ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য নিজেদের ভাগে পড়া ৩৬টি আসনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সোমবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নামগুলো ঘোষণা করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। আগামী ১২ মে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনের আগে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই ও সাক্ষাৎকারের পর এই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে ঘোষিত এই তালিকায় রাজপথের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেত্রীদের পাশাপাশি দলের প্রভাবশালী নেতাদের স্ত্রী ও কন্যাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দলের পক্ষ থেকে এর আগে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে, চরম দুঃসময়ে যারা দলের হাল ধরেছেন এবং রাজপথে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সংরক্ষিত আসনে তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতার স্বজনদের নাম আসায় সেই প্রতিশ্রুতির শতভাগ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। আলোচনায় থাকা এই স্বজনদের মধ্যে রয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরীর মেয়ে নিপুণ রায় চৌধুরী, চট্টগ্রামের সাবেক সংসদ সদস্য ও হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার সাকিলা ফারজানা, নরসিংদী-১ আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকনের স্ত্রী শিরিন সুলতানা এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রয়াত সভাপতি শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন। অবশ্য দলের নীতিনির্ধারকদের দাবি, কেবল পারিবারিক পরিচয়ের কারণে নয়, বরং রাজনীতিতে তাদের নিজস্ব ত্যাগ ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই তাদের এই মূল্যায়ন করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির এই তালিকায় প্রবীণ ও নবীনের একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়েছে। দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য সেলিমা রহমান থেকে শুরু করে সাবেক ছাত্রনেত্রীদেরও এখানে স্থান দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত হওয়া ৩৬ জনের এই তালিকায় আরও রয়েছেন রাশেদা বেগম হীরা, রেহানা আক্তার রানু, নেওয়াজ হালিমা আরলী, মোসা. ফরিদা ইয়াসমিন, বিলকিস ইসলাম, হেলেন জেরিন খান, নিলোফার চৌধুরী মনি, জীবা আমিন খান, মাহমুদা হাবিবা, মোছা. সাবিরা সুলতানা, সানসিলা জেবরিন, সানজিদা ইসলাম তুলি, সুলতানা আহমেদ, ফাহমিদা হক, আন্না মিনজ, সুবর্ণা সিকদার (ঠাকুর), শামীম আরা বেগম স্বপ্না, মোসাম্মৎ শাম্মী আক্তার, ফেরদৌসী আহমেদ, মোছা. সুরাইয়া জেরিন, মানসুরা আক্তার, জহরত আদিব চৌধুরী, মমতাজ আলো, ফাহিমা নাসরিন, আরিফা সুলতানা, মোছা. সানজিদা ইয়াসমিন, নাদিয়া পাঠান পাপন, শওকত আরা আক্তার, মাধবী মার্মা, সেলিনা সুলতানা এবং রেজেকা সুলতানা। বিভিন্ন পেশা ও অঞ্চল থেকে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি এবং পেশাজীবীদেরও সংসদে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে দলটি।
সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়নকে ঘিরে এবার তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। দলীয় সূত্র ও গণমাধ্যমের তথ্যমতে, মাত্র ৩৬টি আসনের বিপরীতে এবার রেকর্ড এক হাজার ২৫টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে দলটি। দুই হাজার টাকা মূল্যের এসব ফরম পূরণের পর প্রায় ৯০০ জন প্রার্থী ৫০ হাজার টাকা করে জামানত দিয়ে তা জমা দিয়েছেন, যা দলের তহবিলেও বড় অঙ্কের আর্থিক জোগান দিয়েছে। গত ১৭ ও ১৮ এপ্রিল দলের বর্তমান নেতৃত্ব এবং স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত পার্লামেন্টারি বোর্ড টানা দুই দিন ধরে প্রার্থীদের সরাসরি ও ভার্চুয়াল সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এই নারী জনপ্রতিনিধিরা আগামী দিনে আইন প্রণয়ন ও দেশ গঠনে কতটা জোরালো ভূমিকা রাখতে পারেন, সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি।