মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরানের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে দেখা দিয়েছে চরম অচলাবস্থা। একদিকে নিরাপত্তার অভাবে প্রণালির প্রবেশমুখে আটকা পড়েছে ৩১ জন নাবিকসহ বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। অন্যদিকে, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জ্বালানিমন্ত্রীর অনুরোধে বাংলাদেশি তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে নিরাপদে এই প্রণালি অতিক্রম করতে দেওয়ার বিশেষ আশ্বাস দিয়েছে ইরান।
গত ২ ফেব্রুয়ারি ভারত থেকে পণ্য নিয়ে হরমুজ প্রণালি হয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করেছিল ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। জাহাজটি কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছানোর পরদিনই যুদ্ধ শুরু হয়।
বিএসসি সূত্র ও জাহাজের ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম জানান, গত ১২ মার্চ জাহাজটি দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করে। কিন্তু প্রণালির প্রবেশমুখের ৬৬ নটিক্যাল মাইল দূরে থাকতেই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোস্টগার্ডের সতর্কবার্তার কারণে তারা ফিরে আসতে বাধ্য হন। বর্তমানে জাহাজটি শারজা উপকূলের বহির্নোঙরে অবস্থান করছে। বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক নিশ্চিত করেছেন যে, জাহাজের ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক সুস্থ আছেন এবং সেখানে কয়েক মাসের জন্য পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও জ্বালানি মজুত রয়েছে। জাহাজটিকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক সহায়তা চেয়েছে বিএসসি।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়ার কথা জানিয়েছে ইরান। শুক্রবার ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রাহিমি জাহানাবাদী এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমরা জানি আপনাদের দেশে জ্বালানি সংকট রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আমি তেহরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। বাংলাদেশের জনগণ যেন কষ্টে না পড়ে, সেজন্য আপনাদের জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোকে নিরাপদে পার হওয়ার সুযোগ দিতে ইরান প্রস্তুত।’
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, ইরান আঞ্চলিক যুদ্ধ চায় না, কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটি থেকে আক্রমণ হলে তারা চুপ থাকবে না।
হরমুজ প্রণালি হলো বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত তেল পরিবহন চ্যানেল, যেখান দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পারাপার হয়। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নামে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখা অব্যাহত রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহতদের রক্তের বদলা নেবে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানি জনগণকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, তারা ইরানি সরকারের পতনের জন্য ‘অনুকূল পরিস্থিতি’ তৈরি করছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও অনলাইনে নতুন করে ইরানকে হুমকি দিয়েছেন। পেন্টাগনের তথ্যমতে, এই যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের ১১.৩ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।
সংঘাতের ১৩তম দিনে এসে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এই মূল্যবৃদ্ধি সামাল দিতে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ আগামী এক মাসের জন্য সাগরে ভাসমান রুশ তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে।