শিরোনামঃ
লবণের রাজত্বে বিপন্ন জীবন: তৃষ্ণার্ত উপকূলে এক কলস পানির যুদ্ধ অলিগলি পেরিয়ে মূল সড়কে রাজত্ব: অনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রযানের কবলে বিপন্ন জননিরাপত্তা ও অর্থনীতি পাম্পে হাহাকার, অথচ উপচে পড়ছে ডিপো: দেশীয় প্রতিষ্ঠানের অকটেন নিচ্ছে না সরকার মাঠে অরক্ষিত কৃষক: বজ্রপাত রোধের কোটি টাকার প্রকল্পগুলো গেল কোথায়? চল্লিশ পেরোলেই খাদ্যাভ্যাসে চাই বাড়তি নজর: সুস্থ থাকতে পুরুষদের যা খাওয়া জরুরি বাবার হাজার কোটি টাকায় মোহ নেই, লন্ডনে সাধারণ চাকরি করেন অক্ষয়-পুত্র প্রধানমন্ত্রী ও জাইমা রহমানকে বাফুফেতে আমন্ত্রণ জানালেন অধিনায়ক আফিদা হাম-রুবেলার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কাল থেকে সারা দেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু আ. লীগকেও পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া উচিত: রাশেদ খান জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে আইএমএফের শর্তের কোনো সম্পর্ক নেই: অর্থমন্ত্রী
সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১৪ পূর্বাহ্ন

অলিগলি পেরিয়ে মূল সড়কে রাজত্ব: অনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রযানের কবলে বিপন্ন জননিরাপত্তা ও অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬

রাজধানী ঢাকার বর্তমান চিত্রপটের দিকে তাকালে যে কারও মনে হতে পারে, এই শহরে হয়তো মানুষের চেয়ে যন্ত্রযানের সংখ্যাই বেশি। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা ত্রিচক্রযানের যে মাত্রাতিরিক্ত আধিক্য চোখে পড়ে, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। একসময় এই যানগুলো কেবল শহরতলির সরু অলিগলি বা নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। পাড়া-মহল্লার গণ্ডি পেরিয়ে রাজধানীর প্রধান সড়ক, ভিআইপি রোড থেকে শুরু করে মহাসড়ক—সব জায়গাতেই এখন এসব যন্ত্রযানের একচেটিয়া এবং বেপরোয়া রাজত্ব। এলাকাভিত্তিক সংযোগ সড়কে চলাচলের জন্য কিছু ক্ষেত্রে শিথিলতা থাকলেও, আইন ও নিয়মের তোয়াক্কা না করে মূল সড়কে এদের অবাধ বিচরণ সাধারণ মানুষের মনে চরম উদ্বেগ, বিরক্তি ও আতঙ্ক তৈরি করেছে।

রাজধানী ছাড়িয়ে দেশজুড়ে চরম ভোগান্তি

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার এই দাপট এখন আর কেবল রাজধানীর গণ্ডিতে আটকে নেই; এটি বর্তমানে একটি জাতীয় সমস্যায় রূপ নিয়েছে। দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও এই যানটি ছড়িয়ে পড়েছে। মহাসড়কগুলোতে তিন চাকার ধীরগতির যান চলাচল নিষিদ্ধ থাকলেও, বাস্তবে সেই নিষেধাজ্ঞার কোনো প্রতিফলন নেই। দ্রুতগামী দূরপাল্লার বাস বা ট্রাকের পাশ দিয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে এসব অটোরিকশা চলাচল করছে। এর ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা, ঝরছে অসংখ্য তাজা প্রাণ।

শহরাঞ্চলে এই অটোরিকশা যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে-সেখানে পার্কিং, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং ট্রাফিক আইনের ন্যূনতম তোয়াক্কা না করার ফলে দেশের সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থা এক চরম বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ পথচারী ও নিয়মিত যাত্রীরা এই দৌরাত্ম্যে রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠেছেন। জনমনে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এই লাগামহীন বিশৃঙ্খলার শেষ কোথায়? কে টানবে এই বেপরোয়া যানের লাগাম? আর কবেই বা আইনি কাঠামোর কঠোর প্রয়োগ দৃশ্যমান হবে?

নীতিমালার অভাব ও মাঠপর্যায়ের হতাশা

দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার এই দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ ছিলেন রাজধানীবাসী। যানজট নিরসন ও দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন সময় নানা উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও তার কোনোটিরই সফল বাস্তবায়ন হয়নি। বিশেষ করে, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে একটি আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে অনুমোদিত ও অপেক্ষাকৃত নিরাপদ নতুন মডেলের ব্যাটারি রিকশা নামানোর একটি প্রস্তাবনা সামনে আসে। একই সঙ্গে এসব যান চলাচলের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের কথাও বলা হয়েছিল, যাতে রুট নির্ধারণ ও গতি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, নীতিমালার সেই খসড়া বা উদ্যোগগুলো কেবল কাগজের পাতাতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। মাঠপর্যায়ে এর কোনো দৃশ্যমান বা ইতিবাচক প্রভাব আজ পর্যন্ত লক্ষ করা যায়নি। বুয়েট অনুমোদিত নিরাপদ মডেলের বদলে সেই পুরনো, নড়বড়ে এবং অনিরাপদ কাঠামোর অটোরিকশাগুলোই এখনো সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন অবৈধ রিকশা রাস্তায় নামলেও তা দেখার যেন কেউ নেই।

কাঠামোগত ত্রুটি ও অনভিজ্ঞ চালক: রাজপথের নীরব ঘাতক

এই ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোর গঠনগত দিকটি অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ। প্যাডেলচালিত রিকশার কাঠামোতে ভারী ব্যাটারি ও মোটর যুক্ত করে এগুলো তৈরি করা হয়। ফলে এর ভারসাম্য বা ব্যালেন্সিং সিস্টেম খুবই দুর্বল থাকে। সামান্য গতিতে ব্রেক কষলেই বা একটু খানাখন্দে পড়লেই এগুলো উল্টে যায়।

এর চেয়েও বড় শঙ্কার বিষয় হলো এসব যানের চালকদের যোগ্যতা। এই রিকশা চালানোর জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় না। ফলে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্ক এবং ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ব্যক্তিরাও অবলীলায় এই যান নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ছেন। সিগন্যাল অমান্য করা, উল্টোপথে গাড়ি চালানো এবং ওভারটেক করার বেপরোয়া প্রবণতার কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। এদের ধাক্কায় অনেক পথচারী গুরুতর আহত হচ্ছেন, এমনকি পঙ্গুত্ব বরণের মতো ঘটনাও অহরহ ঘটছে।

বিদ্যুৎ চুরি, অনিরাপদ চার্জিং ও অগ্নিঝুঁকি

অটোরিকশার দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ রাজধানীর বাসিন্দারা কেবল সড়ক নিরাপত্তা নিয়েই শঙ্কিত নন, বরং এদের চার্জ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও বিস্তর ও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। এই যানগুলোর জন্য কোনো বৈধ বা সুনির্দিষ্ট চার্জিং স্টেশন নেই। ফলে জনাকীর্ণ স্থান, আবাসিক এলাকার গ্যারেজ, এবং বস্তিগুলোতে সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে বিদ্যুতের মূল লাইন থেকে সংযোগ নিয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে এসব অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে।

এই প্রক্রিয়ায় একদিকে যেমন জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতিদিন মেগাওয়াট মেগাওয়াট বিদ্যুতের অবৈধ চুরি ও অপচয় হচ্ছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঝুঁকি। মানহীন তার ও সস্তা চার্জার ব্যবহারের কারণে প্রায়শই শর্টসার্কিট হচ্ছে। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাতের বেলায় অটোরিকশার গ্যারেজে আগুন লাগা এবং ব্যাটারি বিস্ফোরণের একাধিক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। জনবহুল এলাকায় এমন একটি গ্যারেজে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটলে তা মুহূর্তের মধ্যে আশপাশের আবাসিক ভবনগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা এক বিশাল মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

নেপথ্যের সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজির অর্থনীতি

এত অভিযোগ ও দুর্ঘটনার পরও এই রিকশাগুলো কীভাবে দিনের পর দিন রাস্তায় চলছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর নেপথ্যে রয়েছে এক বিশাল ও শক্তিশালী সিন্ডিকেট। পাড়া-মহল্লার প্রভাবশালী নেতা, অসাধু জনপ্রতিনিধি এবং আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশে এই অবৈধ বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি রিকশা থেকে দৈনিক বা মাসিক ভিত্তিতে নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা আদায় করা হয়। টোকেন বা বিশেষ স্টিকারের মাধ্যমে এই চাঁদাবাজি চলে। মূলত এই বিশাল অঙ্কের অবৈধ টাকার ভাগাভাগির কারণেই এই যানগুলোকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ বা উচ্ছেদ করা সম্ভব হচ্ছে না।

জীবিকার সংকট বনাম শহরের স্থবিরতা

পরিবহন বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা এই সমস্যার একটি ভিন্ন দিকের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। বর্তমানে দেশে লাখ লাখ মানুষের জীবিকা এই ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ করে এগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে বিশাল একটি জনগোষ্ঠী রাতারাতি কর্মহীন হয়ে পড়বে, যা সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মসংস্থানের দোহাই দিয়ে একটি শহরের সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থা ও কোটি মানুষের নিরাপত্তাকে জিম্মি করে রাখার কোনো সুযোগ নেই। বৃহত্তর জনস্বার্থে এর একটি কঠোর নিয়ন্ত্রণ, সংস্কার ও ব্যবস্থাপনা জরুরি।

সমাধানের রূপরেখা

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে অবিলম্বে কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, প্রধান সড়ক ও মহাসড়কগুলোতে এই রিকশা চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বুয়েট অনুমোদিত নিরাপদ মডেল দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাজারজাত করে পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ রিকশাগুলো পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

তৃতীয়ত, অবৈধ গ্যারেজগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে অভিযান জোরদার করতে হবে এবং বৈধ, নিরাপদ ও প্রিপেইড মিটারযুক্ত চার্জিং স্টেশন স্থাপনের নীতিমালা তৈরি করতে হবে। সর্বোপরি, এই খাতের সঙ্গে জড়িত চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটকে ভেঙে দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সড়ক একটি শহরের প্রাণরেখা। সেই সড়ক যদি অনিয়ন্ত্রিত ও বেপরোয়া যানের দখলে চলে যায়, তবে শহরের গতিশীলতা ও নিরাপত্তা দুটোই মুখ থুবড়ে পড়বে। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে একযোগে এই বিশৃঙ্খলার লাগাম টানতে হবে। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও ভোগান্তি অচিরেই এক ভয়াবহ নাগরিক সংকটের জন্ম দেবে।


এ জাতীয় আরো খবর...