শিরোনামঃ
সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০১:২১ অপরাহ্ন

মূল্যস্ফীতি, লোডশেডিং ও স্থবিরতার চরম সাঁড়াশি নিগড়ে দেশ

বিশেষ প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬

ভয়াবহ তাপদাহে যখন গোটা দেশের জনজীবন ওষ্ঠাগত, ঠিক তখনই মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে জ্বালানি তেলের আকস্মিক ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে উপসাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতির অজুহাতে সরকার গত শনিবার রাতে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম একলাফে অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। শুধু তরল জ্বালানিই নয়, চলতি মাসে ইতিমধ্যে দুই দফায় বাড়ানো হয়েছে রান্নার কাজে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম। বিশ্ববাজারের এই ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সরাসরি ও নির্মম প্রভাব এখন আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে কৃষি, শিল্প, পরিবহন ও টেলিযোগাযোগসহ সামষ্টিক অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে।

জ্বালানি তেলের এই ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো স্থবির হয়ে দেশজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের জন্ম দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি কলকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানিমুখী শিল্প চরম খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে অরাজকতা এবং নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন—সব মিলিয়ে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের মানুষ।

পাম্পে হাহাকার ও রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি

সরকারি ভাষ্যমতে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা শুরুর পর থেকেই সারা দেশের পেট্রোলপাম্পগুলোতে তেলের তীব্র সংকট দেখা দেয়। গত দেড় মাস ধরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত তেল পাচ্ছেন না সাধারণ গ্রাহকরা।

এরই মধ্যে শনিবার রাতে ঘোষণা করা হয় নতুন মূল্যতালিকা। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভোক্তাপর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকার এই বিশাল উল্লম্ফন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি ওলটপালট করে দিয়েছে।

মূল্যস্ফীতির রাহুগ্রাস: ১৩ শতাংশে পৌঁছানোর শঙ্কা

জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর চেইন রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক প্রভাব পড়ে বাজারের প্রতিটি পণ্যের ওপর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত ফেব্রুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৩ শতাংশ এবং মার্চ মাসে তা ছিল ৮.৭১ শতাংশ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, জীবনযাত্রাকে সহনীয় করতে সরকার যদি দ্রুত কোনো বিকল্প উদ্যোগ বা শুল্ক সমন্বয়ের পথে না হাঁটে, তবে মূল্যস্ফীতি অচিরেই ১৩ শতাংশে গিয়ে ঠেকতে পারে।

অথচ সরকারের নীতিনির্ধারকদের কণ্ঠে ভিন্ন সুর। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দাবি করেছেন, তেলের দাম ‘নগণ্যই’ বাড়ানো হয়েছে এবং এর ফলে মূল্যস্ফীতি খুব একটা বাড়বে না। অন্যদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ একে নিছক ‘দাম সমন্বয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা মোজাম্মেল হকের মতো সাধারণ নাগরিকদের প্রশ্ন, “আয় তো এক টাকাও বাড়েনি, কিন্তু বাজারে প্রতিটি জিনিসের দাম আগুন। এই বাড়তি ব্যয়ের জোগান আমরা কোথা থেকে দেব?”

খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষিতে অশনিসংকেত

তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে মর্মান্তিক শিকার হচ্ছেন দেশের প্রান্তিক কৃষকরা। দেশের কৃষি, সেচব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের প্রায় পুরোটাই ডিজেলনির্ভর। মোট ডিজেল আমদানির প্রায় ২০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় কৃষি খাতে, যার সবচেয়ে বড় অংশটি লাগে নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাসের বোরো মৌসুমে। বর্তমানে বোরো ধানে সেচ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি হলেও, লিটারে ১৫ টাকা দাম বাড়ায় এবং পাম্পে ডিজেল না পাওয়ায় কৃষকরা জমিতে পানি দিতে পারছেন না।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খানের মতে, জ্বালানি তেলের এই সংকট দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএসএআইডির পূর্বাভাস অনুযায়ী ধানের ফলন সাড়ে ৭ শতাংশ কমার কথা থাকলেও, ড. জাহাঙ্গীর আশঙ্কা করছেন এই উৎপাদন ঘাটতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। উৎপাদন খরচ বাড়লে বাজারে চালের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে, যার চূড়ান্ত মাশুল গুনতে হবে সাধারণ ভোক্তাকে।

শিল্পে ধস ও রপ্তানি হারানোর ভয়

একদিকে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং, অন্যদিকে ডিজেলের হাহাকার—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে দেশের শিল্প খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও নিটওয়্যার খাত চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। উৎপাদন সচল রাখতে কারখানা মালিকদের বাধ্য হয়ে চড়া মূল্যের ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা তাদের উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো এই বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে না পেরে উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে বিদেশি ক্রেতাদের নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। সময়মতো শিপমেন্ট না হলে ক্রেতা হারানোর পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে খেলাপি হওয়ার প্রবল ঝুঁকিতে পড়বেন।

ভাড়া নৈরাজ্য: সুযোগ সন্ধানী পরিবহন খাত

ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ার ঘোষণাকে পুঁজি করে পরিবহন খাতে শুরু হয়েছে ভয়াবহ নৈরাজ্য ও দরকষাকষি। ২০২২ সালে যখন ডিজেলের দাম লিটারে ৩৪ টাকা বেড়েছিল, তখন বাস ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল ২২.২২ শতাংশ। কিন্তু এবার মাত্র ১৫ টাকা বাড়লেও বাস মালিক সমিতি একলাফে ৬৪ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির অযৌক্তিক দাবি তুলেছে।

পিছিয়ে নেই নৌপরিবহন খাতও। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থা ইতিমধ্যে যাত্রীদের ভাড়া ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে বিআইডব্লিউটিএ-কে চিঠি দিয়েছে। অথচ বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে, বর্তমান দাম অনুযায়ী বাস ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি সর্বোচ্চ ১৫ পয়সা বাড়ানোই যৌক্তিক। পরিবহন খাতের এই সিন্ডিকেট ও নৈরাজ্য সাধারণ যাত্রীদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে।

অন্ধকারে দেশ: লোডশেডিংয়ের চরম ভোগান্তি

জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ খাতে। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদা যখন আকাশচুম্বী, তখন জ্বালানি অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পিডিবির তথ্যমতে, বর্তমানে দিনে ও রাতে গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। কিন্তু পিক আওয়ারে দেশজুড়ে ঘাটতি থাকছে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট। শহরাঞ্চলে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হলেও, গ্রামাঞ্চলে দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এই ভ্যাপসা গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও বয়স্করা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।

টেলিযোগাযোগ খাতে ব্ল্যাকআউটের শঙ্কা

বিদ্যুৎ না থাকার এই প্রভাব এবার গিয়ে পড়েছে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক অবকাঠামোতে। বিটিআরসির তথ্যমতে দেশে বর্তমানে মুঠোফোন গ্রাহকের সংখ্যা সাড়ে ১৮ কোটির বেশি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে মোবাইল অপারেটরদের বেজ ট্রান্সসিভার স্টেশন (বিটিএস) ও ডেটা সেন্টারগুলো পুরোপুরি জেনারেটরনির্ভর হয়ে পড়েছে।

অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব জানিয়েছে, সারা দেশে নেটওয়ার্ক সচল রাখতে প্রতিদিন প্রায় ৫২ হাজার লিটার ডিজেল ও ১৯ হাজার লিটার অকটেন পোড়াতে হচ্ছে। ডেটা সেন্টারের জন্য লাগছে আরও ২৭ হাজার লিটার ডিজেল। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ লিটার জ্বালানি শুধু টেলিকম খাতেই প্রয়োজন হচ্ছে। অ্যামটব ইতিমধ্যে বিটিআরসিকে জরুরি চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছে যে, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে দ্রুতই দেশের প্রান্তিক ও শহরাঞ্চলে নেটওয়ার্ক ব্ল্যাকআউট, কল ড্রপ এবং ইন্টারনেট ধীরগতির মতো ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে।

বিশেষজ্ঞদের কড়া সমালোচনা ও সমাধান

অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ এই পুরো পরিস্থিতির জন্য সরকারের অদূরদর্শী নীতিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তিনি বলেন, “আইএমএফের পরামর্শে ভর্তুকি তুলে দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা হচ্ছে। বিশ্ববাজারে যখন জ্বালানি তেলের দাম অনেক কম ছিল, তখন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। সেই জমানো টাকা থেকে এখন ভর্তুকি দিলে জনগণকে এই ভোগান্তি পোহাতে হতো না। কিন্তু সেই টাকা কোথায় গেল, তার কোনো হিসাব নেই।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে অবহেলা এবং আমদানিনির্ভর ভ্রান্ত নীতির কারণেই আজ দেশকে এই চরম মূল্য চোকাতে হচ্ছে। সংকট কাটাতে তিনি জ্বালানির অপচয় রোধ, বিলাসী ব্যবহার পরিহার এবং দেশীয় ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অজুহাত দিয়ে হয়তো সাময়িকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দেওয়া যায়, কিন্তু অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব, লাগামহীন দুর্নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতির অনুপস্থিতিই যে আজকের এই ভয়াবহ সংকটের মূল কারণ, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। সাধারণ মানুষের পিঠ ইতিমধ্যে দেয়ালে ঠেকে গেছে। সরকার যদি এখনই কার্যকর, সমন্বিত এবং জনবান্ধব কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে, তবে এই জ্বালানি সংকটের দাবানল অচিরেই দেশের পুরো আর্থসামাজিক কাঠামোকে ভস্মীভূত করে দেবে।


এ জাতীয় আরো খবর...