নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার তৃতীয় দিনেই বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ‘আদানি চুক্তি’ পর্যালোচনায় বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু-এর সভাপতিত্বে চার মন্ত্রীর এক গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আদানির সঙ্গে করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (PPA) বাতিল বা সংশোধনের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
বিদ্যুৎ মন্ত্রীর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন:
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিনন্দ্য ইসলাম অমিত।
বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজ এবং পিডিবি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম।
বিশেষজ্ঞ সদস্য অধ্যাপক মোস্তাক আহমেদ খান।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে আদানির চুক্তিতে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের মূল তথ্যগুলো হলো:
১. ঘুষের বিনিময়: সাবেক বিদ্যুৎ সচিব আহমেদ কায়কাউস এই চুক্তির বিনিময়ে বিদেশের অ্যাকাউন্টে কয়েক মিলিয়ন ডলার ঘুষ নিয়েছেন বলে প্রমাণ পেয়েছে কমিটি।
২. অবস্থান পরিবর্তন: বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশে হওয়ার কথা থাকলেও কোনো আলোচনা ছাড়াই তা ভারতের ঝাড়খণ্ডে সরিয়ে নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়।
৩. অস্বাভাবিক দাম: ভারতে অন্যান্য কেন্দ্র থেকে ইউনিট প্রতি ৮.৫০ টাকায় বিদ্যুৎ কেনা হলেও আদানির কাছ থেকে কেনা হচ্ছে ১৪.৮৭ টাকায়।
৪. দুদকের তদন্ত: কায়কাউস ছাড়াও পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদসহ ১১ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের তদন্ত করছে দুদক।
আদানি গ্রুপ ইতোমধ্যেই কয়লার দাম নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক আদালত (SIAC)-এ মামলা করেছে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বাংলাদেশ সরকারও আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়েছে:
ল’ ফার্ম নিয়োগ: ব্রিটিশ ল’ ফার্ম ‘থ্রি ভিপি চেম্বার’-এর কিংস কাউন্সিল ফারহাজ খান বাংলাদেশের হয়ে আদানির বিরুদ্ধে লড়বেন।
বিশেষজ্ঞ প্যানেল: ব্যারিস্টার এহসান আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ও অধ্যাপক ড. এম রেজওয়ান খানকে নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করা হয়েছে।
বৈঠকে পিডিবি চেয়ারম্যান জানান, আদানি বর্তমানে ১,৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। হুট করে চুক্তি বাতিল করলে ভারতের অন্যান্য উৎস থেকে আসা বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা দেশে বিদ্যুৎ সংকট তৈরি করতে পারে। আইনমন্ত্রীও জানান, যেহেতু এটি আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং আওয়ামী লীগ সরকার এতে ‘সার্বভৌম গ্যারান্টি’ দিয়ে গেছে, তাই সব দিক পর্যালোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে এই চুক্তির বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বড় কোনো ঘোষণা আসতে পারে।
চুক্তির সময়: ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ হতে ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৯।
কয়লার দাম নিয়ে বিরোধ: ৫০ কোটি ডলার (৬ হাজার কোটি টাকার বেশি)।
মাসিক বিল: ১০ কোটি ডলারের বেশি।