শিরোনামঃ
মতুয়া চমক: রূপকথা নাকি সাজানো প্ল্যান? বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: ৫৬ হাজার কোটির দায় কেন জনগণের কাঁধে? লোগো নকল, দাম আকাশছোঁয়া: সংসদের কেনাকাটায় এ কোন জাদুকরি হিসাব? তীব্র গরমে হঠাৎ ঘাম বন্ধ? হিট স্ট্রোক নয় তো! অবশেষে বোনদের পথ ধরে হজে যাচ্ছেন চম্পা অনুমতি ছাড়া ভিডিও করলে দ্রুত বিচার আইনে ব্যবস্থা: তথ্যমন্ত্রী ইরানের তেল বাণিজ্য সম্পূর্ণ অচল করার কড়ার হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি কি কৌশল না ইসলামাবাদের মধ্যস্থতা ‘অবৈধ যুদ্ধ’ আড়াল করতেই হুমকি: ইরানি-মার্কিন কংগ্রেসওম্যান ইয়াসামিন আনসারি বিশ্বমঞ্চে ‘শান্তিদূত’ পাকিস্তান: আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার আড়ালে ধুঁকছে ঘরোয়া রাজনীতি
বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪৮ অপরাহ্ন

লোগো নকল, দাম আকাশছোঁয়া: সংসদের কেনাকাটায় এ কোন জাদুকরি হিসাব?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশও ঘুরে দাঁড়াতে পারে, জাপান ও জার্মানির ইতিহাস তার সাক্ষী। কিন্তু দুর্নীতিতে বিধ্বস্ত একটি দেশ? সেখানে উন্নয়ন যেন বালির ওপর তোলা বাড়ির মতো—দেখতে সুন্দর, কিন্তু ভেতরে একেবারে ফাঁপা।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা যেন সেই কথাটিকেই কাগজে-কলমে প্রমাণ করছে। বাস্তবে কোথাও যেন হিসাব মেলে না। স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়েও এ দেশে মানুষ ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে। কারণ, এ দেশে দুর্নীতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এ যেন এক প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যাস, যা একেবারে রক্তে মিশে গেছে। দল বদলেছে, স্লোগান বদলেছে, প্রতিশ্রুতির ভাষাও বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি সেই পুরোনো অভ্যাস। জনগণ ভেবেছিল এবার হয়তো কিছু বদলাবে, কিন্তু বাস্তবতা এমন এক আয়না, যেখানে প্রতিফলন সব সময় সুন্দর হয় না।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে যে, সংসদ—যে জায়গাটিকে আমরা গণতন্ত্রের পবিত্রতম মঞ্চ বলে জানি এবং যেখানে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন দুর্নীতির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠে কথা বলতে হয়—সেই জায়গাতেই যদি দুর্নীতির এমন সূক্ষ্ম ও নিয়মতান্ত্রিক চর্চা হয়, তখন বিস্ময়ের আর কোনো জায়গা থাকে না!

পবিত্র সংসদে হরিলুটের অভিনব চিত্র

সরকারি কাগজে একটি সাধারণ জিনিস হয়ে গেল ৩৪,৪০০ টাকার! কেউ বলতেই পারে, ব্র্যান্ডের জিনিস, দাম তো বেশি হবেই। কিন্তু গল্পে একটু মোড় আছে। ব্র্যান্ডের নাম লেখা থাকলেও জিনিসটি নিম্নমানের, আর লোগোটি আলাদা করে লাগানো। যেন নামটাই আসল, গুণগত মান নয়!

  • অবাস্তব দাম: বাজারের ৩ হাজার টাকার একটি যন্ত্র কেনা হয়েছে ২১ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে।

  • ক্যামেরার জাদুকরি হিসাব: একটি ডিজিটাল এসএলআর (DSLR) ক্যামেরা বডির বাজারমূল্য যেখানে প্রায় ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা, সেটি কেনা হয়েছে ৭ লাখ ৯ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে!

  • পাহাড়সম বিল: চারটি ক্যামেরা বডির জন্য ব্যয় দেখানো হয়েছে ৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। ফটোগ্রাফি পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সংসদ অধিবেশন কক্ষের ছবি তুলতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার সরঞ্জামই যথেষ্ট। পুরো সেটের বাজারমূল্য যেখানে ২০ লাখ টাকারও কম, সেখানে সরকারের কাছ থেকে বিল নেওয়া হয়েছে ৯৮ লাখ ৪০,১৩০ টাকার!

এটি শুধু অস্বাভাবিক নয়, প্রায় অবিশ্বাস্য। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো—কোথাও লোগো লাগানো, কোথাও পার্টস বদলানো। সব মিলিয়ে এ যেন এক অভিনব ‘সংযোজন শিল্প’, যেখানে আসল পণ্য নয়, কেবল তার ছায়া বিক্রি করা হয়েছে।

নিয়মের আড়ালে দুর্নীতির ঢাল

এই পার্থক্য শুধু কোনো সংখ্যা নয়, এটি একটি বিকৃত মানসিকতার প্রতিফলন। প্রশ্ন উঠতে পারে, এত বড় ব্যবধান কীভাবে সম্ভব? উত্তরটি লুকিয়ে আছে আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরেই। সরকারি কেনাকাটার নিয়ম যখন দুর্নীতির ঢাল হয়ে ওঠে, তখন অনিয়মকে আর আলাদা করে চেনা যায় না।

এই ঘটনার আরও একটি চমকপ্রদ দিক আছে—সময়ের হিসাব। ৩০ দিনের মধ্যে সরবরাহের কথা থাকলেও মাত্র ১৯ দিনে সবকিছু সরবরাহ করা হয়েছে। দ্রুততা সব সময় যে দক্ষতার প্রমাণ নয়, এটি তার জ্বলন্ত উদাহরণ। অভিযোগ আছে, এই পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে ছিলেন সংসদ সচিবালয় থেকে সদ্য বিদায় নেওয়া সচিব কানিজ মাওলা। তিনি পুরো কেনাকাটার এমনভাবে তত্ত্বাবধান করেছেন এবং কাগজে-কলমে সব নিয়ম মেনে কাজটি করেছেন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো জবাবদিহির মুখে পড়তে না হয়। এটি দুর্নীতির এক পরিণত রূপ, যেখানে অপরাধটি এতটাই নিখুঁতভাবে করা হয় যে সেটি প্রমাণ করাই কঠিন হয়ে পড়ে।

সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে ‘সেফ ট্রেডার্স’। তাদের জেনারেল ম্যানেজার মিরাজুল ইসলামের বক্তব্য আরও কৌতূহলোদ্দীপক। তিনি বলেছেন, “সরকারি কেনাকাটায় এমন দাম অস্বাভাবিক নয়।” তার কথায় মনে হয়, এটি যেন একটি স্বাভাবিক প্রথা এবং অলিখিত নিয়ম! অন্যদিকে, কার্যাদেশে স্বাক্ষর করেছেন সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ মহিদুল হাসান।

সর্বগ্রাসী দুর্নীতির বৃত্ত

এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি বৃহত্তর দুর্নীতির একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।

  • জ্বালানি খাত: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআইবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, জ্বালানি খাতে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ নামের এক অদ্ভুত ব্যবস্থা চালু আছে, যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও অর্থ দিতে হয়। বিদ্যুৎ আমদানিতে মধ্যস্বত্বভোগীদের কমিশন বাণিজ্য এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

  • ব্যাংকিং খাত: ব্যাংকিং খাতেও পরিস্থিতি চরম উদ্বেগজনক। তারল্য সংকট, বিশেষ সুবিধায় ঋণ প্রদান এবং সেই অর্থ দিয়ে সরকারি বিল পরিশোধ—সব মিলিয়ে একটি দুষ্ট চক্র তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, সমস্যাটি শুধু একটি দপ্তরের নয়। সবখানেই একটি অদৃশ্য হাত কাজ করে, যা সবকিছু নিজের দিকে টেনে নেয়।

সমাধানের পথ কোথায়?

এই বৃত্ত কি ভাঙবে? উত্তরটি জটিল। কারণ, দুর্নীতি শুধু একটি কাজ নয়, এটি একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। তবে আশার জায়গাও আছে। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে এখন কোনো কিছু লুকিয়ে রাখা কঠিন। গণমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সচেতন নাগরিকদের কারণে এসব ঘটনা এখন সহজেই সামনে আসছে।

কিন্তু শুধু তথ্য প্রকাশ করলেই হবে না, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত এদের কঠোর আইনের আওতায় আনা। শুধু নিচের স্তরের কর্মচারী নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে।

সবশেষে একটি কথা মনে রাখা দরকার—রাষ্ট্রের প্রতিটি টাকা জনগণের ঘামঝরানো অর্থ। সেই টাকার অপচয় মানে শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, এটি একটি চরম নৈতিক ব্যর্থতা। বাংলাদেশ এগোচ্ছে, এটা সত্য। কিন্তু সেই অগ্রযাত্রাই যদি দুর্নীতির ভারে ধীর হয়ে যায়, তাহলে একসময় আমরা পথ হারিয়ে ফেলব। এখনই সময় আছে পথ ঠিক করার এবং নিয়মকে সত্যিকারের নিয়মে পরিণত করার। নাহলে চার হাজার টাকার বস্তু ৩৪ হাজার টাকায় কেনার এই হরিলুট চলতেই থাকবে!


এ জাতীয় আরো খবর...