন্যদিকে লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নীতিগতভাবে সুদের হার কমানো যাচ্ছে না, যার সরাসরি চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ওপর।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঝুঁকি এড়াতে উৎপাদনশীল বাণিজ্যিক খাতে ঋণ না দিয়ে সরকারি ট্রেজারি বিল ও সিকিউরিটিজে অর্থ বিনিয়োগে বেশি উৎসাহ দেখাচ্ছে। ব্যাংকের মূল অর্থনৈতিক দায়িত্ব যেখানে জনসাধারণের সঞ্চয়কে শিল্প ও বাণিজ্যিক উৎপাদনে প্রবাহিত করা, সেখানে তারা সরকারি বন্ডে নিরাপদ ও নিশ্চিত মুনাফার পথ বেছে নিচ্ছে। এর সঙ্গে সরকারের মাত্রাতিরিক্ত মাত্রায় ব্যাংকনির্ভর ঋণ গ্রহণ এই সংকটকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে তুলেছে। ফলস্বরূপ তৈরি হয়েছে একটি ক্লাসিক ‘ক্রাউডিং-আউট’ পরিস্থিতি, যেখানে বেসরকারি উদ্যোক্তারা অর্থের অভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন এবং চড়া সুদের কবলে পড়ে ঋণ গ্রহণ থেকে বাধ্য হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগত সুদে কিছুটা ছাড় দেওয়া এবং সংকটগ্রস্ত ব্যবসা ও বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবিত করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও তা মাঠপর্যায়ে কোনো দৃশ্যমান সুফল ফেলতে পারছে না। এর অর্থ হলো, কেবল প্রথাগত তহবিল বরাদ্দ বা কাগজ-কলমের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে বেসরকারি খাতের এই দীর্ঘমেয়াদি রক্তক্ষরণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। নীতিনির্ধারক মহলের বোঝা উচিত যে সমস্যাটি এখন কেবল আর্থিক তারল্যের নয়, বরং তা সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশ ও আস্থার সংকট।

অতএব, বর্তমান নীতি ও পদক্ষেপগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে অবিলম্বে একটি নির্মোহ, বস্তুনিষ্ঠ ও গভীর পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। কলকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতের ক্ষত নিরাময়ে দৃশ্যমান আইনি সংস্কার চালানো এবং উৎপাদনশীল খাতের জন্য স্বল্প সুদে ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ছাড়া এই অচলাবস্থা কাটবে না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখা এবং কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে বেসরকারি খাতের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।


এ জাতীয় আরো খবর...