২০২০ সালের পরবর্তী দক্ষিণ এশিয়ায় গণঅভ্যুত্থান এবং সরকার পতনের এক নতুন ঢেউ পরিলক্ষিত হয়েছে। স্লোগান আর মিছিলের গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তনের নজির সৃষ্টি করেছে শ্রীলঙ্কা, নেপাল এবং বাংলাদেশ। ২০২২ সালে অর্থনৈতিক সংকট এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়ে শ্রীলঙ্কার মানুষ রাজাপাকসে সরকারের পতন ঘটিয়ে রনিল বিক্রমাসিংহেকে ক্ষমতায় বসায়, এবং দেশটি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে। এরপর আসে নেপাল এবং বাংলাদেশের পালা। দুটি দেশেই ছাত্রজনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত সরকারগুলোর পতন ঘটে।
তবে এই দুই দেশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা দিয়েছে, যা বর্তমানে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেপালে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া বিপ্লবী গোষ্ঠী নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, এবং তরুণ প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ একের পর এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিবর্তনের হাওয়া বইয়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশের ছাত্রজনতার বিপ্লব নেপালের চেয়েও অনেকগুণ বেশি শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী হওয়া সত্ত্বেও, এবং নেপালের আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হওয়া সত্ত্বেও, রাষ্ট্র কাঠামোতে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। যেই ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশে এই বিপুল আন্দোলন পরিচালিত হলো, তাদের গঠিত রাজনৈতিক দল (NCP) নির্বাচনে এককভাবে সরকার গঠন তো দূরের কথা, জোটবদ্ধ হয়েও মাত্র ছয়টি আসন পেয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, নেপালের আন্দোলনকারীরা সফলভাবে ক্ষমতায় যেতে পারলেও বাংলাদেশের নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ বা সারজিস আলমরা কেন পারলেন না? এই পার্থক্যের মূলে কি ছাত্রদের কোনো ভুল ছিল, নাকি অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে?
ভুল ধারণাসমূহ এবং বাস্তবতা
বাংলাদেশে আন্দোলনকারীদের রাজনৈতিকভাবে আশানুরূপ ফল না পাওয়ার পেছনে বেশ কিছু জনপ্রিয় কারণ বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনা করা হচ্ছে। তবে নেপাল এবং বাংলাদেশের গত ১০-১৫ বছরের রাজনীতির গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলোর একটিও মূল কারণ নয়।
উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দেওয়া: একটি বড় অভিযোগ হলো, বাংলাদেশের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দিয়ে ‘ক্ষমতার লোভে’ নিজেদের গায় দুর্নীতির দাগ লাগিয়েছেন, ফলে তাদের জনপ্রিয়তা কমেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, উপদেষ্টা পরিষদে যোগ না দিলে ওই সময়ে ছাত্রদের রাজনৈতিক দল গঠনের পরিবেশ রক্ষা এবং আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সন্দেহাতীতভাবে কঠিন হতো। একটি Representation সরকারে থাকা প্রয়োজন ছিল নতুন দল গঠনের আগ পর্যন্ত। নেপালের বালেন শাহের সাথে নাহিদ ইসলামের তুলনাও এখানে অযৌক্তিক, কারণ বালেন শাহ আগে থেকেই কাঠমান্ডুর মেয়র ছিলেন এবং পরে একটি প্রতিষ্ঠিত দলে যোগ দেন, আর নাহিদ ইসলামরা শূন্য থেকে একটি দল গঠন করেছেন।
নির্বাচনের টাইমিং: কেউ কেউ মনে করেন, নেপালে আন্দোলনের ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন হওয়ায় আন্দোলনের স্পিরিট কাজে লাগানো গেছে। আর বাংলাদেশে দেড় বছর পর নির্বাচন হওয়ায় মানুষের আবেগ প্রশমিত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে আন্দোলনের কয়েক মাসের মধ্যে নির্বাচন হলে আন্দোলনকারীরা কোন ব্যানারে নির্বাচন করত? তাদের কোনো দলই ছিল না। নেপালে দ্রুত নির্বাচন সম্ভব হয়েছিল কারণ তাদের দল আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। বাংলাদেশে দল গঠন এবং কাজের পরিবেশ তৈরির জন্যই সরকারে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিত্ব জরুরি ছিল।
জোটের সমীকরণ: জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট করাকেও অনেকে তরুণদের ভোট হারানোর কারণ হিসেবে দেখেন। কিন্তু এটিও প্রধান কারণ নয়।
আসল রহস্য: রাজনৈতিক বিস্তৃতি বনাম তাৎক্ষণিক উত্থান
দুই দেশের রাজনৈতিক ফলাফলের এই বিপুল পার্থক্যের মূল কারণ হলো রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, প্রস্তুতির সময়কাল এবং বিদ্যমান রাজনৈতিক বিকল্পের উপস্থিতি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
১৯৯৬ সালের পর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে বাংলাদেশে ২০২৪ সালে একটি বড় সরকার পতনের আন্দোলন হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে দেশে একটি নির্দিষ্ট ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল, যেখানে মানুষের সামনে ভোট দেওয়ার জন্য বারবার মূলত দুটি অপশন ছিল। মানুষের অভিযোগ থাকলেও অপশন চেঞ্জ করার সুযোগ ছিল না। এর মধ্যে একটি অপশন দীর্ঘ ১৭ বছর রাজনীতির বাইরে থাকায়, গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রথম ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই ওই ১৭ বছর বাইরে থাকা বিকল্পের দিকেই গেছে। গণঅভ্যুত্থানের পূর্বে নতুন কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি হয়নি। ফলে আন্দোলন সফল হলেও নির্বাচনের মাঠে পুরনো অপশনই রাজত্ব করেছে।
তাছাড়া, আন্দোলন সফল হওয়া আর রাজনৈতিক দল হিসেবে সফল হওয়া এক জিনিস নয়। আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত এবং তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি রাজনৈতিক দল (বিএনপি)-এর বিপরীতে শূন্য থেকে একটি দল গঠন করা, সারাদেশের রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়া এবং তৃণমূলের নেতাকর্মী সেট করা অল্প সময়ের কাজ নয়। বিএনপি নিজে নিকট অতীতে গণআন্দোলনের শিকার হয়নি এবং তারাও ২০২৪-এর আন্দোলনের একটি বিশাল অংশীদার ছিল। ফলে এনসিপি গঠনের মাত্র এক বছরের মধ্যে elections-এ ভালো আসন না পাওয়াটা বরং স্বাভাবিক। জনগণ আন্দোলনের বিপক্ষে থাকা জাতীয় পার্টিকে একটি আসনেও নির্বাচিত করেনি। প্রতিযোগিতা হয়েছে আন্দোলনের পক্ষের সব শক্তির মধ্যে, এবং যাদের রাজনৈতিক বিস্তৃতি ভালো ছিল, তারাই ভালো করেছে।
নেপালের প্রেক্ষাপট:
নেপালের গত ১৭ বছরে ১৪ বার সরকার পরিবর্তন হয়েছে এবং পুরনো দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতা বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল, যা জনগণের মধ্যে চরম বিতৃষ্ণা তৈরি করে। পুরনো তিনটি প্রধান দল ক্ষমতার অংশীদার হলেও কেউই মানুষকে খুশি করতে পারেনি। মানুষ বুঝে ফেলেছিল যে নতুন কাউকে ছাড়া আসলে পরিবর্তন সম্ভব না।
এই ক্ষমতার ঘুরপাকের মাঝেই নতুন বিকল্পের ভিত্তি রচিত হয়েছিল ২০২২ সালে। তখন সাবেক টিভি উপস্থাপক রবি লামিসানের নেতৃত্বে ‘আরএসপি’ (রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি) নামক একটি নতুন ধারার রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়, যা তরুণদের নিয়ে কাজ শুরু করে এবং দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তৎপরতা চালায়। এই দল আগে থেকেই কিছু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সরকারে অংশ নিয়েছিল। অর্থাৎ নেপালের নতুন ধারার রাজনীতির জন্য একটা দল आंदोलনের আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। ২০২৫ সালের আন্দোলনের সময় এই আরএসপি সরাসরি সমর্থন দেয়।
পাশাপাশি, ২০২২ সালে নেপালের কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হন তরুণ র্যাপসিঙ্গার বালেন শাহ, যিনিও নতুন ধারার রাজনীতির পক্ষে ছিলেন। আন্দোলনের পরে বালেন শাহ এবং আরএসপি একত্রিত হয়ে নেপালের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
নেপাল এবং বাংলাদেশের আন্দোলনের মূল পার্থক্য হলো—নেপালে আন্দোলন যারা করেছে, তারা ২০২২ সাল থেকেই একটি দলের মাধ্যমে সংগঠিত ছিল এবং এই দলটি আগে থেকেই মানুষের কাছে পরিচিত ও সরকারে অংশ নেওয়া। এরাই আন্দোলন করে সরকার নামিয়ে পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে আন্দোলন নতুন কোনো রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে নয়, বরং পুরনো ও প্রভাবশালী ধারার রাজনৈতিক দলের বিশাল অংশগ্রহণসহ সংগঠিত হয়েছে। আন্দোলনের সাথে সাথে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠিত বিকল্প আমাদের হাতে ছিল না।
নেপালের আরএসপি যেমন ২০২২ সাল থেকে ২৫ সাল পর্যন্ত সারাদেশে সংগঠিত হয়ে বিভিন্ন নির্বাচনে কিছু কিছু আসন পেয়ে নিজেদের ভিত্তি শক্ত করেছিল, এনসিপিকেও যদি বাংলাদেশে সামনের স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে নিজেদের ভিত্তি শক্ত করতে পারে, তবে ভবিষ্যৎ হয়তো ভালো কিছু হতে পারে। বাংলাদেশের নতুন দল ব্যর্থ হয়েছে—এই ধারণা ভুল। নেপালে আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন দলের বিজয়ের ভিত্তি আগেই রচিত হয়েছিল, ২০২৫ সালে তা পূর্ণতা পেয়েছে। আর বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন দল আসল এবং এই দলের ক্ষমতায় আসার ভিত্তি মাত্র রচিত হলো। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনও পুরনো ধারার রাজনীতি প্রাসঙ্গিক আছে, যদি না তারা আওয়ামী লীগের মতো শাসন শুরু করে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে দেয়।