দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ও একক আধিপত্যের অবসানের পর দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আবারও নতুন করে অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে গত কয়েকদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম কলেজসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় হামলা, পাল্টাহামলা, সংঘর্ষ ও চরম অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর শিক্ষাঙ্গনের রাজনীতিতে যে কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছিল, বর্তমানে সেই কাঠামোই নতুন এক মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিক্ষাঙ্গনে এই সংঘাতের নেপথ্যে মূলত আধিপত্য বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার এবং ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ পরিচয়ের আড়ালে রাজনীতি করার অভিযোগকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা।
শিক্ষাঙ্গনে এই দুই বৃহৎ ছাত্র সংগঠনের মধ্যকার রেষারেষি হঠাৎ করেই শুরু হয়নি; বরং গত কয়েক মাসের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও আধিপত্য বিস্তারের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়েরই বহিঃপ্রকাশ এই সাম্প্রতিক সংঘর্ষগুলো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহবাগ থানা প্রাঙ্গণে সংঘর্ষ: সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন শাহবাগ থানার ভেতরে ও বাইরে সংঘর্ষে জড়ায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান তীব্র অপপ্রচার ও ‘বাগযুদ্ধ’-এর জেরে এই শারীরিক সংঘাতের সূত্রপাত হয়। এ সময় ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হাতে মারধরের শিকার হন শিবির সমর্থিত ডাকসুর (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) কয়েকজন নেতা। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে, পেশাগত দায়িত্ব পালন ও সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ও সাংবাদিকও এই হামলার শিকার হন।
চট্টগ্রাম কলেজে ‘গুপ্ত’ গ্রাফিতি বিতর্ক: শাহবাগ মোড়ের এই ঘটনার মাত্র দুই দিন আগে, গত মঙ্গলবার বন্দরনগরী চট্টগ্রামের একটি কলেজে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেখানে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু ছিল একটি দেয়াল লিখন বা গ্রাফিতি। অভিযোগ রয়েছে, শিবিরের রাজনীতিকে ইঙ্গিত করে একটি গ্রাফিতিতে ছাত্রদলের কর্মীরা ‘গুপ্ত’ শব্দটি লিখে দেয়। এই ‘গুপ্ত’ শব্দ দিয়ে মূলত বোঝানো হয়েছিল যে, শিবির প্রকাশ্যে রাজনীতি না করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পরিচয়ের আড়ালে বা গোপনে রাজনীতি করছে। এই গ্রাফিতিকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে যে সংঘর্ষ হয়, তাতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন।
এই দুটি বড় ঘটনার রেশ ধরে গত কয়েকদিনে দেশের আরও বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা ইস্যুতে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, এই সংকটের মূল কারণ হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ বা আধিপত্য কার হাতে থাকবে—সেই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে দীর্ঘ দেড় দশক দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। আবাসিক হলগুলোতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম, বিরোধী মত দমন এবং ‘গণরুম ও গেস্টরুম কালচার’ প্রতিষ্ঠা করে ক্যাম্পাসগুলোর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছিল তারা। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই দৃশ্যপটের আমূল পরিবর্তন ঘটে। ছাত্রলীগ ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কৌশলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
সরকার পতনের পর বিগত বছরগুলোতে ক্যাম্পাসে আত্মগোপনে থাকা অনেক সংগঠনের কমিটি প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। তখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানতে পারেন, এতদিন ছাত্রশিবিরের অনেক প্রথম সারির নেতা-কর্মী সাধারণ শিক্ষার্থী পরিচয়ে, এমনকি ছাত্রলীগসহ অন্যান্য দলের ভেতরে গোপনে অবস্থান নিয়ে নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে শিবির সমর্থিত প্যানেলগুলো নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। এর ফলে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রশিবির মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগতভাবে অনেকটা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ভূমিধস বিজয় লাভ করে সরকার গঠনের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন হিসেবে ছাত্রদল এখন স্বভাবতই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য ফিরে পেতে চাইছে।
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ এ প্রসঙ্গে বলেন, “নির্বাচনের পর সরকারে এসেছে বিএনপি। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ছাত্রশিবির। এখন শিবিরের বদলে ছাত্রদল সেই প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করতে চাচ্ছে। আর এই নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টাকে ঘিরেই তাদের মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ হচ্ছে।”
বর্তমান সংকট নিয়ে ছাত্রদল ও শিবিরের রয়েছে পরস্পরবিরোধী জোরালো দাবি ও অভিযোগ। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব স্পষ্টভাবে শিবিরের বিরুদ্ধে ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ বা দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ তুলেছেন।
ছাত্রদলের দাবি অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর থেকে শিবির ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’র ব্যানারে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তারা প্রকাশ্যে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় না দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সেন্টিমেন্টকে ব্যবহার করে পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে।
সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, “শিবির দাবি করে যে হলে তাদের কোনো কার্যক্রম নেই, কোনো কমিটি নেই। তাহলে আমাদের প্রশ্ন হলো, ৬ আগস্ট থেকে ক্যাম্পাস আর হলগুলো কারা দখল করল? তারা সবকিছু নিজেদের দখলে রাখার পরও সেটি জনসমক্ষে স্বীকার করছে না। এটা স্পষ্ট যে, ৫ আগস্টের পর শিবির ক্যাম্পাসগুলো দখল করেছে।”
তিনি আরও গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেন, “শুধু আবাসিক হলগুলোই নয়, গত দেড়-দুই বছরে আমরা দেখেছি ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিসহ (ডুজা) বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোতেও তারা সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে অনুপ্রবেশ করেছে এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। যে কারণে সেই স্বনামধন্য সংগঠনগুলোও এখন আর নিজেদের মতো করে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।”
ছাত্রদলের এই সব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির। তাদের দাবি, বিএনপি সরকার গঠনের পর ছাত্রদল এখন পেশিশক্তি ব্যবহার করে ক্যাম্পাসগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর জোর করে নিজেদের মত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
শিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি সিগবাতুল্লাহ দাবি করেন, জুলাই বিপ্লবের পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ক্যাম্পাস ও হলগুলো থেকে যে অভিশপ্ত ‘গণরুম ও গেস্টরুম কালচার’ চিরতরে বিদায় করেছিল, ছাত্রদল এখন সেটিই পুনরায় ফিরিয়ে আনতে চাইছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ করলেই তাদের ওপর শিবিরের ট্যাগ লাগিয়ে হামলা করা হচ্ছে।
ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, “ছাত্রদলের এমন অনেক নেতাকর্মী আছেন যাদের পড়াশোনা শেষ হয়েছে আজ থেকে দশ বছর আগে। তারা এখন ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় ব্যবহার করে জোরপূর্বক হলগুলোতে উঠতে চান এবং সিট দখল করতে চান। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখন এই অছাত্রদের হলে ওঠার বিষয়ে বাধা দিচ্ছেন, তখনই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছেন এবং নিজেদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার দায় শিবিরের ওপর চাপাচ্ছেন।”
বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক লড়াই শুধু রাজপথে বা ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ নেই, এটি ছড়িয়ে পড়েছে সাইবার জগতেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন শাহবাগ থানায় যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল, তার মূল কারণ ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অত্যন্ত আপত্তিকর ও ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানো হয়। ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বদ্ধমূল ধারণা, শিবিরের কর্মীরাই পরিকল্পিতভাবে এই প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়েই ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর চড়াও হন। যদিও পরবর্তীতে ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে ওই ফটোকার্ডটি সম্পূর্ণ ভুয়া ছিল। এরপর দুই সংগঠনের শীর্ষ নেতারা বসে আলোচনা করে সংঘাত আপাতত নিয়ন্ত্রণে আনেন।
এ প্রসঙ্গে ছাত্রদল সভাপতি রাকিব বলেন, “৫ আগস্টের পরও তারা (শিবির) গুপ্ত অবস্থায় থেকে সোশ্যাল মিডিয়া নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখছে। বিভিন্ন বেনামি আইডি ও পেজ থেকে বিএনপি ও ছাত্রদলকে নিয়ে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের নোংরা প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। এই বিষয়গুলো আমাদের সাধারণ নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং কোথাও কোথাও তারা এর স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।”
অন্যদিকে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়ার পাল্টা অভিযোগ করেছেন শিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, “শাহবাগের ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে যে তারা (ছাত্রদল) সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগে আমাদের ওপর হামলা করেছে। আমরা উল্টো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিকটিম হচ্ছি। আমরা যদি এসব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে চাই বা থানায় অভিযোগ দিতে যাই, তখন থানা পুলিশও সরকারের ইশারায় সেই অভিযোগ গ্রহণ করছে না।”
ক্যাম্পাসগুলোর এই ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা ও উত্তেজনার আঁচ গিয়ে পড়েছে খোদ জাতীয় সংসদেও। রোববার জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ শিক্ষাঙ্গনের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, ক্যাম্পাসগুলোতে আবারো সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়নমূলক ‘গণরুম-গেস্টরুম কালচার’ ফিরিয়ে আনার সুস্পষ্ট পাঁয়তারা চলছে, যার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে শিক্ষাঙ্গনে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ শব্দটি একটি নতুন রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাশেদা রওনক খান এই নতুন প্রবণতা নিয়ে বলেন, “৫ আগস্টের পর ক্যাম্পাসগুলোতে এক ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছিল। ছাত্ররা চেয়েছিল যে ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ব্যানারে বা ছায়ায় থাকবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেটা করতে গিয়ে ‘সাধারণ’-এর সংজ্ঞা নিয়েই এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।”
তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমরা দেখেছি ‘সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের’ ব্যানারে নির্দিষ্ট একটি দল প্রভাব খাটাতে শুরু করল। সেখানে স্বাভাবিকভাবেই জাতীয়ভাবে সরকার গঠনের পর সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন এই জায়গাটাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এই সাধারণ বনাম দলীয়—এই প্রশ্ন ও সন্দেহকে কেন্দ্র করেই ক্যাম্পাসগুলোতে এক ধরনের চরম অস্থিরতা ও টানাপোড়েন শুরু হয়েছে।”
শিক্ষাঙ্গনের এই সংঘাতময় পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত অভিভাবক ও সচেতন মহল। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, “ছাত্র সংগঠনগুলো যতদিন মূল রাজনৈতিক দলের অঙ্গ বা লেজুড়বৃত্তিক সংগঠন হিসেবে কাজ করবে, ততদিন আধিপত্য বিস্তারের এই ধরনের সহিংসতা চলতেই থাকবে।”
বিশ্লেষকদের সর্বসম্মত মত হলো, শিক্ষাঙ্গনকে শান্ত রাখতে হলে অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং সরকারকে কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে হবে। ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অধিকার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায়, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা—একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক শিক্ষাঙ্গন—চিরকাল অধরাই থেকে যাবে।