বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৯ অপরাহ্ন

পাম্পে তালা, মাঠ চৌচির: খাদ্য সংকটের অশনিসংকেত

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬

একদিকে তীব্র তাপপ্রবাহের দাবদাহ, অন্যদিকে ভয়াবহ লোডশেডিং এবং দেশব্যাপী এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা তীব্র জ্বালানি সংকট—সব মিলিয়ে দেশের কৃষি খাতে এক নজিরবিহীন বিপর্যয় নেমে এসেছে। বিশেষ করে চলতি বোরো মৌসুমে সেচ কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় কৃষকের কপালে এখন চিন্তার গভীর ভাঁজ। দাম বাড়লেও মিলছে না প্রয়োজনীয় ডিজেল। জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুতের অভাবে সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার সেচ পাম্প সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে আছে। ধানের থোড় ও ফুল আসার এই স্পর্শকাতর সময়ে জমিতে পানি দিতে না পেরে চোখের সামনে ফসল নষ্ট হতে দেখছেন কৃষকরা।

মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি বলছে, ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাহিদামাফিক ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। খোলা বাজারে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি লিটার ১৫-২০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হলেও তা কৃষকের নাগালে নেই। জ্বালানির এই আকাশচুম্বী দামের কারণে বিঘাপ্রতি সেচ খরচ আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে। অন্যদিকে, দিনে-রাতে সমানতালে চলা লোডশেডিংয়ের কারণে ইলেকট্রিক পাম্পগুলোও চালানো যাচ্ছে না। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সেচ ব্যবস্থা সচল করতে না পারলে জাতীয় বোরো উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসতে পারে, যা খাদ্য মজুত ও বাজার ব্যবস্থায় ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে।

রাজশাহী: শ্যালোমেশিন মাথায় করে পাম্পে ছুটছেন চাষিরা

রাজশাহী অঞ্চলে সেচ সংকটের চিত্র অত্যন্ত করুণ। জেলার ৪৬টি তেলের পাম্পের মধ্যে বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র ৮-১০টিতে তেল বিক্রি হচ্ছে, বাকিগুলো বন্ধ। যেসব পাম্প খোলা থাকছে, সেখানে কৃষকদের দীর্ঘ লাইন। অনেকেই শ্যালোমেশিন মাথায় নিয়ে বা ভ্যানে করে সরাসরি পাম্পে চলে আসছেন। বালানগর ও কালচিকার বোরো চাষি কালাম ও কোরবান আলী জানান, পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। পাইপ বিছিয়ে রেখেও সেচ দেওয়া যাচ্ছে না কারণ বিদ্যুৎ নেই।

কৃষক সাখাওয়াত মিঞা জানান, ফিলিং স্টেশন থেকে মাত্র ২০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে, যা দিয়ে তিন ঘণ্টাও মেশিন চলে না। অথচ জমিতে অন্তত ৯ ঘণ্টা পানি দেওয়া প্রয়োজন। পদ্মা অয়েল কোম্পানির সহকারী মহাব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, বিপিসি থেকে ওয়াগনে তেল আসা বন্ধ থাকায় ডিলারদের তিনগুণ ব্যয়ে সড়কপথে তেল আনতে হচ্ছে, ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

কক্সবাজার: অচল ৪ হাজার সেচ পাম্প

চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়া এবং ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে কক্সবাজার জেলায় কৃষিতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলার ৯টি উপজেলায় ৭ হাজার ১৪৬টি সেচ পাম্পের মধ্যে বর্তমানে ৪ হাজার ২০০টির বেশি পাম্প ডিজেল সংকটে বন্ধ রয়েছে। ফলে ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। চকরিয়া উপজেলায় পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। উখিয়ার সোনাইছড়ি এলাকার কৃষক মোক্তার মিয়া জানান, সময়মতো সেচ দিতে না পারলে আর্থিকভাবে তারা পথে বসে যাবেন।

বরিশাল: তরমুজ ও বোরো নিয়ে উৎকণ্ঠা

বরিশাল কৃষি অঞ্চলে প্রায় ৪ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ও তরমুজের আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ১৮ লাখ টন চাল উৎপাদন। কিন্তু এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা এখন ডিজেল সংকটের মুখে। অঞ্চলে প্রায় ৮৭ হাজার সেচ পাম্প চালু রয়েছে, যার মধ্যে ৭৪ হাজারই ডিজেলচালিত। এসব চালাতে প্রতিদিন ৫ লাখ লিটারের বেশি ডিজেল প্রয়োজন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. নজরুল ইসলাম সিকদার জানান, ১৫ মে পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন সেচ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অত্যন্ত কঠিন হবে।

জামালপুর ও ময়মনসিংহ: বুকচেরা হাহাকার

জামালপুরে ফজরের নামাজের পর থেকেই ডিজেলের জন্য কৃষকদের লাইনে দাঁড়াতে দেখা যায়। পানির অভাবে জমির মাটি শুকিয়ে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। ধানের চারা লালচে হয়ে মরে যাচ্ছে। স্থানীয় কৃষক আজমত আলী অভিযোগ করে বলেন, শাকসবজি, পেঁয়াজ, রসুন ও বোরো আবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

একই অবস্থা ময়মনসিংহ অঞ্চলে। হালুয়াঘাটের কৃষক আব্দুল করিম জানান, আগে দিনে ২-৩ বার পানি দিতে পারতেন, এখন বিদ্যুতের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। ডিজেল দিয়ে সেচ দিতে গিয়ে খরচও দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। নান্দাইলের সেচ পাম্প মালিকরা জানান, দিনে ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

রংপুর ও দিনাজপুর: বোরো ক্ষেত ফেটে চৌচির

উত্তরাঞ্চলের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত রংপুর ও দিনাজপুরে সেচের অভাবে বোরো ক্ষেত ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। রংপুরে বেশিরভাগ সেচ ব্যবস্থা ডিজেলনির্ভর। কিন্তু বর্তমানে দুই-তিন লিটারের বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না পাম্পগুলো থেকে। জেলায় এক লাখ ৩২ হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও, পানির অভাবে তা ভেস্তে যেতে বসেছে। দিনাজপুরের কাহারোল ও বীরগঞ্জের কৃষকরা জানান, তারা রাত জেগে তেলের লাইনে দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফিরছেন।

চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা: সবজি ও ফলের বাগান নষ্টের শঙ্কা

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় আখ, কলা, সবজি ও ড্রাগন ফলের বাগান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। নদীর পাড় ঘেঁষা জমিতেও সেচ পাম্প চালানোর মতো ডিজেল নেই। ফটিকছড়ির কৃষক মো. সোহেল বলেন, “চোখের সামনে ধারদেনা করে করা আখের ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”

কুমিল্লার প্রতিটি উপজেলায় বোরো ধানে এখন শিষ বের হয়েছে। এই সময়ে লোডশেডিং কৃষকদের চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে। বুড়িচং উপজেলার সেচ পাম্প মালিক জসিম উদ্দিন জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৭-৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, ফলে গোমতী নদী থেকে পানি তুলে সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

খুলনা ও সাতক্ষীরা: উপকূলীয় কৃষিতে স্থবিরতা

খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে সেচ অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। ডুমুরিয়ার কৃষক আব্দুর রহমান জানান, পেট্রোল পাম্পগুলোতে গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো পাত্রে তেল দেওয়া হচ্ছে না। অথচ এই মুহূর্তে সেচ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সাতক্ষীরার তালা উপজেলার কৃষকরাও একই অভিযোগ করেছেন।

গোপালগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ: শুকিয়ে যাচ্ছে ধানের চারা

গোপালগঞ্জে প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ায় অনেক জমিতে সেচ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. মামুনুর রহমান জানান, জেলায় ৮২ হাজার ৫৮৮ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে, যা এখন সেচের অভাবে ঝুঁকির মুখে। মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি ও সদর উপজেলার চরাঞ্চলের কৃষকরা জানান, তেলের অভাবে ধানের চারা শুকিয়ে যাচ্ছে। পুরো পরিশ্রম বৃথা যাওয়ার শঙ্কায় তারা দিন পার করছেন।

সিলেট ও সুনামগঞ্জ: হাওরাঞ্চলেও সেচ সংকট

হাওরাঞ্চলের জেলা সিলেট ও সুনামগঞ্জেও এই সংকটের ঢেউ লেগেছে। সাধারণত হাওর এলাকায় সেচের চাহিদা কম থাকলেও, উঁচু জমিগুলোতে বোরো আবাদে ডিজেল পাম্পের ওপর ভরসা করতে হয়। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের কৃষকরা জানান, হাওরের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় এখন পাম্পের সাহায্য নিতে হচ্ছে, কিন্তু ডিজেল না মেলায় ফসল বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। বোরো ধান দেশের মোট চাল উৎপাদনের একটি বিশাল অংশ জোগান দেয়। ঠিক এমন একটি স্পর্শকাতর সময়ে সেচ ব্যবস্থা ভেঙে পড়াটা কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং এটি পুরো দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি অশনিসংকেত। জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এখনই জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। ফুয়েল কার্ড বা কৃষি অফিসের প্রত্যয়নপত্র দিয়ে সেচ পাম্পের জন্য ডিজেল সরবরাহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত না করা গেলে, আগামী দিনে দেশ এক ভয়াবহ খাদ্য সংকটের মুখে পড়তে পারে।


এ জাতীয় আরো খবর...