যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টিকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য পুলিশের হাতে এসেছে। তদন্তে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের পর লাশ কীভাবে নিখুঁতভাবে গুম করা যায়, তার উপায় খুঁজতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্ল্যাটফর্ম ‘চ্যাটজিপিটি’-এর সাহায্য নিয়েছিলেন অভিযুক্ত ঘাতক ও লিমনের রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়া (২৬)। ইতিমধ্যে লিমনের মরদেহ উদ্ধারের পর এবার নিখোঁজ বৃষ্টির সন্ধানে তল্লাশি চালাতে গিয়ে অজ্ঞাত মানবদেহের খণ্ডিতাংশ উদ্ধার করেছে ফ্লোরিডা পুলিশ।
জোড়া খুনের এই মামলায় অভিযুক্ত হিশামকে যেন কোনোভাবেই জামিন দেওয়া না হয়, সে বিষয়ে আদালতে জোরালো আবেদন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।
এআই প্ল্যাটফর্মে ভয়ংকর অনুসন্ধান
আদালতে জমা দেওয়া নথির বরাত দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জানান, লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন আগে (১৩ এপ্রিল) হিশাম চ্যাটজিপিটিতে লাশ গুম করার বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন।
নথি অনুযায়ী, হিশাম চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করেন— ‘একজন মানুষকে কালো ময়লার ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দিলে কী হয়?’ এর জবাবে চ্যাটজিপিটি লেখে, ‘এটি বিপজ্জনক শোনাচ্ছে।’ এরপর হিশাম পুনরায় প্রশ্ন করেন— ‘তারা কীভাবে জানতে পারবে?’ এআই প্ল্যাটফর্মে এমন অপরাধমূলক বার্তা আদান-প্রদানের ঝুঁকির বিষয়ে চ্যাটজিপিটির মূল প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ, তবে তারা তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
লিমনের মরদেহ ও বৃষ্টির সন্ধানে খণ্ডিতাংশ উদ্ধার
গত ১৬ এপ্রিল সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও তাঁর বান্ধবী নাহিদা বৃষ্টি (২৭) নিখোঁজ হন। এরপর শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) ফ্লোরিডার হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের তদন্তকারীরা একটি মোটা ময়লার ব্যাগ থেকে লিমনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতেই লিমনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে লিমনের লাশ উদ্ধারের পর পুলিশের ধারণা, বৃষ্টিকেও হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলেছেন হিশাম। রোববার (২৬ এপ্রিল) পিনেলাস কাউন্টিতে বৃষ্টির সন্ধানে তল্লাশি চালাতে গিয়ে মানবদেহের কিছু অবশিষ্টাংশ বা খণ্ডিতাংশ উদ্ধার করে পুলিশ। হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ অফিস জানিয়েছে, ইন্টারস্টেট ২৭৫ ও ৪র্থ স্ট্রিট নর্থের সংযোগস্থলের কাছে হাওয়ার্ড ফ্রাংকল্যান্ড সেতুর সেন্ট পিটার্সবার্গ অংশে এই খণ্ডিতাংশ পাওয়া গেছে। উল্লেখ্য, এই সেতুর কাছে থেকেই লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। তবে উদ্ধার হওয়া খণ্ডিতাংশগুলো বৃষ্টির কি না, তা এখনো ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা ও ফরেনসিক আলামত
তদন্তকারীরা আদালতে জানিয়েছেন, ১৬ এপ্রিল রাতে হিশাম বাজার থেকে ময়লার ব্যাগ ও জীবাণুনাশক লিকুইড কিনেছিলেন। এরপর ১৭ এপ্রিল হিশামের এক রুমমেট তাকে অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের কম্প্যাক্টর ডাস্টবিনে কিছু কার্ডবোর্ডের বাক্স ফেলে আসতে দেখেন।
পরবর্তীতে পুলিশ ওই ডাস্টবিনে তল্লাশি চালিয়ে লিমনের স্টুডেন্ট আইডি ও ক্রেডিট কার্ড উদ্ধার করে। ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষায় ডাস্টবিনে পাওয়া একটি ধূসর রঙের টি-শার্টে লিমনের এবং একটি কিচেন ম্যাটে বৃষ্টির জেনেটিক উপাদানের উপস্থিতি মিলেছে। এছাড়া হিশামের অ্যাপার্টমেন্টে রক্তের দাগ এবং ডাস্টবিনে বৃষ্টির মোবাইল ফোনের গোলাপি কভারসহ বেশ কিছু জিনিসপত্র পাওয়া গেছে।
জিজ্ঞাসাবাদে বিভ্রান্তিকর তথ্য
আদালতের নথি অনুযায়ী, পুলিশ যখন হিশামকে প্রথম জিজ্ঞাসাবাদ করে, তখন তিনি এই দুই বাংলাদেশির অবস্থান সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন। কিন্তু গোয়েন্দারা যখন তাদের প্রাপ্ত তথ্যপ্রমাণ সামনে আনেন, তখন হিশাম বয়ান পাল্টে ফেলেন। তিনি দাবি করেন, লিমন তাকে রাইডের অনুরোধ করায় ১৬ এপ্রিল তিনি লিমন ও বৃষ্টিকে ফ্লোরিডার ক্লিয়ারওয়াটার এলাকায় নামিয়ে দিয়েছিলেন। তবে কেন সেখানে নামিয়েছিলেন, তার কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। কাকতালীয়ভাবে, পুলিশ এই ক্লিয়ারওয়াটারে যাওয়ার পথেই একটি সেতুর কাছ থেকে লিমনের লাশ উদ্ধার করে।
হিলসবরো কাউন্টি পাবলিক ডিফেন্ডার অফিসের হত্যা মামলা বিভাগের প্রধান ও হিশামের আইনজীবী জেনিফার স্প্র্যাডলি এই মামলার বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে পুলিশের ধারণা, পূর্বপরিকল্পিতভাবেই এই জোড়া খুনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।