শিরোনামঃ
আমাদের ১০টি কমন স্বভাব টাকা ছাপিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংককে ঋণ দেবে না বাংলাদেশ ব্যাংক ঢাবিতে নেকাব পরা শিক্ষার্থীকে অপমান ইসলামবিদ্বেষী মানসিকতা: বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পশ্চিমবঙ্গ মাদরাসা সার্ভিস কমিশন বিলুপ্ত ঘোষণা করল বিজেপি সরকার মোদির সঙ্গে ত্রিবেদীর দীর্ঘ বৈঠক, তারেক রহমানের সফর নিয়ে আলোচনা ১২ ডিসেম্বরের আগেই নবায়ন হবে গঙ্গা চুক্তি: পানিসম্পদমন্ত্রী শিক্ষকদের দাবি পর্যায়ক্রমে মেনে নেবে সরকার: রিজভী দুর্নীতি করে শিক্ষকদের ভাতা বন্ধ করেছিল ফ্যাসিবাদী সরকার: মাহদী আমিন ভিসা সহজীকরণ ও বাণিজ্য বৃদ্ধি জোরদারে ইন্দোনেশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মাহ্দী আমিনের বৈঠক কূটনীতির মাধ্যমেই পানি সমস্যার সমাধান করতে হবে : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন
বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৫ অপরাহ্ন

টাইম ম্যাগাজিনের স্বীকৃতি: তারেক রহমানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্মান নাকি পতনের অশনিসংকেত?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেস্ক / ৯৯ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নাম প্রভাবশালী মার্কিন সাময়িকী ‘টাইম ম্যাগাজিন’-এর তালিকায় দেখে তার সমর্থক ও দলীয় নেতাকর্মীরা আনন্দে উদ্বেলিত। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের একাকী লড়াই শেষে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়া—সব মিলিয়ে এই স্বীকৃতিকে তারা এক বিশাল আন্তর্জাতিক বিজয় হিসেবেই দেখছেন। কিন্তু উচ্ছ্বাসের এই জোয়ারে গা ভাসানোর আগে একটু থমকে দাঁড়ানো প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবাখেলায় এই স্বীকৃতি কি সত্যিই নিছক কোনো সম্মান, নাকি এটি ক্ষমতা থেকে পতনের এক অদৃশ্য অশনিসংকেত? ইতিহাসের পাতা কিন্তু অন্য কথাই বলছে।

উচ্ছ্বাসের পেছনের বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

শুরুতেই নিরপেক্ষতার খাতিরে মুদ্রার ইতিবাচক দিকটি দেখা যাক। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের নেওয়া ‘কৃষক গার্ড’ এবং ‘ফ্যামিলি গার্ড’-এর মতো জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলো আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বও বলছে, তিনি তার মা বেগম খালেদা জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন দেখছেন, তা বেশ গতিশীল। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে তার এই রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: টাইম ম্যাগাজিনের ‘অভিশাপ’ তত্ত্ব

কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা থিংকট্যাংকগুলোর হিসাব-নিকাশ এত সরল নয়। টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে বা প্রভাবশালী তালিকায় নাম আসা মানেই কি নির্ভেজাল আনন্দ? ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, এই ম্যাগাজিনে স্থান পাওয়া অনেক নেতার জন্যই তা পরবর্তীতে ‘কাল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

  • শেখ হাসিনা: ২০২৩ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাকে অত্যন্ত প্রভাবশালী হিসেবে তুলে ধরেছিল। ফলাফল? ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে তাকে শুধু ক্ষমতাই ছাড়তে হয়নি, দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে।

  • বেগম খালেদা জিয়া: ২০০৬ সালে টাইম ম্যাগাজিনে তার ইতিবাচক উপস্থিতি ছিল। কিন্তু এরপর ২০০৭ সালের ১/১১-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং জেল-জুলুমের তিক্ত অভিজ্ঞতা সবারই জানা।

  • বিশ্বনেতাদের পতন: শুধু বাংলাদেশ নয়, সাদ্দাম হোসেন, মুয়াম্মার গাদ্দাফি থেকে শুরু করে জুলফিকার আলী ভুট্টো কিংবা জন এফ. কেনেডি—এই নেতাদের প্রত্যেকেই যখন টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে বা প্রশংসার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন, তার কিছুদিন পরই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির রোষানলে পড়ে তাদের পতন বা মর্মান্তিক পরিণতি হয়েছে।

প্রশ্ন জাগে, পশ্চিমা এই মিডিয়া বা থিংকট্যাংকগুলো কি আগে থেকেই জানে কার পতন আসন্ন? নাকি সম্মান দেওয়ার আড়ালে এটি পতনের কাউন্টডাউন? পশ্চিমা বিশ্ব কখনো বিনা স্বার্থে কাউকে প্রমোট করে না। তারেক রহমানকে যখন তারা প্রভাবশালী বলছে, তখন বুঝতে হবে এর পেছনে কোনো বড় আন্তর্জাতিক এজেন্ডা রয়েছে। পশ্চিমা প্রেসক্রিপশন মানতে অস্বীকার করলেই এই প্রশংসাই কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে এবং ‘গণতন্ত্রের রক্ষক’ থেকে রাতারাতি ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দিয়ে ছুড়ে ফেলতে তারা এক মুহূর্তও সময় নেবে না।

তারেক রহমানের আসল শত্রু: অভ্যন্তরীণ চাটুকারিতা ও ভুল পরামর্শ

বর্তমান উন্নয়নশীল বিশ্বে খাদের কিনারে থাকা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের দিনকাল খুব একটা মসৃণ যাচ্ছে না। ক্ষমতায় বসার পর একজন নেতার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায় তার চারপাশের সুবিধাবাদী মানুষগুলো।

সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি যেসব তথ্য দিচ্ছেন বা বক্তব্য রাখছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিস্তর সমালোচনা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তার একটি মন্তব্য বেশ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। স্কুলগুলোতে যদি ফি বা বয়সের কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তবে দেশে এক ধরনের নৈরাজ্য তৈরি হবে—এমন আশঙ্কা করছেন অনেকেই। তবে কি তার উপদেষ্টারা তাকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছেন?

প্রবীণ সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, তারেক রহমানের চারপাশের লোকেরাই তাকে মিসগাইড করছে। সংসদে বা নীতি-নির্ধারণী ফোরামে তিনি যখন কার্যপ্রণালি বিধির বাইরে বা ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কথা বলেন, তখন বুঝতে হবে উপদেষ্টাদের এই ভুল পরামর্শই তার পতনের প্রথম ধাপ। দেশবাসী এখন সস্তা আবেগ নয়, বরং টেকসই উন্নয়ন, শৃঙ্খলা ও সুশাসন চায়।

ব্যক্তিপূজা ও গঠনমূলক সমালোচনার অভাব

বিএনপির ভেতরের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং চাটুকারিতা তারেক রহমানের পতনের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ কারণ হতে পারে। যেকোনো রাজনৈতিক দল যখন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়ে ব্যক্তিপূজা বা নেতাকে ‘অতিমানব’ বানানোর প্রবণতায় মেতে ওঠে, তখন সেই দলের পতন ত্বরান্বিত হয়। নেতার কোনো বিতর্কিত বক্তব্য বা প্রশাসনিক অদূরদর্শিতা সামনে এলে কর্মীরা গঠনমূলক সমালোচনা না করে কেবল অন্ধের মতো জয়ধ্বনি দিচ্ছেন। এই অতি-উৎসাহী চাটুকারিতা নেতার চোখ অন্ধ করে দেয়, আর পশ্চিমা শক্তিগুলো ঠিক এই সুযোগটির অপেক্ষাতেই থাকে।

আগামীর পথ: দুইধারী তলোয়ার

টাইম ম্যাগাজিনের এই তালিকায় স্থান পাওয়া মানে শুধু বিশ্বজুড়ে পরিচিতি নয়, বরং এটি এক বিশেষ নজরদারির অংশ। পশ্চিমা শক্তিগুলো এই স্বীকৃতির মাধ্যমে আসলে একটি বার্তাই দেয়—‘আমরা তোমাকে যেমন তুলতে পারি, তেমনি এক মুহূর্তে নামিয়েও দিতে পারি।’ এই স্বীকৃতির পরপরই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দিক থেকে বাংলাদেশের ওপর নতুন কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের চাপ আসাটা অস্বাভাবিক নয়।

ইতিহাস নির্মম, সে কাউকে ক্ষমা করে না। আজ যারা আনন্দে গামছা বেঁধে নাচছেন, কাল হয়তো তাদেরই চোখের জল ফেলতে হবে। তারেক রহমানের সামনে এখন দুটি পথ খোলা—হয় তাকে এই সস্তা জনপ্রিয়তার নেশা কাটিয়ে ও চাটুকারদের বলয় ভেঙে বস্তুনিষ্ঠ ও দূরদর্শী হতে হবে; নয়তো দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র এবং তোষামোদকারীদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে এমন এক পতনের দিকে এগোতে হবে, যেখান থেকে ফেরা অসম্ভব। তিনি কোন পথ বেছে নেবেন, সেটাই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামীর ভবিষ্যৎ।


এ জাতীয় আরো খবর...