শিরোনামঃ
লাইসেন্সপ্রাপ্ত মানি চেঞ্জারদের বৈদেশিক মুদ্রা জমায় নতুন সুবিধা রফতানি ও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক ধারা, রিজার্ভ ৩৬.২৫ বিলিয়ন ডলার সিটি গ্রুপকে ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ দিতে আইন শিথিল করল বাংলাদেশ ব্যাংক সিঙ্গাপুরে প্রশিক্ষণে যাচ্ছেন সচিব, অতিরিক্ত সচিবসহ ৩৫ সরকারি কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে চীনা মন্ত্রীর সাক্ষাৎ, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদারের আহ্বান ঋণ সহায়তার বাইরে কোরিয়ার সঙ্গে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব চায় বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর সৌরবিদ্যুৎ পরিকল্পনা ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্পপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে : মাহদী আমিন আর্টিলারি রেজিমেন্টের অধিনায়ক সম্মেলন ও পুনর্মিলনীতে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা আরও গভীর করতে চীনের অঙ্গীকার: লিউ মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে কাজ করবে সংসদীয় ককাস
বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৩ অপরাহ্ন

তিন দিনে পোশাক খাতে ক্ষতি ১৫০০ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২ বার
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক শিল্পখাতে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ, সড়ক অবরোধ এবং কারখানায় ভাঙচুরের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় সামগ্রিক অর্থনীতিতে চরম উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ত্রিশ হাজার টাকা করার দাবিতে ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও দফায় দফায় সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করছেন। এই ধারাবাহিক অস্থিরতার জেরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে চলেছে, যা দেশের পোশাক খাতকে এক মারাত্মক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্ববাজারের তীব্র প্রতিযোগিতার এই সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ এমন অস্থিরতা সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।

গত ১ নভেম্বর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত এই মাত্র তিন দিনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে পোশাক খাতে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে আনুমানিক প্রায় পনেরো শ উনপঞ্চাশ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি বা বিজিএমইএর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই তিন দিনে গড়ে প্রতিদিন প্রায় চার শ একষট্টিটি কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ, যার ফলে কেবল রপ্তানি মূল্য বাবদ আনুমানিক আটান্ন কোটি টাকার ওপরে ক্ষতি হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি বা বিকেএমইএর হিসাব অনুযায়ী, একই সময়ে কেবল নিট পোশাক খাতেই প্রায় সাত শ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে।

তৈরি পোশাক শিল্পের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও ব্যবসায়িক সংগঠনের প্রতিনিধিরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে এই ধরনের সহিংস আন্দোলন কেবল তাৎক্ষণিক উৎপাদনকেই ব্যাহত করছে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সুনাম ও ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে সরকার ইতিমধ্যে শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবির প্রেক্ষিতে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে দিয়েছে, ফলে এ ধরনের আন্দোলনের আর কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। সাধারণ শ্রমিকরা এই নৈরাজ্যের সঙ্গে জড়িত নন বরং একটি কুচক্রী মহল ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করে তিনি সতর্ক করেছেন যে শিল্প না বাঁচলে শ্রমিকদের রুটি-রুজিও বিপন্ন হবে।

এদিকে মঙ্গলবারের বিক্ষোভে পরিস্থিতি আরও বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন রাজধানীসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের রাজপথে শ্রমিকদের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও অবস্থান নেন। মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জে বিক্ষোভকারী শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত ত্রিশ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। মিরপুর দশ ও এগারো নম্বর এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে দীর্ঘ সময় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে এবং মেট্রো রেলের চলাচলও কিছু সময় ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বাধ্য হয়ে সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার শেল ও লাঠিচার্জ ব্যবহার করে। গাজীপুরের নাওজোর, ভোগড়া বাইপাস, মৌচাক ও কোনাবাড়ী এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করা হয়।

পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে কিছু দুষ্কৃতকারী ও বহিরাগত উসকানিদাতা প্রবেশ করে ইচ্ছাকৃতভাবে এই ধরনের ধ্বংসাত্মক ও নাশকতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে। শ্রমিক নেতাদের পূর্বের ঘোষণা অনুযায়ী প্রকৃত কর্মীরা আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ালেও একদল স্বার্থান্বেষী মহল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জানমাল রক্ষার্থে পুলিশ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে আটক করেছে এবং সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনায় একাধিক নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান উল্লেখ করেছেন যে এই ধরনের শ্রমিক আন্দোলনের ফলে আর্থিক ক্ষতির চেয়েও আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তির ক্ষতি অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী হয়। বিদেশি ক্রেতারা সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণের নিশ্চয়তা না পেয়ে এবং কারখানার উৎপাদন ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে ইতোমধ্যে অন্য দেশগুলোতে ক্রয়াদেশ বা অর্ডার স্থানান্তরের কথা ভাবতে শুরু করেছেন। ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো এই সুযোগে আন্তর্জাতিক বাজারের নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে তুলছে।

সরকার ও বিভিন্ন দায়িত্বশীল মহলের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা থামানো যাচ্ছে না।

সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য বিভিন্ন বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে আশা প্রকাশ করেছেন যে খুব দ্রুতই বন্ধ থাকা কারখানাগুলো পুনরায় চালু হবে এবং সরকার যেহেতু শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, তাই শ্রমিকদের শান্ত থাকা উচিত। অন্যদিকে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাসলিমা আখতার মনে করেন যে শ্রমিকরা তাদের রুটি-রুজির জায়গাতেই আগুন দিতে পারে না এবং বর্তমান আন্দোলনের নেপথ্যে অন্য কোনো মহলের ইন্ধন থাকতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারের ক্রেতাদের আস্থা বজায় রাখার জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিযোগিতার বাজারে একবার কোনো ক্রেতা অন্য দেশে চলে গেলে তাদের আবার ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে কেবল পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব নয়, বরং মালিক এবং শ্রমিক উভয় পক্ষের মাঝে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে হবে এবং যেকোনো ধরনের গুজব ও উসকানির বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

গার্মেন্টস খাতের প্রতিটি একক দিন উৎপাদন বন্ধ থাকার অর্থ হলো কাঁচামাল থেকে শুরু করে ব্যাংক ঋণ এবং ক্রেতার নির্ধারিত সময়সীমার পুরো শৃঙ্খলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়া।

অতীতেও বিভিন্ন সময় মজুরি বৃদ্ধি বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাকে কেন্দ্র করে শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটলেও বর্তমান ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ধরনের সহিংসতা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়।

দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত করতে হলে একটি স্থিতিশীল শিল্প পরিবেশ বজায় রাখার বিকল্প নেই।

রাষ্ট্রের সকল স্তরের নীতিনির্ধারক ও অংশীজনদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কেবল এই সংকটের স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হবে।

শিল্প কারখানার স্বাভাবিক নিরাপত্তা বিধান এবং শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা ও অধিকার সুনিশ্চিত করার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কারখানা মালিকদের যেমন শ্রমিক কল্যাণে মনোযোগী হতে হবে, তেমনই শ্রমিকদেরও দেশের অর্থনীতির কথা মাথায় রেখে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

ভবিষ্যতে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে একটি স্থায়ী ও কার্যকর কর্মসংস্থান নীতি প্রণয়ন করা অত্যন্ত বাঞ্ছনীয়।

সব মিলিয়ে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে পোশাক খাতের স্থবিরতা ও অস্থিরতা দূর করতে মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন এবং রাষ্ট্র প্রশাসনকে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও বিচক্ষণ ভূমিকা পালন করতে হবে। পারস্পরিক সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন পরিবেশ ফিরিয়ে আনা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানের ওপর এক অপূরণীয় বিপর্যয় নেমে আসবে।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর ও নিউএজ


এ জাতীয় আরো খবর...