জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির কশাঘাতে সাধারণ মানুষের পিঠ যখন এমনিতেই দেয়ালে ঠেকে গেছে, ঠিক তখনই জনজীবনে নেমে আসতে পারে আরও একটি বড় আঘাত। এবার আবাসিক গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর একটি প্রস্তাবনা তৈরি করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
মাত্র ১৮ দিনের ব্যবধানে দুই দফায় এলপিজির দাম বৃদ্ধি এবং সম্প্রতি সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বিদ্যুতের এই সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি দেশের সাধারণ মানুষের জন্য আক্ষরিক অর্থেই ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ নাগরিকরা।
দিশেহারা জনজীবন: আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পাহাড়
বৈশ্বিক সংকটের দোহাই দিয়ে দেশে বর্তমানে ইতিহাসের সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে জ্বালানি তেল। পরিবহন থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের বাজার—সবখানেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বাজারে প্রতিটি জিনিসের দাম হু হু করে বাড়লেও, সাধারণ মানুষের আয় এক পয়সাও বাড়েনি।
এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ার খবরে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে জনমনে। সাধারণ ভোক্তাদের আশঙ্কা, বিদ্যুতের দাম বাড়লে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাড়িভাড়া, দোকানভাড়া এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্রের ওপর। ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার ভাড়াটিয়াদের মতে, এমনিতেই গ্যাস ও নিত্যপণ্যের দামের কারণে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে, এর ওপর বিদ্যুৎ বিল বাড়লে ঢাকা শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
ঘাটতির পাহাড় ও পিডিবির প্রস্তাবনা
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সম্ভাব্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক ঘাটতি সামাল দিতেই মূলত গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের তৈরি করা সারসংক্ষেপে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) তিনটি বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরেছে:
ভর্তুকি কমানোর লক্ষ্য: পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে ৫ হাজার থেকে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত সরকারি ভর্তুকি কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আবাসিক গ্রাহকদের ওপর প্রভাব: ‘লাইফলাইন গ্রাহক’ (যাঁরা অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন) ব্যতীত অন্যান্য সকল আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ বিল ৭০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
যে প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে সিদ্ধান্ত
বিদ্যুৎ বিভাগের এই প্রস্তাবনাটি প্রথমে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভার সবুজ সংকেত বা অনুমোদন পাওয়ার পর প্রস্তাবটি চূড়ান্ত পর্যালোচনার জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) পাঠানো হবে।
অবশ্য পিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম সাধারণ মানুষকে এখনই আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে জানিয়েছেন, “বিষয়টি এখনো অত্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।”
অন্যদিকে, বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের এই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে অর্থমন্ত্রীকে প্রধান করে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের নথিতে উল্লেখ রয়েছে যে, আগামী দুই বছরের মধ্যে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর একটি পূর্বপরিকল্পনা সরকারের ছিল। কিন্তু চলমান বৈশ্বিক সংকট, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক ঘাটতি কমিয়ে আনতেই সরকারকে এখন বাধ্য হয়ে এই বিকল্প চিন্তা করতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মত: দাম না বাড়িয়ে অপচয় রোধের তাগিদ
বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এই সরকারি উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দাম না বাড়িয়ে বিদ্যুৎ খাতের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, অপচয় ও অযৌক্তিক ব্যয় কমিয়েই এই ঘাটতি সমন্বয় করা সম্ভব।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, “বিদ্যুৎ খাতে ঘাটতি বাড়ার মূল কারণ হলো লাগামহীন অপচয় ও অযৌক্তিক ব্যয়। সবার আগে এই ব্যয়ের উৎসগুলো খুঁজে বের করে সেগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।”
তিনি আরও কয়েকটি গঠনমূলক প্রস্তাব তুলে ধরে বলেন:
প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণ: মুনাফার হিসাব বাদ দিয়ে বিদ্যুতের প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ করতে হবে। আগে ঘাটতির প্রকৃত চিত্র স্বচ্ছভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।
কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের সদ্ব্যবহার: সরকার যদি কয়লার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করা যায়, তবে বড় অঙ্কের উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র এই খাত থেকেই প্রায় ৩০০ কোটি টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় করা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, সামষ্টিক অর্থনীতির এই চরম সংকটময় মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর মতো জনবিরোধী সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কতটা বিপর্যস্ত করবে এবং মূল্যস্ফীতির আগুনে কতটা ঘি ঢালবে, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের আরও গভীর ও মানবিক পর্যালোচনার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।