ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল এবার সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে প্রান্তিক কৃষকের দোরগোড়ায়। দেশের কৃষি খাতকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও সুসংগঠিত করতে নতুন বাংলা বছরের প্রথম দিন, অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে (১৪ এপ্রিল, মঙ্গলবার) দেশব্যাপী চালু হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ‘কৃষক কার্ড’। একটি মাত্র কার্ডের ছোঁয়ায় ভূমিহীন ও ক্ষুদ্র কৃষকরা বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সরাসরি নগদ আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি পাবেন আরও ১০ ধরনের অভাবনীয় সুযোগ-সুবিধা।
উদ্বোধন ও প্রাক-পাইলটিং কার্যক্রম
আগামী মঙ্গলবার টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে এই প্রাক-পাইলটিং কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তিন ধাপে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এই কর্মসূচির প্রথম ধাপে ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি ব্লকে এই কার্ড দেওয়া হচ্ছে। শুধু ফসল উৎপাদনকারীই নন, বরং মৎস্যচাষি, প্রাণিসম্পদ খামারি এবং লবণচাষিরাও এই কৃষক কার্ডের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন। এই প্রাক-পাইলটিং ধাপে সরকারের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
কার্ডের ধরন ও সুবিধাভোগীদের পরিসংখ্যান
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ‘কৃষক কার্ড’ মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের একটি ডেবিট কার্ড। এরই মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের শাখাগুলোতে নির্বাচিত কৃষকদের নামে ব্যাংক হিসাব খোলার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ১১ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। জমির পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে এদের ৫টি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এর মধ্যে ভূমিহীন কৃষক রয়েছেন ২ হাজার ২৪৬ জন, প্রান্তিক কৃষক ৯ হাজার ৪৫৮ জন, ক্ষুদ্র কৃষক ৮ হাজার ৯৬৭ জন, মাঝারি কৃষক ১ হাজার ৩০৩ জন এবং বড় কৃষক ৯১ জন। এদের মধ্যে প্রথম তিন শ্রেণির অর্থাৎ ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরাই (যাদের মোট সংখ্যা ২০ হাজার ৬৭১ জন) কার্ডের মাধ্যমে বছরে আড়াই হাজার টাকার সরাসরি নগদ প্রণোদনা পাবেন।
যে ১০টি বিশেষ সুবিধা পাবেন কার্ডধারী কৃষকরা
কৃষিমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে এই কার্ডের বহুমুখী সুবিধার কথা বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তিনি জানান, কার্ডধারী কৃষকেরা মূলত দশ ধরনের যুগান্তকারী সেবার আওতাভুক্ত হবেন। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকেরা ডিলারদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে সার-বীজসহ যাবতীয় কৃষি উপকরণ ও ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা পাবেন। মূলধনের অভাব ঘোচাতে মিলবে সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং স্বল্পমূল্যে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এড়িয়ে কৃষকরা সরাসরি এই কার্ডেই পাবেন সরকারি ভর্তুকি ও নগদ প্রণোদনা। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা হিসেবে তাদের মোবাইল ফোনে নিয়মিত আবহাওয়া পূর্বাভাস ও বাজারের আগাম তথ্য পৌঁছে দেওয়া হবে। পাশাপাশি দক্ষতা বাড়াতে কৃষিবিষয়ক উন্নত প্রশিক্ষণ এবং ফসলের রোগ-বালাই দমনের কার্যকরী পরামর্শ পাবেন তারা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি এড়াতে কৃষি বিমা সুবিধা এবং সবশেষে উৎপাদিত কৃষিপণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রয়ের শতভাগ সুযোগ নিশ্চিত করা হবে এই কার্ডের মাধ্যমে।
দেশব্যাপী সম্প্রসারণ ও বিশেষজ্ঞদের মত
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে এই কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রাক-পাইলটিং ধাপ শেষে আগামী আগস্ট মাসের মধ্যে ১৫টি উপজেলায় পাইলট কার্যক্রম চালু হবে এবং আগামী চার বছরে ধাপে ধাপে পুরো দেশের কৃষকদের এই ডিজিটাল তথ্যভান্ডারের আওতায় আনা হবে।
সচিবালয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, কৃষকদের আর্থসামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি ও একটি সার্বজনীন ডিজিটাল পরিচয় তৈরির লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। অন্যদিকে, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সাবেক সভাপতি ড. জাহাঙ্গীর আলম খান এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, প্রকৃত কৃষক শনাক্তে এটি দারুণ কাজ করবে। তবে পুরো দেশে বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত চার বছরের সময়সীমা কমিয়ে আনার পাশাপাশি কার্ড বিতরণের বাছাই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপরও তিনি জোর দিয়েছেন।
| ক্রমানুসার | কার্ডধারী কৃষকের ১০টি বিশেষ সুবিধা |
|---|---|
| ০১ | সার ও বীজসহ যাবতীয় কৃষি উপকরণ ন্যায্যমূল্যে প্রাপ্তি। |
| ০২ | সাশ্রয়ী বা ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা নিশ্চিতকরণ। |
| ০৩ | সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে কৃষিঋণ পাওয়ার সুযোগ। |
| ০৪ | সরকারি সহায়তায় স্বল্পমূল্যে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি কেনা। |
| ০৫ | সরাসরি ব্যাংক হিসাবে সরকারি ভর্তুকি ও নগদ প্রণোদনা প্রাপ্তি। |
| ০৬ | মোবাইল ফোনে নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও বাজারের আগাম তথ্য। |
| ০৭ | কৃষি বিষয়ক আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ সুবিধা। |
| ০৮ | ফসলের রোগ-বালাই দমনে বিশেষজ্ঞদের দ্রুত পরামর্শ। |
| ০৯ | প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় কৃষি বিমা সুবিধা। |
| ১০ | উৎপাদিত কৃষিপণ্য সরাসরি সরকারের কাছে ন্যায্যমূল্যে বিক্রির সুযোগ। |
*এটি একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড যা সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।