শিরোনামঃ
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এডিবি প্রেসিডেন্টের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে ইরানের সম্মতি, চুক্তির সম্ভাবনা আতাউর রহমানের স্মরণসভায় আবুল হায়াতের আক্ষেপ সুস্থ ও প্রাকৃতিকভাবে মোটাতাজা গরু চেনার উপায় চুক্তি না হলে ইরানের সঙ্গে ‘বড় সংঘাতের’ হুঁশিয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টাঙ্গাইলে রডবাহী ট্রাক খাদে উল্টে নিহত পনেরো যাত্রী টানা তৃতীয় বছরের মতো গাজায় নেই কোরবানির ঈদ চাঁদপুরে আকস্মিক ঝড়ের কবলে যাত্রীবাহী লঞ্চ আহত অর্ধশতাধিক গরু কোরবানির দাবিতে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু খামারিদের বিক্ষোভ শিশু রামিসা হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল শুনানি জুনে
মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১২:২৭ পূর্বাহ্ন

সমুদ্রসীমায় জ্বালানি অনুসন্ধানে বিদেশী দরপত্র আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬

দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ও জ্বালানি খাতের আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে দেশের বিশাল সমুদ্রসীমায় পড়ে থাকা অমূল্য খনিজ সম্পদ উত্তোলনের লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র বা অফশোর বিডিং রাউন্ড আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের এই সুদূরপ্রসারী উদ্যোগের ফলে গভীর ও অগভীর সমুদ্রের মোট ছাব্বিশটি ব্লকে বিদেশী বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর বিশাল অংকের বিনিয়োগ ও ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি হলো। সম্প্রতি সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬’-এর এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। দেশের অর্থনীতিকে আমদানির বিশাল চাপ থেকে মুক্ত করে নিজস্ব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে একটি আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই দরপত্র আহ্বানকে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এবারের দরপত্রে বিশ্বের নামিদামি বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে পূর্বের নীতিমালায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং যুক্ত করা হয়েছে বেশ কিছু যুগান্তকারী ও আকর্ষণীয় সুবিধা। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট দূর করতে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব নমনীয়তা প্রদর্শন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সমুদ্রের তলদেশ থেকে মূল ভূখণ্ড পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় পাইপলাইন নির্মাণের ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় ট্যারিফ সুবিধা প্রদান, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে কোম্পানির লভ্যাংশের পরিমাণ যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদার বিপরীতে উদ্বৃত্ত গ্যাস বিদেশে রফতানি করার মতো সাহসী সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের দৃঢ় বিশ্বাস, বিনিয়োগবান্ধব এসব আধুনিক সুবিধার কারণে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার আন্তর্জাতিক বড় বড় কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ব্যাপক ও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাবে।

মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর আগ্রহী বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আগামী পহেলা জুন থেকে দরপত্রের প্রয়োজনীয় সকল নথিপত্র সংগ্রহের সুযোগ উন্মুক্ত করা হচ্ছে। একই সাথে কোম্পানিগুলো চাইলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধার্থে সমুদ্রে এর আগে পরিচালিত বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক জরিপের মূল্যবান তথ্য-উপাত্তও কিনে নিতে পারবে। বিদেশী কোম্পানিগুলোকে পরিস্থিতি যাচাই-বাছাই ও কারিগরি মূল্যায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিয়ে এই দরপত্র কেনা এবং আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়ার চূড়ান্ত সময়সীমা আগামী ত্রিশে নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই বিডিং রাউন্ডকে তুলে ধরতে এবং ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে এরই মাঝে বিশ্বের স্বনামধন্য পঞ্চান্নটি আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিকে সরাসরি ই-মেইলের মাধ্যমে বিশেষ আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী অতীত সরকারের ভুল নীতির কঠোর সমালোচনা করে নিজস্ব সম্পদ আহরণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, দীর্ঘদিন ধরে দেশের নিজস্ব খনিজ সম্পদ মাটির নিচে ফেলে রেখে পূর্ববর্তী সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি সম্পূর্ণ আমদানিভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে দেশকে ঠেলে দিয়েছিল। বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি এবং অন্যান্য জ্বালানি আমদানির ফলে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মারাত্মকভাবে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। নব্বইয়ের দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়কার সফল বিডিং রাউন্ডের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, সে সময়কার দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফলেই শেভরনের মতো বিশ্বমানের কোম্পানি বাংলাদেশে কাজ শুরু করেছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এরপর দীর্ঘ কয়েক দশকে দেশে আর কোনো উল্লেখযোগ্য বিদেশী কোম্পানিকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। ২০১২ ও ২০১৪ সালে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে বিশাল সমুদ্রসীমা বিজয়ের পর দেশজুড়ে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও, সেই সমুদ্রের তলদেশে লুকিয়ে থাকা অমূল্য সম্পদ উত্তোলনের ব্যাপারে বিগত সরকারগুলো চরম উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে। অথচ ঠিক একই সময়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজ নিজ সমুদ্রসীমায় পুরোদমে গ্যাস আবিষ্কার ও উত্তোলনের কাজ শুরু করে দিয়েছে।

বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী মহোদয় জানান, দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র একশ আশি দিনের মাথাতেই অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এই অফশোর বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা সম্ভব হয়েছে, যা সরকারের আন্তরিক সদিচ্ছারই প্রমাণ। তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন যে, সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দেশের প্রচলিত আইন-কানুন এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে ব্লকগুলো হস্তান্তর করা হবে। সমুদ্র থেকে নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হলে তা যেমন দেশের বিশাল আমদানি ব্যয় বাঁচাবে, তেমনি জাতীয় অর্থনীতি ও টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। দরপত্র প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অস্বচ্ছতা বা জাতীয় স্বার্থের সাথে বিন্দুমাত্র আপস করা হবে না বলেও তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

নতুন প্রণীত উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি বা পিএসসি-তে বিদেশী কোম্পানিগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি ও আপত্তির বিষয়গুলো অত্যন্ত সুচারুভাবে সমাধান করা হয়েছে। গভীর সমুদ্র থেকে মূল ভূখণ্ডে গ্যাস আনার জন্য পাইপলাইন নির্মাণের ক্ষেত্রে যে বিশাল বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়, তার বিপরীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি নির্ধারিত হারে ট্যারিফ বা মাশুল প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে, যা আগের কোনো চুক্তিতে ছিল না। এছাড়া সমুদ্রবক্ষে দীর্ঘমেয়াদি ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অনুসন্ধানে প্রত্যাশিত পরিমাণ গ্যাস না পেলেও কোনো কোম্পানি যদি তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে চায়, তবে তাদের উৎসাহিত করতে মুনাফার অংশ এক থেকে দুই শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়ার বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগের অন্যতম বড় বাধা হিসেবে পরিচিত শ্রম আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা সংশোধন করে অন্তর্বর্তী সরকার শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে কোম্পানির মুনাফা প্রদানের হার পাঁচ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র দেড় শতাংশে নামিয়ে এনেছে, যা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক একটি পদক্ষেপ। এর বাইরেও যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক মওকুফ, পেট্রোবাংলার পক্ষে ঠিকাদারের আয়কর পরিশোধ, প্রয়োজনে তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রি এবং আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

সর্বোপরি, আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে গ্যাসের মূল্য কাঠামোতে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা এই দরপত্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। গভীর সমুদ্রে উত্তোলিত গ্যাসের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের মূল্যের এগারো শতাংশ এবং অগভীর সমুদ্রে সাড়ে দশ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামার সাথে সংগতি রেখে গ্যাসের দামও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হবে, যা বিনিয়োগকারীদের আর্থিক ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনবে। তবে বিশ্ববাজারে তেলের দামে চরম অস্থিরতা দেখা দিলেও যেন দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের কোনো আকস্মিক ধাক্কা না লাগে, সেজন্য প্রতি পাঁচ বছর অন্তর গ্যাসের দামের একটি সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমা বা ক্যাপ-ফ্লোর নির্ধারণ করে দেওয়ার একটি চমৎকার সুরক্ষামূলক ব্যবস্থাও এই নতুন চুক্তিতে রাখা হয়েছে। বিগত সরকারগুলোর আমলে তথ্যের ঘাটতি ও অলাভজনক শর্তের কারণে যে দরপত্রগুলো ব্যর্থ হয়েছিল, বর্তমান সরকার দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ এবং এক্সন মবিলের মতো বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানির পরামর্শ নিয়ে সেসব ত্রুটি সম্পূর্ণরূপে দূর করে দেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে একটি নতুন ও সম্ভাবনাময় অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে।

তথ্যসূত্র: বণিকবার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...