বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামা আর অর্থনৈতিক অস্থিরতার মাঝে পাকিস্তান বর্তমানে এক অভাবনীয় কূটনৈতিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। চিরবৈরী দুই দেশ—ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে শান্তি স্থাপনের কঠিন মিশনে নেমেছে ইসলামাবাদ। কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই ‘শান্তির মুকুট’ পরার আড়ালে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কি তবে নিঃশব্দে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? দৈনিক দ্য ডন-এ প্রকাশিত প্রখ্যাত সাংবাদিক আরিফা নূরের একটি বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধে উঠে এসেছে পাকিস্তানের অন্দরমহলের এই চাঞ্চল্যকর রাজনৈতিক সমীকরণ।
বর্তমানে পাকিস্তানের নীতিনির্ধারক ও সামরিক নেতৃত্বের পুরো মনোযোগ ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনার টেবিলে। বিদেশি কূটনীতিকদের আনাগোনা আর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের ভিড়ে দেশের প্রথাগত রাজনীতি যেন পুরোপুরি থমকে গেছে।
বিস্মৃতির পথে বিরোধী শিবির: সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান এবং তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবি এখনো কঠোর গোপনীয়তায় কারাবন্দী। তাঁদের মুক্তির আন্দোলন বা আইনি লড়াই নিয়ে এখন আর তেমন কোনো উচ্চবাচ্য নেই।
অপ্রাসঙ্গিক প্রথাগত রাজনীতি: বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালে এসে পাকিস্তানের প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাসঙ্গিকতা যেন কেবল ড্রয়িংরুমের আড্ডাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
ইসলামাবাদের বিলাসবহুল সেরেনা হোটেলে যখন বিদেশি কূটনীতিকদের নিয়ে মহাযজ্ঞ চলছে, তখন স্বাগতিক হিসেবে সামনের সারিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, উপ-প্রধানমন্ত্রী ইশাক দার এবং ক্ষমতাধর সামরিক নেতৃত্ব। কিন্তু এই আয়োজনে জোট সরকারের অন্যতম প্রধান শরিক পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) রহস্যজনক অনুপস্থিতি সবার নজর কেড়েছে।
রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতি: সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, শান্তি আলোচনার জন্য যখন একটি পরাশক্তির ভাইস-প্রেসিডেন্ট ইসলামাবাদে অবস্থান করছেন, তখন খোদ রাষ্ট্রপ্রধান আসিফ আলি জারদারি রাজধানীতে ছিলেন না। তিনি সে সময় তাঁর রাজনৈতিক দুর্গ সিন্ধু প্রদেশে সময় কাটাচ্ছিলেন।
বিগত বছরের সঙ্গে বৈপরীত্য: অথচ মাত্র এক বছর আগেও (২০২৫ সালে) জর্ডানের রাজা বা তুর্কি প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানাতে শাহবাজ ও জারদারিকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেখা গেছে। এমনকি সে সময় বিলাওয়াল ভুট্টোকে পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রতিনিধি দলের ‘মুখ’ হিসেবে দেখা যেত।
পিপিপি-র এই অনুপস্থিতি স্রেফ কোনো প্রোটোকলগত ত্রুটি নয়; বরং এটি বর্তমান ‘হাইব্রিড নিজাম’ বা মিশ্র শাসনব্যবস্থার গভীর সংকটেরই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। এর পেছনে রয়েছে কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যকার তীব্র আর্থিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন:
আর্থিক বিরোধ: ২৮তম সংশোধনী এবং জাতীয় অর্থ কমিশন (এনএফসি) অ্যাওয়ার্ড নিয়ে দুই দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরমে। অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্র তার আর্থিক বোঝা কমাতে প্রদেশগুলোর ভাগের অর্থ ছাঁটাই করতে চাইছে, যা সিন্ধুর শাসক দল পিপিপি কোনোভাবেই মানতে রাজি নয়।
করাচি ইস্যু: করাচির ভঙ্গুর শাসনব্যবস্থা নিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সমালোচনাও পিপিপি নেতৃত্বকে ক্ষুব্ধ করেছে।
সিন্ধু প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলি শাহ এক চতুর বিবৃতির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে বলেছেন যে, এই কূটনৈতিক সাফল্যের সমান অংশীদার প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধান। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এখন নিজের রাজনৈতিক অবস্থানে এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে, মিত্রদের তোয়াজ করার কোনো প্রয়োজনই তিনি বোধ করছেন না।
পাকিস্তান যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মধ্যস্থতাকারীর প্রশংসায় ভাসছে, ঠিক তখনই নিজের ঘরের অন্দরমহলে আস্থার সংকট প্রকট রূপ নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক এই কূটনীতির ডামাডোল কি সত্যিই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেবে, নাকি শান্তি আলোচনার উত্তেজনা শেষে এনএফসি অ্যাওয়ার্ড ও রাজনৈতিক বিভেদের পুরোনো আগুন নতুন করে জ্বলে উঠবে—অদূর ভবিষ্যতে সেটাই এখন পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।