শিরোনামঃ
সিংগাইরে সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী সন্তানের বয়স ১৮ থেকে ২৪: বাবা-মায়ের জন্য ১০টি পরামর্শ শিশু ইরা মনি হত্যা মামলার রায় পেছাল সমুদ্রবন্দরে তিন নম্বর সংকেত বহাল সারাদেশে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা অর্থমন্ত্রীর অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন: তথ্য উপদেষ্টা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে কোমে খামেনির জানাজা সম্পন্ন স্পেনের কাছে হারের পর পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজের পদত্যাগ চিকিৎসাকে বিশেষ সুবিধা নয় অধিকার ভাবার আহ্বান জুবাইদা রহমানের
বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ১২:২০ পূর্বাহ্ন

টিকা নেই, বাড়ছে জলাতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬০ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬

রাস্তাঘাটে চলতে-ফিরতে হঠাৎ করেই ধেয়ে আসছে বেওয়ারিশ কুকুর। হাতের খাবার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা থেকে শুরু করে বিনা প্ররোচনায় ঝাঁপিয়ে পড়ছে পথচারী ও শিশুদের ওপর। রাজধানীতে কুকুরের কামড় ও আঁচড়ে আহত মানুষের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, যার হাত ধরে জনস্বাস্থ্যে এক নতুন ও ভয়ংকর আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাণঘাতী ‘জলাতঙ্ক’ বা র‍্যাবিস (Rabies)।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যে টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে এই ভয়াবহ রোগটি নিয়ন্ত্রণের কথা, অর্থ সংকট ও কর্তৃপক্ষের চরম সমন্বয়হীনতার কারণে সেই কর্মসূচি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। ফলে একপ্রকার বিনা সুরক্ষাতেই চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

এক টুকরো খাবারের লোভে শিশুর ওপর হামলা

সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরখানে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এই আতঙ্কের ভয়াবহতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তিন বছর বয়সী এক ফুটফুটে শিশু বাড়ির সামনে হাতে খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ একটি বেওয়ারিশ কুকুর খাবারের লোভে তেড়ে এসে শিশুটির হাতে কামড় বসিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে আনন্দমুখর পরিবেশ রূপ নেয় চরম আতঙ্কে।

রক্তাক্ত ও আতঙ্কিত শিশুটিকে দ্রুত মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে (আইডিএইচ) নেওয়া হয় এবং জরুরি ভিত্তিতে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হয়। শিশুর বাবা আতঙ্কিত কণ্ঠে জানান, “কুকুরটি কোথা থেকে হঠাৎ ছুটে এলো তা টেরই পাইনি। চোখের পলকে এমন ঘটনা ঘটবে, তা ছিল কল্পনাতীত।”

ভয়াবহ পরিসংখ্যান: বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা

উত্তরখানের এই ঘটনা এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়; এটি রাজধানীর নিত্যদিনের বাস্তবতা। মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের দেওয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে কুকুরের আক্রমণের এক শিউরে ওঠার মতো চিত্র পাওয়া যায়:

  • ২০২৩ সাল: কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণে চিকিৎসা নিয়েছিলেন প্রায় ৯৪ হাজার মানুষ।

  • ২০২৪ সাল: এই সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজারে।

  • ২০২৫ সাল: আক্রান্তের সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ১ লাখ ৪৬ হাজার ছাড়িয়ে যায়।

  • ২০২৬ সাল: চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত (মাত্র আড়াই মাসে) ৩৬ হাজারের বেশি মানুষ কুকুরের কামড়ের শিকার হয়ে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন।

আক্রান্তের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জলাতঙ্কে মৃত্যুর মিছিল। এই রোগটি এতটাই ভয়ংকর যে, একবার লক্ষণ প্রকাশ পেলে রোগীর শতভাগ মৃত্যু নিশ্চিত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে ২০২৩ সালে ৪২ জন, ২০২৪ সালে ৫৮ জন এবং ২০২৫ সালে ৫৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। আর চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসেই প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন। চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক রোগী অবহেলা করে দেরিতে হাসপাতালে আসেন, যা তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি নিশ্চিত করে দেয়। বিশেষ করে শিশুদের উচ্চতা কম হওয়ায় কুকুর সহজেই তাদের মুখমণ্ডল বা ঘাড়ে কামড় দেয়, যা সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক।

কেন এই বিপর্যয়? বন্ধ টিকাদান ও বন্ধ্যাকরণ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি কর্তৃপক্ষের অবহেলা এবং সমন্বিত টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়াকে দায়ী করছেন। ২০১০ সাল থেকে দেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং সিটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে কুকুরের টিকাদান, জন্মনিয়ন্ত্রণ (বন্ধ্যাকরণ) এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির একটি সমন্বিত ও সফল কর্মসূচি চালু ছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) বিজ্ঞানভিত্তিক গাইডলাইন অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় টানা তিন বছর যদি অন্তত ৭০ শতাংশ কুকুরকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দেওয়া যায়, তবে সেই এলাকায় জলাতঙ্কের ঝুঁকি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ২০২৪ সালের পর থেকে অর্থ সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সংস্থাগুলোর মধ্যকার চরম সমন্বয়হীনতার কারণে এই যুগান্তকারী কার্যক্রম কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে।

সিটি করপোরেশন ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দায়সারা ভাব

রাজধানীতে বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে কোনো কার্যকর উদ্যোগই মাঠে নেই। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) জানিয়েছে, আগে নিয়মিত কুকুরের বন্ধ্যাকরণ বা ভ্যাসেকটমি করা হলেও বর্তমানে তা একেবারেই সীমিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) দাবি, প্রয়োজনীয় জনবল ও কারিগরি সক্ষমতার অভাবে তারা এই বিশাল সংখ্যক কুকুরের বন্ধ্যাকরণ ও টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না।

সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্র প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের। দেশের প্রাণী স্বাস্থ্যের দেখভালের মূল দায়িত্বে থাকা এই সরকারি সংস্থাটির পক্ষ থেকেও বর্তমানে কুকুর নিয়ন্ত্রণে কোনো সক্রিয় বা দৃশ্যমান কর্মসূচি নেই। এক সংস্থা অন্য সংস্থার ঘাড়ে দায় চাপিয়েই যেন নিজেদের দায়িত্ব শেষ করছে।

সমাধান কোন পথে?

বিশেষজ্ঞ এবং প্রাণী অধিকারকর্মীরা মনে করেন, নির্বিচারে কুকুর নিধন কখনোই এই সমস্যার বিজ্ঞানসম্মত বা মানবিক সমাধান হতে পারে না। ইতিহাস প্রমাণ করে, কুকুর মেরে জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এর একমাত্র কার্যকর সমাধান হলো—দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফের সমন্বিত ‘ম্যাস ডগ ভ্যাক্সিনেশন’ (MDV) বা ব্যাপকভিত্তিক টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা।

কুকুর আমাদের ইকোসিস্টেমের একটি অংশ। তাদের ওপর দোষ চাপিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে অচিরেই জলাতঙ্ক একটি মহামারির রূপ নেবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সিটি করপোরেশনগুলোকে তাদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ইগোর লড়াই ভুলে অবিলম্বে এক টেবিলে বসতে হবে। প্রতিটি বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকার আওতায় আনার পাশাপাশি তাদের বন্ধ্যাকরণ নিশ্চিত করা গেলেই কেবল এই মৃত্যুফাঁদ থেকে রাজধানী ও এর বাসিন্দাদের সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। নতুবা কুকুরের কামড়ে মৃত্যুর এই দীর্ঘ মিছিল থামানো যাবে না।


এ জাতীয় আরো খবর...