শিরোনামঃ
লাইসেন্সপ্রাপ্ত মানি চেঞ্জারদের বৈদেশিক মুদ্রা জমায় নতুন সুবিধা রফতানি ও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক ধারা, রিজার্ভ ৩৬.২৫ বিলিয়ন ডলার সিটি গ্রুপকে ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ দিতে আইন শিথিল করল বাংলাদেশ ব্যাংক সিঙ্গাপুরে প্রশিক্ষণে যাচ্ছেন সচিব, অতিরিক্ত সচিবসহ ৩৫ সরকারি কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে চীনা মন্ত্রীর সাক্ষাৎ, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদারের আহ্বান ঋণ সহায়তার বাইরে কোরিয়ার সঙ্গে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব চায় বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর সৌরবিদ্যুৎ পরিকল্পনা ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্পপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে : মাহদী আমিন আর্টিলারি রেজিমেন্টের অধিনায়ক সম্মেলন ও পুনর্মিলনীতে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা আরও গভীর করতে চীনের অঙ্গীকার: লিউ মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে কাজ করবে সংসদীয় ককাস
বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৩ অপরাহ্ন

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি: ওয়াশিংটন কি এবার ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সমাপ্তির পথ খুঁজবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে (Midterm Elections) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের নজিরবিহীন ভরাডুবির পর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। বিশেষ করে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত ‘ইরান যুদ্ধ’ নিয়ে মার্কিন নীতি এখন এক বড় ধরনের বাঁকবদলের মুখোমুখি। ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—হোয়াইট হাউস কী এখন ইরানের সঙ্গে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সমাপ্তির কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল বা ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ খুঁজবে? নাকি মধ্যবর্তী নির্বাচনের চাপমুক্ত হয়ে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন কোনো সামরিক সংঘাতের দিকে পা বাড়াবে?

মার্কিন রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, রিপাবলিকানদের এই পরাজয়ের ফলে হোয়াইট হাউসের একক সিদ্ধান্তের দিন শেষ হতে চলেছে। এখন থেকে যুদ্ধ কীভাবে শেষ করা যায়, তা নিয়েই মার্কিন নীতিনির্ধারণী মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হবে। নবনির্বাচিত কংগ্রেস এখন যুদ্ধ বন্ধের এই বিষয়টি নিয়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে এবং এক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট সদস্যরা যুদ্ধ নিয়ে বেশি প্রশ্ন তোলার এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আইনি হাতিয়ার পাবেন।
মিনেসোটার মিনিয়াপোলিস থেকে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রিপাবলিকান রাজনৈতিক কৌশলবিদ অ্যামি ফ্রেডেরিকসেন বলেন, “আমার মনে হয় যে, সেই রূপরেখা বা কৌশল কেমন হবে তা নিয়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একসাথে কাজ করার একটি সুবর্ণ সুযোগ এই কংগ্রেসের রয়েছে”। তিনি বিশ্বাস করেন, বর্তমান প্রশাসনের জন্য এখন ইরানে যুদ্ধ সমাপ্তির কৌশল খুঁজে বের করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে উঠবে।
ফ্রেডেরিকসেন আরও যোগ করেন, “মার্কিন জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ওখানকার এই সামরিক অভিযানটি নিয়ে এতদিন বলতে গেলে তেমন কোনো প্রশ্নই তোলা হয়নি।” কিন্তু এখন ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস সেই পুরোনো ধারা ভেঙে মার্কিন প্রশাসনের সামরিক খরচের হিসাব এবং যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে কড়া নজরদারি চালাবে।

আমেরিকার এই যুদ্ধের পেছনে অন্যতম প্রধান অজুহাত ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে থামানো। এই বিষয়ে অ্যামি ফ্রেডেরিকসেন জানান, বেশিরভাগ মার্কিন নাগরিকই পারমাণবিক শক্তিধর ইরানকে কখনো সমর্থন করবে না বা দেশটিকে পারমাণবিক ক্ষমতাধর হিসেবে দেখতে চাইবে না। আর এটিই ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধে জড়ানোর অন্যতম ‘ঘোষিত কারণ’।
তবে বিগত মাসগুলোতে যুদ্ধ ক্রমেই দীর্ঘায়িত ও ব্যয়বহুল রূপ নিলেও ট্রাম্প প্রশাসন বারবার মার্কিন জনগণকে আশ্বস্ত করে আসছিল যে এই যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে। প্রশাসনের এই ধরনের বক্তব্যকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, “এ ক্ষেত্রে আমাদের কেবল এমন কিছু বলা হচ্ছিল যা আদৌ সত্য ছিল না।” ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের এই মিথ্যা আশ্বাসের ফলেই মার্কিন জনগণের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধে, যার প্রতিফলন ঘটেছে ব্যালট বক্সে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আবারও বলছি, যে প্রতিষ্ঠানটির নজরদারি চালানো উচিত এবং যার প্রশ্ন তোলা উচিত সেটি হলো কংগ্রেস; আর এখন ডেমোক্র্যাটরা ঠিক সেই কাজটিই করবে।”

মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ফলাফলকে বিশ্ব গণমাধ্যম এবং ইরানের পক্ষ থেকেও বেশ আগ্রহের সাথে দেখা হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এবং মার্কিন গণমাধ্যম পলিটিকো-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিপাবলিকানদের এই ভরাডুবিকে তেহরান এক ধরণের ‘স্মুগ স্যাটিসফ্যাকশন’ বা আত্মতৃপ্তির সাথে দেখছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং প্রধান পরমাণু আলোচনাকারী মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, “বিবেক কিংবা জীবনযাত্রার ব্যয়—যে কারণেই হোক না কেন, আমেরিকানরা যুদ্ধকে ‘না’ বলে দিয়েছে এবং আমরা এই বার্তাকে স্বাগত জানাই”।
তবে একই সাথে তেহরান ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, মার্কিন সরকার যদি তাদের জনগণের এই যুদ্ধবিরোধী রায়কে উপেক্ষা করে কোনো আন্তর্জাতিক লবিস্ট বা ব্ল্যাকমেইলারদের স্বার্থ রক্ষা করতে চায়, তবে তাদের জন্য সামনে এক ‘ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন’ অপেক্ষা করছে।

ফক্স নিউজ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে, এই নির্বাচনে তার দলের হারের পেছনে ইরান যুদ্ধের একটি বড় ভূমিকা ছিল। তিনি বলেন, “আমি মনে করি এর একটি অংশ ছিল ইরান। মানুষ ইরানের বিরুদ্ধে আমার নেওয়া পদক্ষেপের গুরুত্ব বুঝলেও, তারা হয়তো বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির মতো স্বল্পমেয়াদি ধাক্কাগুলো মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না”।
বাস্তবতা হলো, ইরান যুদ্ধের ফলে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (Brent crude) দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড মূল্যস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এই তীব্র অর্থনৈতিক অসন্তোষের কারণেই ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার রেটিং ৩০ শতাংশের কোঠায় নেমে আসে, যা ডেমোক্র্যাটদের জন্য একচেটিয়া বিজয়ের পথ সুগম করে।

নির্বাচনের আগে ট্রাম্প বারবার দাবি করেছিলেন যে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই এই যুদ্ধ ‘অবিলম্বে শেষ’ হয়ে যাবে। ডয়েচে ভেলে (DW) এবং সিবিএস নিউজ-এর তথ্য অনুযায়ী, কাতার ও ওমানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে ব্যাক-চ্যানেল বা পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনা চলছে। কাতার ইতিমধ্যেই একটি নতুন শান্তি প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, যা হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার মতো বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
তবে থিংক ট্যাংক সংস্থা কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (CFR) এবং দ্য গার্ডিয়ান-এর বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের সামনে এখন তিনটি পথ খোলা রয়েছে:
১. কূটনৈতিক সমঝোতা: কাতার বা ওমানের মধ্যস্থতায় একটি সম্মানজনক চুক্তিতে আসা, যার ইঙ্গিত মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও দিয়েছেন।
২. সংঘাতের ধারাবাহিকতা বা স্থিতাবস্থা: সীমিত আকারে নৌ-অবরোধ জারি রাখা, যা মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করবে।
৩. আকস্মিক সামরিক হামলা: নির্বাচনী চাপ কেটে যাওয়ায় ট্রাম্প হয়তো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরামর্শে ইরানের পরমাণু ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে এক বা একাধিক বিধ্বংসী বিমান হামলা চালিয়ে নিজের বিজয় ঘোষণা করতে পারেন, যা মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাবিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের এই ঐতিহাসিক জয় মার্কিন প্রশাসনের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের ওপর একটি শক্তিশালী ব্রেক হিসেবে কাজ করবে সন্দেহ নেই। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন প্রথাগত ধারার বাইরের এবং আবেগপ্রবণ নেতার ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন যুদ্ধ সমাপ্তির পথে হাঁটবে নাকি প্রতিশোধের নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি করবে, তা দেখার জন্য বিশ্বকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।


এ জাতীয় আরো খবর...