শিরোনামঃ
বাণিজ্যিক কার্যক্রমে স্থবিরতা: বন্দর ও কাস্টমসে আমদানিতে বড় ধস ১১ দলীয় জোটে ক্ষমতার টানাপোড়েন: জামায়াতকে চাপে রেখে নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি বাড়াতে চাইছে নাগরিক পার্টি ছায়াযুদ্ধে অশান্ত পাবর্ত্য চট্টগ্রাম: পাহাড়ে ৩ গোষ্ঠীর অস্ত্রের শাসন তিন দিনে পোশাক খাতে ক্ষতি ১৫০০ কোটি টাকা ১০ দলে পরিবার, ৩২ দলে গণতন্ত্র নেই: টিআইবির ময়নাতদন্ত মিয়ানমারে মামলা প্রত্যাহার: ইন্টারপোলের রেড নোটিশ থেকে মুক্তি পেলেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা মুনিমুল মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি: ওয়াশিংটন কি এবার ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সমাপ্তির পথ খুঁজবে? এলপিজি বাজারের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি: কেবল দাম বৃদ্ধি নয়, প্রয়োজন কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন নিরোগ ঘাড়: ব্যথামুক্ত জীবন বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন – ৮
বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:০৪ অপরাহ্ন

এলপিজি বাজারের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি: কেবল দাম বৃদ্ধি নয়, প্রয়োজন কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২ বার
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

দেশের রান্নার জ্বালানির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির দাম যেভাবে লাগাতারভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে, তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম দুর্বিষহ করে তুলেছে। গত সাত মাসের ব্যবধানে চার দফায় এবং চলতি মাসের মধ্যেই দুবার বড় ধরনের ব্যবধানে এলপিজির দাম বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি সম্প্রতি ১২ কেজি ওজনের একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক ধাক্কায় বহু টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে বর্তমানে প্রতিটি সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য দুই হাজার টাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। কাগজে-কলমে দাম বাড়ানোর এই সরকারি ঘোষণা সত্ত্বেও বাস্তব চিত্র আরও বেশি ভয়াবহ, কারণ খুচরা বাজারে এই সিলিন্ডারের দাম আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।

নিত্যপণ্যের লাগাতার উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যখন আগে থেকেই মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এলপিজির এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলোর ওপর এক প্রকার মড়ার উপর খাড়ার ঘা হয়ে এসেছে। শহরাঞ্চলের অগণিত পরিবার যারা রান্নার জন্য পাইপলাইনের গ্যাসের পরিবর্তে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল, তারা এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ব্যয় সংকোচনের পথ বেছে নিলেও অনেকে আবার কাঠ বা কয়লার মতো বিকল্প জ্বালানির দিকে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এর পাশাপাশি হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরাও এই চড়া দামের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়েছেন, যার ফলে রেস্তোরাঁর খাবারের দামও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাকেই এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা টানতে হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এলপিজি বিপণনকারী ও ডিলারদের বিভিন্ন অযৌক্তিক দাবির মুখে কর্তৃপক্ষের নমনীয় মনোভাব এবং দ্রুত দাম বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা। অতীতে দেখা গেছে যে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর দাবি তোলার সঙ্গে সঙ্গেই নীতিনির্ধারকরা তাতে সম্মতি দিয়ে দিচ্ছেন। তবে এর মানে এই নয় যে ব্যবসায়ীদের কোনো বাস্তব সমস্যা নেই। উদাহরণস্বরূপ, বাজারে হাজার হাজার অব্যবহৃত সিলিন্ডারের অলস পড়ে থাকা এবং কোম্পানিগুলোর একে অপরের সিলিন্ডার রিফিল করতে অনীহা প্রকাশ করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। বর্তমানে একেকটি কোম্পানির অপারেটররা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের খালি সিলিন্ডার রিফিল করতে চায় না, যার ফলে বাজারে এক কৃত্রিম সরবরাহ সংকট তৈরি হয় এবং সাধারণ গ্রাহককে বাধ্য হয়ে নতুন সিলিন্ডার কিনতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়।

এলপিজি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কৃত্রিম সংকট তৈরি ও মজুতদারির সুনির্দিষ্ট অভিযোগও কম নয়। গত অক্টোবর মাসেই সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী স্বীকার করেছিলেন যে দাম বাড়ার প্রত্যাশায় কিছু অসাধু আমদানিকারক ও অপারেটর এলপিজি গোপনে মজুত বা হোডিং করছে। অথচ সরকারি আমদানি তথ্যে দেখা গেছে যে দেশে এলপিজির আমদানি নিয়মিত ও স্বাভাবিক রয়েছে। এই স্পষ্ট বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে বাজারে একশ্রেণির সিন্ডিকেট কারসাজি চালিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। তাই কেবল ব্যবসায়ীদের চাপে বারবার সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়ে সাধারণ ভোক্তার কাঁধে পুরো আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কোনো সুস্থ প্রশাসনের কাজ হতে পারে না। সরকারের উচিত অবিলম্বে এই কৃত্রিম সংকট এবং মজুতদারির হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

এই বহুমুখী সংকট নিরসনে সরকারের সামনে এখন সুনির্দিষ্ট কিছু করণীয় রয়েছে। বাজারকে ব্যবসায়ীদের ইচ্ছের ওপর ছেড়ে না দিয়ে শক্তিশালী মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ওপর থেকে চাপ কমাতে শিল্প খাতে বিকল্প জ্বালানির সন্ধান এবং সবচেয়ে vulnerable বা বিপন্ন পরিবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য প্রয়োজনে সুনির্দিষ্ট ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে হবে। যতদিন পর্যন্ত এলপিজি বাজারের স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়ায়ী কোনো সমাধান না মিলছে, ততদিন কেবল দাম বাড়ানোর নীতি থেকে সরে এসে বাজার ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই হতে হবে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।


এ জাতীয় আরো খবর...