শিরোনামঃ
কোরবানির বর্জ্য না সরানোয় ইজারাদারদের জামানত বাজেয়াপ্ত ও কালো তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্ত অপপ্রচারের রাজনীতি এখনো থামেনি, প্রেস ক্লাবে রিজভী ৫ বিভাগে বজ্রবৃষ্টির আভাস, তবে দেশজুড়ে বাড়বে ভ্যাপসা গরম দাগনভূঞায় ইসলামী আন্দোলনের নির্বাচনী মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সর্বোচ্চ সম্মাননায় ভূষিত হচ্ছেন বাংলাদেশের ৬ শহীদ শান্তিরক্ষী সাত দিনের লম্বা ছুটি শেষে কাল সচল হচ্ছে দেশ তামাকমুক্ত প্রজন্ম গড়তে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী পাহাড়ি জঙ্গল সলিমপুর আর থাকছে না অপরাধীদের কব্জায় ইরাক-ইরানে মার্কিন হস্তক্ষেপকে ‘বোকামি’ বললেন ট্রাম্প বৈশ্বিক বাজারে সোনা ঊর্ধ্বমুখী, বাংলাদেশে দাম স্থির
রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১১:২৩ অপরাহ্ন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম একশো দিনের সফল শাসনকাল

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬

বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম জটিল অস্থিতিশীল এবং মারাত্মক সংকটময় মুহূর্তে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের রেখে যাওয়া প্রায় ত্রিশ লাখ কোটি টাকার বিশাল ঋণের বোঝা, সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও দুর্বল অর্থনীতি, চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিপর্যস্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ অচলাবস্থার মধ্যে তাকে দেশ গঠনের কাজ শুরু করতে হয়েছিল। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও চলছিল এক তীব্র স্নায়ুযুদ্ধ। ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের এক অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে। এতসব বহুমুখী সংকটের মধ্যেই দীর্ঘ আঠারো বছরের রাজনৈতিক নির্বাসিত জীবন শেষে তিনি লন্ডনের মাটি থেকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। দেশে ফেরা নিয়ে তার নিজের নিরাপত্তার শঙ্কা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকলেও সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি যে অবিশ্বাস্য গতিতে প্রথম একশো দিন পার করেছিলেন, তা দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম একশো দিনের শাসনকাল ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল এবং ইতিবাচক পরিবর্তনে ভরপুর। এই একশো দিন পার হওয়ার পর পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, দেশের প্রশাসন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সর্বত্রই তার কাজের অভূতপূর্ব গতি ও নতুন প্রশাসনিক স্টাইল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। বাংলাদেশের চিরাচরিত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, কাজে দীর্ঘসূত্রিতা এবং ফাইল আটকে রাখার যে নেতিবাচক সংস্কৃতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছিল, তিনি তা সমূলে উৎপাটন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, কোনো কাজ আগামীকালের জন্য ফেলে রাখার মতো সময় দেশের নেই। লন্ডনে ফেলে আসা জীবনের দীর্ঘ আঠারো বছরের নির্বাসনের সময়টাকে তিনি তার অভাবনীয় কাজের গতি দিয়ে পুষিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। তিনি শুধু প্রধানমন্ত্রী পদটিকে উপভোগ করতে বা সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে আসেননি, বরং তার প্রতিটি সিদ্ধান্তে তিনি প্রজ্ঞার ছাপ রেখেছিলেন। প্রশাসনের সর্বস্তরে তিনি এমন একটি নতুন কর্মসংস্কৃতি ও মানদণ্ড স্থাপন করেছিলেন, যার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে শীর্ষ আমলারাও রীতিমতো হিমশিম খেয়েছিলেন।

তার ব্যক্তিগত কর্মতৎপরতা এবং প্রতিদিনের রুটিন ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া সেনাপতির মতো। সরকারের প্রথম কার্যদিবসে গুলশানের বাসভবন থেকে সচিবালয়ের উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় উপস্থিত কর্মকর্তাদের তিনি হাসিমুখে বলেছিলেন, “চলুন, যুদ্ধে যাই।” প্রতিদিন সকাল ঠিক নয়টায় সচিবালয়ে তার দাপ্তরিক কাজ শুরু হতো। এরপর বিকেল সাড়ে তিনটায় তিনি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যোগ দিতেন। রাত আটটা পর্যন্ত তিনি সংসদে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। এর পরপরই রাত পৌনে নয়টায় শুরু হতো মন্ত্রিসভার বৈঠক, যা অনেক সময় রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত চলত। এত দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর সূচির পরও তিনি নিজ দপ্তরে ফিরে গভীর রাত পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পর্যালোচনা ও দেশের কাজ চালিয়ে যেতেন। জাতীয় সংসদে তার নিয়মিত উপস্থিতির কারণে সেখানেও এক বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছিল। তিনি নিজেই সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতেন। প্রতিদিন সবার আগে সংসদে উপস্থিত হওয়ার কারণে অন্যান্য সংসদ সদস্যরাও তখন বাধ্য হয়ে সঠিক সময়ে অধিবেশনে যোগ দিতেন। প্রশাসনের কাজে তার মূলমন্ত্র ছিল ‘জিরো টলারেন্স’ এবং ‘কুইক রেসপন্স’।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে তার সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও যুগান্তকারী। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করার পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আট শতাংশে উন্নীত করার এক সুদূরপ্রসারী মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা হয়েছিল। ওই একশো দিনের মধ্যেই দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য ষাটটি বড় উদ্যোগের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির তীব্র চাপ থাকা সত্ত্বেও দেশের ভেতরে জ্বালানি তেলের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে রাখতে সরকার বদ্ধপরিকর ছিল। প্রথম সংসদ অধিবেশনেই তিনি অভাবনীয় দ্রুততায় ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিষ্পত্তি করেছিলেন এবং আরও ১৬টি অধ্যাদেশ পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মেগা প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে তদারকি করে কাজের গতি বাড়িয়েছিলেন।

দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষিখাতকে চাঙ্গা করতে সরকার তখন বেশ কিছু চমৎকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। প্রান্তিক কৃষকদের সুরক্ষায় দশ জেলার প্রায় বাইশ হাজার কৃষককে ‘ফারমার্স কার্ড’ বা কৃষক কার্ড প্রদান করা হয়েছিল। এছাড়া প্রায় ১২ লাখ প্রান্তিক কৃষকের দশ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণের সুদ সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছিল, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের স্বস্তি নিয়ে এসেছিল। স্বাস্থ্যখাতেও নেওয়া হয়েছিল বিশাল উদ্যোগ। ইউনিসেফের সাথে ৮ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের এক বিশাল চুক্তির আওতায় দেশের মানুষের জন্য প্রায় সাড়ে নয় কোটি ডোজ টিকা সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। রুফটপ সোলার প্যানেল থেকে জাতীয় গ্রিডে ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছিল এবং ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে দশ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক মেগা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পাশাপাশি দেশের ৫৪টি জেলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলাশয় খননের বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছিল।

ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে সরকার ওই সময়ে ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং পুরোহিতদের জন্য মাসিক ৪ হাজার ৯০৮ টাকার বিশেষ ভাতা চালু করেছিল। হজযাত্রীদের কষ্ট লাঘবে বিমান ভাড়া ১২ হাজার টাকা কমানো হয়েছিল এবং নতুন করে ‘নুসুক হজ কার্ড’ চালু করা হয়েছিল। বেকারত্ব দূর করতে এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পাঁচ বছরে সরকারি চাকরিতে ৪ লাখ ৮৬ হাজার ২২০টি শূন্যপদ পূরণের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। বন্ধ হয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী চিনিকল ও পাটকলগুলো পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে ছাত্রীদের ভর্তি ও প্রবেশ ফি সম্পূর্ণ মওকুফ করে তাদের উপবৃত্তির পরিমাণ দ্বিগুণ করা হয়েছিল। এছাড়া উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য দশ লাখ টাকা পর্যন্ত বিশেষ আর্থিক সুবিধা বা ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

প্রশাসনে কঠোর মিতব্যয়িতা ও জবাবদিহিতার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি নিজের গাড়িবহর অনেক ছোট করে এনেছিলেন এবং মন্ত্রীদের জন্য অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিলেন। প্রতিবেশী ভারতের সাথে স্বাভাবিক ও সম্মানজনক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন’-এর মাধ্যমে জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রেখে তিনি তার অসাধারণ কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয়েছিল। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জোটবদ্ধ অবস্থান সরকারের জন্য এক নীরব চাপ সৃষ্টি করে রেখেছিল। দেশে জ্বালানি সংকট, চাঁদাবাজি এবং বিচ্ছিন্ন কিছু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য বিরোধীরা সরাসরি সরকারকেই দায়ী করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তিনি অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে সেই পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন।

রাজনৈতিক এই চ্যালেঞ্জের চেয়েও ওই একশো দিনে সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ ছিল আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি বা জিওপলিটিক্স। বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র নাকি চীন—কাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা নিয়ে পরাশক্তিগুলোর এক প্রচ্ছন্ন স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল। দেশের ভেতরে মেগা প্রকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে চীনের বিকল্প কোনো রাষ্ট্রকে যুক্ত করা যায় কি না, সেটিও সরকার গভীরভাবে পর্যালোচনা করেছিল। অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের গন্তব্যে নিয়ে যেতে হলে বৃহৎ পরাশক্তিগুলোর বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি ছিল। এই বহুমুখী চাপ ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তিনি অত্যন্ত সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে মোকাবিলা করেছিলেন।

এতসব কঠিন চ্যালেঞ্জ, রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং সারাদিনের অমানবিক পরিশ্রমের পরও ব্যক্তি তারেক রহমান ছিলেন এক সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ। তিনি শত ব্যস্ততার মাঝেও পরিবারকে চমৎকারভাবে সময় দিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি সিনেমা দেখেছিলেন, বেইলি রোডে গিয়ে মঞ্চনাটক উপভোগ করেছিলেন। নিজেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ও প্রাণবন্ত রাখার জন্য তিনি নিয়মিত শরীরচর্চা করতেন। তার পরিপাটি পোশাক, আধুনিক রুচিবোধ এবং স্টাইলিশ লাইফস্টাইল দেশের সাধারণ মানুষ ও তরুণ সমাজকে দারুণভাবে মুগ্ধ করেছিল। সময়ের সাথে সাথে তিনি নিজেকে যেমন আধুনিক ও যুগোপযোগী হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, ঠিক তেমনিভাবেই তিনি তার প্রথম একশো দিনের শাসনামলে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকেও সব দিক থেকে আপগ্রেড করে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার এক মজবুত ভিত্তি স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ ২৪


এ জাতীয় আরো খবর...