শিরোনামঃ
স্বস্তিতে শুরু মাধ্যমিকের লড়াই: প্রশ্নফাঁসের শঙ্কা উড়িয়ে দিলেন শিক্ষামন্ত্রী বাসের ভাড়ায় আসছে সমন্বয়, সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে ‘আঞ্চলিক’ নববর্ষের রূপরেখা ত্যাগের মূল্যায়নে স্বজন-ছায়া: নারী আসনে বিএনপির ৩৬ মুখ জোটের শরিকদের ছাড়, নারী আসনে জামায়াত-এনসিপির চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত গম পাচার কেলেঙ্কারি: ভোটের মুখেই ইডির তলবে বিপাকে নুসরাত ব্যাট ছেড়ে মালিকানায় ‘ইউনিভার্স বস’: স্কটিশ ফ্র্যাঞ্চাইজি কিনলেন গেইল জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি—সরকারের সাশ্রয়ের বিপরীতে কতটা পুড়ছে সাধারণ মানুষ? চার দেওয়াল পেরিয়ে দেশ গড়ার অঙ্গীকার: নারী আসনের ভোটে সরগরম নির্বাচন ভবন হামের থাবায় কাঁপছে কুষ্টিয়া: একদিনে হাসপাতালে ২৮ অপহরণ, সালিশ ও ফের পলায়ন: কুমিল্লার মেঘনায় স্কুলছাত্রীকে নিয়ে ধূম্রজাল
মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০০ অপরাহ্ন

বারুদের গন্ধে ভারী মধ্যপ্রাচ্য: নিরাপত্তাহীনতায় ৬০ লাখ রেমিট্যান্স যোদ্ধা

বিশেষ প্রতিবেদক / ৯ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত বালুকাময় মরুভূমি এখন বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে। ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও সামরিক উত্তেজনা এমন এক বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে, যা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলকে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে। এই সংঘাতের সরাসরি এবং সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব গিয়ে পড়ছে ওই অঞ্চলে কর্মরত প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের ওপর। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এই ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধারা’ আজ চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। অথচ, অন্যান্য দেশ যখন নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষায় দৃশ্যমান ও জরুরি পদক্ষেপ নিচ্ছে, তখন বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা কেবল ‘কূটনৈতিক যোগাযোগ’ আর ‘পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ’-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, যা জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে।

আতঙ্কে প্রবাসীদের জীবন ও প্রাণহানি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ইরানের প্রতিশোধমূলক মিসাইল এবং ড্রোন হামলায় এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সামগ্রিকভাবে ইরানে নিহতের সংখ্যা তেরোশো ছাড়িয়েছে। তবে এই যুদ্ধের আঁচ থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না নিরীহ প্রবাসীরাও।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশি প্রবাসীদের হতাহত হওয়ার মর্মান্তিক খবর সামনে আসতে শুরু করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি একটি মিসাইল হামলার ধ্বংসাবশেষের আঘাতে তিনজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন পাকিস্তানি, একজন নেপালি এবং একজন বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধা ছিলেন। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কয়েকটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, ইরানের হামলার ঘটনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে মোট দুজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন এবং আরও বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন।

সংখ্যাটি আপাতদৃষ্টিতে হয়তো ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু এটি একটি ভয়াবহ বিপদের স্পষ্ট সতর্কবার্তা। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশিদের একটি বিশাল অংশই নির্মাণ শ্রমিক, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, কারখানার শ্রমিক কিংবা গৃহকর্মীর মতো নিম্ন আয়ের পেশার সঙ্গে যুক্ত। যুদ্ধ বা যেকোনো নিরাপত্তা সংকটের সময় বহুতল ভবন নির্মাণ বা খোলা জায়গায় কর্মরত এই ধরনের শ্রমিকরাই সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত ও ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। সাইরেন বাজলে বা মিসাইল হামলা হলে তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত থাকে।

সোনার ডিম পাড়া হাঁস: প্রবাসীদের ঘামে বাঁচা অর্থনীতি

বাংলাদেশি শ্রমিকদের এই অবদানের কথা কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি কাজ করছেন। তাদের সবচেয়ে বড় অংশটি কর্মরত আছেন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান এবং বাহরাইনে। এই শ্রমিকরাই মূলত বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রধান মেরুদণ্ড।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল প্রায় ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ মাসিক রেমিট্যান্স প্রবাহ। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরব থেকেই বছরে প্রায় ৪.৭ বিলিয়ন ডলার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এবং সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতিকে ধসের হাত থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে এই রেমিট্যান্স প্রবাহ সঞ্জীবনীর মতো কাজ করে। অথচ, দেশের জন্য যারা ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ হিসেবে কাজ করছেন, চরম বিপদের মুহূর্তে খোদ রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হচ্ছে।

সরকারি পদক্ষেপের নামে ‘উদাসীনতা’ ও ক্ষতিপূরণহীন মৃত্যু

যেকোনো রাষ্ট্রে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হলে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত নিহতদের পরিবারের জন্য আলাদা কোনো ক্ষতিপূরণ, আর্থিক অনুদান বা বিশেষ সহায়তা কর্মসূচির ঘোষণা দেয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে, তারা গাল্ফ অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, সরকার প্রবাসীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।

এছাড়া জরুরি হটলাইন চালু করা এবং ফ্লাইট বন্ধ হয়ে আটকে পড়া প্রবাসীদের বিষয়ে নজর রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো—এই হটলাইনে কল করে বা শুধু নজরদারি করে মিসাইল হামলার মুখে থাকা একজন শ্রমিকের কী উপকার হবে? হটলাইন হয়তো সাময়িক তথ্য দিতে পারে, কিন্তু তা জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারে না। সরকারের এই পদক্ষেপগুলো মূলত আনুষ্ঠানিক ও কূটনৈতিক কাগজপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিপদে পড়া শ্রমিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া বা নিহতদের পরিবারের দ্রুত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট বা দৃশ্যমান উদ্যোগ এখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি।

অন্যান্য দেশের দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ বনাম বাংলাদেশের ব্যর্থতা

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটে কেবল বাংলাদেশ নয়, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনের মতো দেশের লাখ লাখ শ্রমিকও সেখানে কর্মরত আছেন। কিন্তু নিজ দেশের নাগরিকদের সুরক্ষায় তারা যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তার তুলনায় বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা চরম হতাশাজনক।

উদাহরণস্বরূপ ফিলিপাইনের কথা বলা যায়। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ কর্মী কাজ করেন, যা বাংলাদেশের তুলনায় চার ভাগের এক ভাগ। রেমিট্যান্স আয়ের দিক থেকেও তারা বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে। অথচ ফিলিপাইন সরকার তাদের নাগরিকদের সুরক্ষায় চার স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করেছে। প্রথম স্তরে রয়েছে ‘ক্রাইসিস অ্যালার্ট সিস্টেম’। এর মাধ্যমে তারা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে সেখান থেকে শ্রমিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার বা নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। যারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে চান, তাদের আবেদন দ্রুত প্রসেস করা হচ্ছে। ফিলিপাইনের সংসদ ইতিমধ্যে প্রবাসীদের জন্য ‘জরুরি সহায়তা তহবিল’ অনুমোদন করেছে এবং রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করেছে।

পাশের দেশ ভারতের ডিজিটাল সিস্টেম ‘ই-মাইগ্রেট’ (e-Migrate) পোর্টালের মাধ্যমে তারা বিদেশে থাকা নাগরিকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর শ্রীলঙ্কাও তাদের কর্মীদের জন্য ‘সেন্ট্রাল অপারেশন সেন্টার’ এবং ‘রিয়েল-টাইম ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ তৈরি করেছে। এমনকি পাকিস্তানও তাদের নাগরিকদের বিষয়ে নিয়মিত আপডেট রাখছে। অথচ ৬০ লাখ প্রবাসীকে নিয়ে বাংলাদেশ সরকার কেবল পরিস্থিতি ‘পর্যবেক্ষণ’ করেই তাদের দায়িত্ব শেষ করতে চাইছে।

সময়ের দাবি: চাই সমন্বিত ও দৃশ্যমান উদ্যোগ

অর্থনীতি বিশ্লেষক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারের এই নির্লিপ্ততা ও রুটিন কাজের বাইরে গিয়ে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত হয়তো এখনো আঞ্চলিক পর্যায়ে সীমিত আছে, কিন্তু যেকোনো সময় এটি সর্বাত্মক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

তাই এখনই সরকারের উচিত একটি ‘সমন্বিত প্রত্যাবাসন ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা’ প্রণয়ন করা। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে শ্রমিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য জরুরি ফান্ড গঠন করতে হবে। যাদের কর্মস্থল ধ্বংস হয়ে গেছে বা যারা বেকার হয়ে পড়েছেন, তাদের খাবার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বোপরি, যুদ্ধে যারা প্রাণ হারিয়েছেন বা আহত হয়েছেন, তাদের পরিবারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে দ্রুত ও সম্মানজনক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

যারা নিজেদের রক্ত পানি করে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে রাখছেন, বিপদের দিনে রাষ্ট্র যদি তাদের পাশে না দাঁড়ায়, তবে তা কেবল চরম অমানবিকই নয়, বরং দেশের অর্থনীতির জন্যও একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে পরিগণিত হবে। সরকারকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর যন্ত্র নয়, তারা এ দেশের গর্বিত নাগরিক, যাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য।


এ জাতীয় আরো খবর...