শিরোনামঃ
এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব: ইউনিট প্রতি ১ টাকা ৮০ পয়সা কনকচাঁপা-বেবী নাজনীনসহ ৩৬ প্রার্থীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ আজ ইরানি কার্গো জাহাজ জব্দ করল যুক্তরাষ্ট্র, মার্কিন যুদ্ধজাহাজে তেহরানের পাল্টা ড্রোন হামলা মূল্যস্ফীতি, লোডশেডিং ও স্থবিরতার চরম সাঁড়াশি নিগড়ে দেশ টাইম ম্যাগাজিনের স্বীকৃতি: তারেক রহমানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্মান নাকি পতনের অশনিসংকেত? দেশজুড়ে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু লবণের রাজত্বে বিপন্ন জীবন: তৃষ্ণার্ত উপকূলে এক কলস পানির যুদ্ধ অলিগলি পেরিয়ে মূল সড়কে রাজত্ব: অনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রযানের কবলে বিপন্ন জননিরাপত্তা ও অর্থনীতি পাম্পে হাহাকার, অথচ উপচে পড়ছে ডিপো: দেশীয় প্রতিষ্ঠানের অকটেন নিচ্ছে না সরকার মাঠে অরক্ষিত কৃষক: বজ্রপাত রোধের কোটি টাকার প্রকল্পগুলো গেল কোথায়?
সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪২ পূর্বাহ্ন

লবণের রাজত্বে বিপন্ন জীবন: তৃষ্ণার্ত উপকূলে এক কলস পানির যুদ্ধ

বিশেষ প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬

চারপাশে থৈ থৈ করছে জলরাশি, প্রমত্তা নদী আর অনন্ত সমুদ্রের বিস্তৃতি। অথচ পানের যোগ্য এক ফোঁটা পানির জন্য চলছে মানুষের হাহাকার। শুনতে অবাক লাগলেও এটিই এখন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদের সবচেয়ে রূঢ় ও নির্মম বাস্তবতা। বৈশাখের খরতাপে পুড়ছে গোটা দেশ। আকাশ থেকে যেন আক্ষরিক অর্থেই আগুন ঝরছে। এই অস্বাভাবিক ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের কারণে উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকার পুকুর, খাল-বিল এমনকি নদীর পানিও শুকিয়ে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এমন এক বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে গেছে যে, গভীর নলকূপ চাপলেও এক ফোঁটা পানি উঠছে না।

প্রাকৃতিক এই দুর্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানবসৃষ্ট চরম অরাজকতা। প্রভাবশালী মহলের লোভ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াল থাবায় খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার লাখ লাখ মানুষের জীবনে সুপেয় পানি এখন এক অমূল্য রত্নে পরিণত হয়েছে। পানি সংগ্রহ করাটা উপকূলের মানুষের জন্য এখন আর কোনো সাধারণ দৈনন্দিন কাজ নয়; এটি আক্ষরিক অর্থেই বেঁচে থাকার এক কঠিন, নিরন্তর ও দুঃসহ সংগ্রাম।

এক কলস পানির সন্ধানে মাইলের পর মাইল হাঁটা

উপকূলের গ্রামগুলোতে ভোর হয় মানুষের পানির সন্ধানে বের হওয়ার তাগিদ নিয়ে। বিশেষ করে নারীদের জীবনে এই সংগ্রাম সবচেয়ে ভয়াবহ। পরিবারের সদস্যদের তৃষ্ণা মেটাতে এক কলস মিষ্টি পানির আশায় নারীদের প্রতিদিন প্রখর রোদে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে একটিমাত্র টিউবওয়েল বা ফিল্টারের সামনে।

খুলনার দাকোপ উপজেলার উড়াবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা সাথী বৈদ্যের কথায় এই চরম দুর্দশার চিত্র ফুটে ওঠে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, “আমাদের এলাকার হাজারো পরিবার সুপেয় পানির চরম সংকটে ভুগছে। লবণাক্ততা ও আর্সেনিকের কারণে চারপাশের কোনো পানিই আর মুখে দেওয়া যায় না। দিনের একটা বড় অংশই আমাদের কেটে যায় শুধু পানির খোঁজে। এক কলস পানি জোগাড় করতে গিয়ে আমাদের অন্যান্য সব কাজ বন্ধ রাখতে হয়।”

একই অবস্থা খুলনার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর এলাকার। সেখানকার বাসিন্দা রাজা গাজীর মতে, পানির অভাবে জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত। নদীর নোনা পানি আর শুকিয়ে যাওয়া পুকুরের কারণে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদটুকুই এখন হাতের নাগালের বাইরে।

ভৌগোলিক বিস্তৃতি: তেষ্টায় কাতর যেসব জনপদ

সুপেয় পানির এই হাহাকার কোনো একটি নির্দিষ্ট গ্রামে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পুরো উপকূলীয় বলয়ের চিত্র। খুলনার কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা ও বটিয়াঘাটা; বাগেরহাটের মোংলা, রামপাল, শরণখোলা ও মোড়েলগঞ্জ; এবং সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ উপজেলার মানুষ এই অমানবিক সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার।

বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার মহিষচরণী গ্রামের জুয়েল হাওলাদার জানান, তাদের এলাকার একটি পুকুরেও এখন আর মিষ্টি পানি অবশিষ্ট নেই। বাধ্য হয়ে মানুষ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে পান করছে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে সেই সংরক্ষিত পানি ফুরিয়ে গেলে মানুষের কষ্টের কোনো সীমা থাকে না। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের সোরা গ্রামের বাসিন্দা আশিকুর রহমান এক নির্মম অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা তুলে ধরে বলেন, “যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা বড় ট্যাংকে বর্ষার পানি ধরে রাখতে পারেন কিংবা কিনে খেতে পারেন। কিন্তু দরিদ্র মানুষের তো সেই সুযোগ নেই। ফলে শুষ্ক মৌসুম এলেই তাদের বাধ্য হয়ে পুকুরের কাদামিশ্রিত ও দূষিত পানি পান করতে হয়।”

মানবসৃষ্ট দুর্যোগ: বাগদা চিংড়ির লোভে ধ্বংস হচ্ছে মিষ্টি পানি

উপকূলের এই পানির সংকটের পেছনে প্রকৃতি যতটা না দায়ী, তার চেয়েও বেশি দায়ী মানুষের অন্ধ লোভ। স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, এই অঞ্চলে বাগদা চিংড়ি চাষের জন্য প্রভাবশালী ও অসাধু একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সরকারি স্লুইস গেট ও খাল-নদীর গেট অবৈধভাবে ব্যবহার করে লোকালয়ে লবণ পানি প্রবেশ করাচ্ছে।

চিংড়ির ঘের তৈরির জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে মিষ্টি পানির উৎসগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে একসময়ের উর্বর কৃষিজমি যেমন তার উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে চিরতরে পতিত জমিতে পরিণত হচ্ছে, তেমনি ধ্বংস হচ্ছে সুপেয় পানির প্রাকৃতিক আধারগুলো। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের বাণিজ্যিক স্বার্থের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা। লবণাক্ততার এই আগ্রাসন পুরো উপকূলীয় ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্রকে চরমভাবে ব্যাহত করছে, যার চূড়ান্ত মাশুল গুনছে সাধারণ মানুষ।

জলবায়ু পরিবর্তন ও গবেষকদের উদ্বেগ

পানি গবেষকরা এই সংকটকে একটি অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে লবণাক্ত পানি খুব সহজেই মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করছে। পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা বাড়ায় উপকূলীয় বাঁধগুলো ভেঙে লবণ পানি লোকালয়ে ঢুকে পানযোগ্য পানির উৎসগুলোকে নষ্ট করে দিচ্ছে।

খুলনা জলবায়ু অধিপরামর্শ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান মুকুল জানান, বর্তমানে তিন জেলার প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষ সুপেয় পানির অভাবে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি এই সংকটের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, “আগে উজানের নদীর পানির যে স্বাভাবিক প্রবাহ ছিল, তা সাগরের লবণাক্ত পানিকে ঠেলে দূরে সরিয়ে রাখত। কিন্তু এখন উজানের পানি মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় সমুদ্রের লবণ পানি খুব সহজেই দেশের ভেতরের নদীগুলোতে ঢুকে পড়ছে।”

পানিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাওসেড’ (AOSED)-এর নির্বাহী পরিচালক শামীম আরেফিনের দেওয়া পরিসংখ্যান পরিস্থিতি আরও ভয়াবহভাবে তুলে ধরে। তিনি জানান, উপকূলীয় এই তিন জেলার প্রায় ৫৫ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানির সংকটে ভুগছেন এবং এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক মানুষ বাধ্য হয়ে চড়া দামে পানি কিনে পান করছেন। দরিদ্র মানুষের জন্য যেখানে তিন বেলা খাবার জোগাড় করাই কঠিন, সেখানে প্রতিদিন পান করার জন্য পানি কেনা এক অকল্পনীয় অর্থনৈতিক বোঝা।

অকেজো প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

সাধারণত পানির স্তর নিচে নেমে গেলে গভীর নলকূপ বসিয়ে পানি তোলা হয়। কিন্তু উপকূলীয় অঞ্চলে এই প্রযুক্তিও এখন আর কাজে আসছে না। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম শামীম আহমেদ জানান, শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিকের তুলনায় দুই থেকে আড়াই ফুট নিচে নেমে যাচ্ছে। কিন্তু মূল সমস্যা হলো, এই অঞ্চলের অধিকাংশ স্থানে মাটির নিচে পানযোগ্য কোনো মিষ্টি পানির স্তরই নেই। ফলে গভীর নলকূপ বসালেও সেখান থেকে তীব্র লবণাক্ত পানি উঠছে, যা পানের অযোগ্য।

নিরাপদ পানির এই নিদারুণ অভাব উপকূলের জনস্বাস্থ্যের ওপর এক ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। তৃষ্ণা মেটাতে বাধ্য হয়ে মানুষ পুকুরের কাদামিশ্রিত, দূষিত ও লবণাক্ত পানি পান করছে। এমনকি রান্নাবান্না ও দৈনন্দিন কাজেও এই নোনা পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এর প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ ওই অঞ্চলে ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়ের মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এছাড়া লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে নারীদের মধ্যে চর্মরোগ এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটছে, যা একটি দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয়।

স্থায়ী সমাধানের খোঁজে

উপকূলের এই জীবনবিনাশী সংকট কেবল একটি মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি একটি ক্রমবর্ধনশীল ও দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কেবল সাময়িক ত্রাণ বা পানির ট্যাংক বিতরণ করলেই চলবে না; এর জন্য প্রয়োজন একটি বিজ্ঞানভিত্তিক, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় নীতিমালা।

প্রথমত, প্রভাবশালী চক্রের হাত থেকে স্লুইস গেটগুলোর নিয়ন্ত্রণ সাধারণ মানুষের হাতে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং চিংড়ি ঘেরে অবৈধভাবে লবণ পানি প্রবেশ করানো কঠোর আইনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের (Rainwater Harvesting) আধুনিক ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তি প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। তৃতীয়ত, নদী খনন এবং উজানের পানির প্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রাকৃতিক উপায়ে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে হবে।

পানি মানুষের জন্মগত ও সাংবিধানিক অধিকার। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এক ফোঁটা পানির জন্য মানুষের এই হাহাকার কোনোভাবেই একটি স্বাধীন ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের কাম্য হতে পারে না। এখনই যদি রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকরা এই মানবিক বিপর্যয়ের দিকে নজর না দেন, তবে অচিরেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই বিস্তীর্ণ জনপদ মানুষের বসবাসের সম্পূর্ণ অযোগ্য একটি বিরানভূমিতে পরিণত হবে।


এ জাতীয় আরো খবর...