বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৯ অপরাহ্ন

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের আঁচে নতুন ফ্রন্ট: ইরাকি মিলিশিয়াদের সঙ্গে সৌদি আরবের ‘ছায়াযুদ্ধ’

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬

উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান ত্রিমুখী যুদ্ধের ডামাডোলের মাঝেই নীরবে শুরু হয়েছে আরেক বিপজ্জনক ‘ছায়াযুদ্ধ’। ইরাকের মাটি থেকে শিয়া মিলিশিয়াদের ছোড়া একের পর এক ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে সৌদি আরবসহ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো এখন সরাসরি সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মূল যুদ্ধের আড়ালে এটি ইরানের একটি সুপরিকল্পিত প্রক্সি বা ছায়াযুদ্ধ।

লক্ষ্যবস্তুতে তেলক্ষেত্র ও বিমানবন্দর

গত পাঁচ সপ্তাহের তীব্র লড়াইয়ে ইরাকি ভূখণ্ড থেকে সৌদি আরব ও প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর কয়েক ডজন বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। সৌদি আরবের নিজস্ব মূল্যায়ন বলছে, তাদের ভূখণ্ডে ধেয়ে আসা প্রায় এক হাজার ড্রোন হামলার অর্ধেকই এসেছে ইরাক থেকে। এসব হামলার মূল নিশানায় পরিণত হয়েছে লোহিত সাগর তীরবর্তী ইয়ানবু তেল শোধনাগার এবং সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্রগুলো।

হামলার পরিধি শুধু সৌদি আরবেই সীমাবদ্ধ নেই। কুয়েতের একমাত্র বেসামরিক বিমানবন্দরও এই হামলার শিকার হয়েছে। এমনকি চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও বাহরাইনে হামলা চালিয়েছে মিলিশিয়ারা। ইরাকের ভেতরেও উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পদ ও কনস্যুলেট (যেমন- বসরার কুয়েতি কনস্যুলেট এবং কুর্দিস্তানের আমিরাতি কনস্যুলেট) তাদের ক্ষোভের মুখে পড়েছে।

প্রক্সি যুদ্ধের নেপথ্য সমীকরণ

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ছায়াযুদ্ধ মূলত ফেব্রুয়ারির শেষে শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধেরই একটি সম্প্রসারিত কৌশল। ইরান নিজেরা সরাসরি ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানোর পাশাপাশি তাদের প্রক্সি বা মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে (যেমন- ইরাকি মিলিশিয়া ও লেবাননের হিজবুল্লাহ) ব্যবহার করে যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন আরও বিস্তৃত করেছে। এতে ইরানের নিজস্ব ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি না নিয়েই শত্রুদের ওপর চাপ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে।

মার্কিন গোয়েন্দারা সতর্ক করেছেন যে, মিলিশিয়ারা আরও ভয়াবহ হামলার পরিকল্পনা করছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে বাগদাদের মার্কিন দূতাবাস থেকে ইতিমধ্যেই বেশিরভাগ কর্মীকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ইরাকি মিলিশিয়াদের উত্থান ও আস্ফালন

দুই দশকের বেশি সময় আগে মার্কিন আগ্রাসনের পর ইরাকে শিয়া মিলিশিয়াদের উত্থান ঘটে। পরবর্তীতে আইএস (IS) দমনের নামে তারা আরও সুসংগঠিত হয় এবং ইরানের কাছ থেকে বিপুল অস্ত্র সহায়তা পেতে শুরু করে। বর্তমানে এই মিলিশিয়াদের (বিশেষ করে কাতাইব হিজবুল্লাহ এবং আসাইব আহল আল-হক) প্রায় আড়াই লাখ সদস্য, বিলিয়ন ডলারের তহবিল এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। চ্যাথাম হাউসের গবেষক রেনাড মানসুর জানান, তেহরানে শাসনব্যবস্থা পতনের শঙ্কা দেখা দেওয়ায় এই গোষ্ঠীগুলো এখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থেই আগের চেয়ে অনেক বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

ইরাকের মাটিতেই কি পাল্টা জবাব?

উপসাগরীয় দেশগুলো একটি কঠিন সমীকরণের মুখে দাঁড়িয়েছে। সরাসরি ইরানের ভূখণ্ডে আক্রমণ করলে বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের বা প্রতিশোধের মুখে পড়তে হতে পারে। তাই কৌশলগত উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান হরাইজন এনগেজ-এর প্রধান মাইকেল নাইটস মনে করেন, সৌদি আরব সতর্কবার্তা হিসেবে খোদ ইরাকের মাটিতেই প্রতীকী হামলা শুরু করতে পারে। অন্যদিকে, কুয়েত ও বাহরাইনও ইরাকি মিলিশিয়াদের দমনে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারে।

ইরাক সরকারের অসহায়ত্ব

উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) সহকারী মহাসচিব আবদেল আজিজ আল-উয়াইশেগ হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, এই মিলিশিয়ারা এখন ইরাকের জাতীয় সরকারের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ইরাকে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের পর চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সরকার এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে। ইরাক সরকারের এই নিয়ন্ত্রণহীনতা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাকে এক গভীর খাদের কিনারে ঠেলে দিচ্ছে।


এ জাতীয় আরো খবর...