আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রসিকিউটর তার বিরুদ্ধে গোপনে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চেয়েছেন—এমন বিস্ফোরক দাবি করেছেন ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ। তবে তার বিরুদ্ধে ঠিক কী ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেননি। এই পদক্ষেপকে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর কড়া জবাব হিসেবে তিনি অধিকৃত পশ্চিম তীরের একটি ফিলিস্তিনি বেদুইন গ্রাম উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছেন, যা ওই অঞ্চলে নতুন করে চরম উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে স্মোট্রিচ দাবি করেন, আইসিসির প্রসিকিউটর তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চেয়েছেন বলে তাকে জানানো হয়েছে। একে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন:
“ইসরায়েল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। তাই পক্ষপাতদুষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার অন্যায্য নির্দেশ আমরা মানব না। তারা (ফিলিস্তিন) যুদ্ধ শুরু করেছে, আর এর জবাবও যুদ্ধ দিয়েই পাবে।”
এই ঘোষণার পরপরই তিনি পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি বেদুইন গ্রাম খান আল-আহমার খালি করার নির্দেশে সই করার কথা জানান। ২০১৮ সালে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ আদালত এই গ্রামটি উচ্ছেদের অনুমতি দিলেও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের আশঙ্কায় এবং জাতিসংঘ ও আইসিসির উদ্বেগের কারণে তা এত দিন বাস্তবায়ন করা হয়নি।
স্মোট্রিচের এই উচ্ছেদের নির্দেশকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। ফিলিস্তিনের মন্ত্রী মুয়াইয়াদ শাবান এই পদক্ষেপের পেছনের গভীর ভূ-রাজনৈতিক শঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন:
ফিলিস্তিন বিভক্ত করার ছক: তার দাবি, এটি পূর্ব জেরুজালেম ঘিরে ইসরায়েলের এমন একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ, যার মাধ্যমে পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশকে সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলা হবে।
স্বাধীন রাষ্ট্রের পথে বাধা: এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন ও ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
স্মোট্রিচের দাবির বিষয়ে আইসিসির প্রসিকিউটরের দপ্তর সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
গোপনীয়তার নীতি: আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, বিচারকরা প্রকাশের অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন কঠোরভাবে গোপন রাখা হয়।
এখতিয়ার: ইসরায়েল আইসিসির সদস্য নয় এবং তারা এই আদালতের এখতিয়ারও মানে না। তবে ২০২১ সালের এক যুগান্তকারী রায়ে আইসিসি জানায়, পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা অঞ্চলে তাদের বিচারিক ক্ষমতা রয়েছে।
এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইসরায়েলি নেতাদের ওপর আন্তর্জাতিক আইনি ও কূটনৈতিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে:
নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের বিরুদ্ধে পরোয়ানা: ২০২৪ সালের নভেম্বরে গাজা যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আইসিসি।
হামাস নেতাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ: একই সময়ে হামাসের তিন শীর্ষ নেতা—ইয়াহিয়া সিনওয়ার, মোহাম্মদ দেইফ ও ইসমাইল হানিয়ার বিরুদ্ধেও পরোয়ানা চাওয়া হয়েছিল। তবে তারা নিহত হওয়ার পর সেই প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা: গত জুনে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগে যুক্তরাজ্যসহ পাঁচটি পশ্চিমা দেশ স্মোট্রিচ এবং আরেক কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা ইসরায়েল সরকার ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
প্রেক্ষাপট: ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েল পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করে রেখেছে। সেখানে গড়ে তোলা প্রায় ১৬০টি অবৈধ বসতিতে বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ ইহুদি বসবাস করছেন, যেখানে একই এলাকায় ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা প্রায় ৩৩ লাখ। আন্তর্জাতিক আইনে এই ইসরায়েলি বসতিগুলোকে সম্পূর্ণ অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।